অথর্ববেদীয়া

মুণ্ডকোপনিষৎ।

শ্রীমৎ-পরমহংস-পরিব্রাজকাচার্য্য-শঙ্কর-ভগবৎকৃত- পদভাষ্য-সমেতা।

মূল, অন্বয়মুখী ব্যাখ্যা, মূলানুবাদ, ভাষ্য, ভাষ্যানুবাদ ও টিপ্পনী সহিত।

সম্পাদক ও অনুবাদক পণ্ডিত শ্রীযুক্ত দুর্গাচরণ সাংখ্য-বেদান্ততীর্থ।

সহকারী সম্পাদক, সত্ত্বাধিকারী ও প্রকাশক— শ্রীঅনিলচন্দ্র দত্ত। লোটাস্ লাইব্রেরী। ২৮১ নং কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট, কলিকাতা। ১৩১৮ সাল। All rights reserved.

প্রিন্টার—শ্রীযোগেশচন্দ্র অধিকারী। মেটকাফ্ প্রেস, ৭৬ নং বলরাম দে স্ট্রীট, কলিকাতা।।

আভাস।

পঞ্চম খণ্ডে মুণ্ডকোপনিষৎ প্রকাশিত হইল; অথর্ব্বশাখায় যে অষ্টাবিংশতি উপনিষৎ আছে, উক্ত মুণ্ডকোপনিষৎখানি তাহাদের অন্যতম। অথর্ব্বপরি- শিষ্টে অথর্ব্বশাখীয় উপনিষদের সংখ্যা নির্দিষ্ট আছে, তাহা এইরূপ-(১) মুণ্ডক,(২) প্রশ্ন,(৩) ব্রহ্মবিদ্যা,(৪) ক্ষুরিকা,(৫) চুলিকা,(৬) অথর্ব্বশিরা (৭) অথর্ব্বশিখা,(৮) গর্ভোপনিষৎ,(৯) মহোপনিষৎ,(১০) ব্রহ্মোপনিষৎ, (১১) প্রাণাগ্নিহোত্র,(১২) নাদবিন্দু,(১৩) ব্রহ্মবিন্দু,(১৪) অমৃতবিন্দু,(১৫) ধ্যানবিন্দু,(১৬) তেজোবিন্দু,(১৭) যোগশিখা,(১৮) যোগতত্ত্ব,(১৯) নীলরুদ্র, (২০) কালাগ্নিরুদ্র,(২১) তাপিনী,(২২) একদণ্ডী,(২৩) সন্ন্যাসবিধি(২৪) আরুণি(২৫) হংস,(২৬) পরমহংস(২৭) নারায়ণোপনিষৎ ও(২৮) বৈতথ্য। এখন প্রশ্ন হইতে পারে যে, অথর্ব্ববেদে এতগুলি উপনিষৎসত্ত্বে আচার্য্য শঙ্করস্বামী কেবল প্রশ্ন ও মুণ্ডকোপনিষদের ব্যাখ্যায় প্রবৃত্ত হইলেন কেন? এই দুইটি উপনিষদে এমন কি বৈচিত্র বা গুরুত্ব আছে, যাহাতে অপর সমস্ত উপনিষৎ বাদ দিয়া কেবল এই দুই খানি মাত্র অথর্ব্বণ উপনিষদের ব্যাখ্যায় মনোনিবেশ করিলেন?

এতদুত্তরে বলা যাইতে পারে যে, ব্রহ্মসূত্র বেদান্ত-দর্শনের ব্যাখ্যা করাই আচার্য্য শঙ্করস্বামীর হৃদয়গত অভিলাষ; ব্রহ্মসূত্রের ব্যাখ্যাস্থলে বিশুদ্ধ অদ্বৈতবাদ সংস্থাপন করিয়া, অজ্ঞানান্ধ জীবনীবহকে দিব্য দৃষ্টি প্রদান করিবেন, ইহাই তাঁহার প্রধান উদ্দেশ্য। সেই উদ্দেশ্য সাধন করিতে, হইলে উপনিষদের আশ্রয় গ্রহণ ভিন্ন আর গত্যন্তর নাই; কারণ উপনিষৎ-শাস্ত্রই ব্রহ্মসূত্রের এক মাত্র উপজীব্য—উপনিষদের কমনীয় উপদেশময় কুসুমরাশি একত্র সুন্দর সুশৃঙ্খলরূপে গ্রন্থন করাই ব্রহ্মসূত্রের প্রধান কার্য্য। আচার্য্য যদি সেই উপনিষৎ-শাস্ত্রগুলি উপেক্ষা করিয়া, কেবল ব্রহ্মসূত্রেরই ব্যাখ্যা করিতেন—শুধু যুক্তিযোগে আপনার অভিমত বাদের মীমাংসা করিয়া যাইতেন, তাহা হইলে হয়ত অনেকেই তাঁহার সিদ্ধান্তে আস্থা স্থাপন করিতে কুণ্ঠা বোধ করিতেন। কারণ, ব্যক্তিবিশেষের মনঃকল্পিত অবৈদিক সিদ্ধান্তসমূহ যুক্তসহ হইলেও ভ্রম-প্রমাদাদির সম্ভাব-শঙ্কায় সজ্জনের সমাদরণীয় হয় না।

পঞ্চায়েত—যমত সমর্থনের জন্য উপনিষদ-বাক্যাংশ উদ্ধৃত করিলেও

সেই সকল বাক্যের প্রকৃত অর্থ অন্যরূপ কিনা, তদ্বিষয়েও কেহ নিঃসংশয় হইতে পারিতেন না। এই কারণেই উপনিষদের সহিত ব্রহ্মসূত্রের সামঞ্জস্য বা ঐকমত্য সংরক্ষণার্থ আচার্য্য সর্ব্বাদৌ উপনিষদের ব্যাখ্যায় প্রবৃত্ত হন। পৃথক্ পৃথক্ এক একটি উপনিষদের ব্যাখ্যা দ্বারা যে সার সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন, ব্রহ্মসূত্র ব্যাখ্যায় পর্যায়ক্রমে সেই সকলেরই সার-সংকলনপূর্ব্বক সুমীমাংসা করিয়া গিয়াছেন মাত্র। তবে এরূপও দুই একটি উপনিষদের বাক্য উদ্ধৃত হইতে দেখা যায়, আচার্য্য যাহাদের ব্যাখ্যা করেন নাই; কিন্তু তাহার পরিমাণ খুবই কম।

এখন প্রকৃত কথা এই যে, অথর্ব্বশাখায় অষ্টাবিংশতি উপনিষৎ থাকিলেও একমাত্র মুণ্ডকোপনিষদ্ ভিন্ন আর কোনটিই ব্রহ্মসূত্রে পরিগৃহীত হয় নাই; পরন্তু মুণ্ডকোপনিষদেরই “যৎ তৎ অদ্রেশ্যং” ইত্যাদি শ্রুতিবাক্য অবলম্বনে ব্রহ্মসূত্রের “অদৃশ্যত্বাদিগুণকো ধর্মোক্তেঃ।”(১।২।২১) সূত্রটি বিরচিত হইয়াছে; কাজেই মুণ্ডকোপনিষদের ব্যাখ্যা করা আচার্য্যের আবশ্যক হইয়াছে। মুণ্ডকের সহিত প্রশ্নোপনিষদের যে, বিশেষ ঘনিষ্ঠতা আছে, তাহা আমরা ইতঃপূর্ব্বেই বলিয়াছি; কাজেই সাক্ষাৎপরম্পরা সম্বন্ধে ব্রহ্মসূত্রের সহিত যে, প্রশ্নোপনিষদের সম্বন্ধ আছে, তাহা অস্বীকার করা যায় না; সুতরাং তাহার ব্যাখ্যাও ব্রহ্মসূত্রের অনুপযোগী হয় নাই।

প্রশ্নের ন্যায় মুণ্ডকেও প্রশ্ন-প্রতিবচনচ্ছলে পরতত্ত্ব নির্ণীত হইয়াছে। বিশেষ এই যে, প্রশ্নে ছয় জনে ক্রমে ছয়টি প্রশ্ন করিয়াছেন, মুণ্ডকে একমাত্র শৌনক ঋষি প্রশ্নকর্তা, অঙ্গিরা ঋষি তাহার উত্তরদাতা। প্রষ্টব্য বিষয়— এক-বিজ্ঞানে সর্ব্ব-বিজ্ঞান, অর্থাৎ এমন কোনও পদার্থ আছে কি, যাহা একটি-মাত্র জানিলেই অপরাপর সমস্ত পদার্থ জানা হইয়া যায়?

তদুত্তরে অঙ্গিরা বলিলেন,—জগতে জীবের জ্ঞাতব্য বিষয় দুইটি—‘পরা বিদ্যা’ ও ‘অপরা বিদ্যা।’

অপরা বিদ্যার স্বরূপ, বিষয় ও ফল যথাযথভাবে জানিতে না পারিলে, তদ্বিষয়ে কাহারও বৈরাগ্য জন্মিতে পারে না; তদ্বিষয়ে বৈরাগ্য না হইলেও পরা বিদ্যা বিষয়ে কখনই রুচি ও প্রবৃত্তি আসিতে পারে না; এই কারণে প্রথমে অপরা বিদ্যার কথা শেষ করিয়া, পশ্চাৎ পরা বিদ্যা সম্বন্ধে যাহা যাহা বক্তব্য, তৎসমুদয় বলা হইয়াছে।

1/.

সর্ব্বব্যাপী পরব্রহ্ম সর্ব্বত্র সর্ব্ব বস্তুতে ওত-প্রোতভাবে সন্নিহিত রহিয়া ছেন; তাঁহার সেই সর্ব্বাত্মভাব গ্রহণ না করিয়া যে, দেশ-কালাদি দ্বারা পরিচ্ছিন্ন ভাবে তাঁহার আরাধনা বা উপাসনা করা, তাহাই অপরা বিদ্যার বিষয়। পরিচ্ছিন্ন স্থানবিশেষ-প্রাপ্তি এবং পরিমিত সুখ-সম্ভোগ তাহার ফল। ঋক্, যজুঃ, সামাদি কর্মপর বেদভাগ উক্তবিধ উপদেশে পরিপূর্ণ; এই জন্য ঋগ্বেদাদি শাস্ত্রগুলিকেও ‘অপরা বিদ্যা’ নামে নির্দেশ করা হইয়া থাকে। আর যে বিদ্যাদ্বারা দৃশ্যমান জগতের মিথ্যাত্ব অক্ষর পর ব্রহ্মের কূটস্থ সত্যত্ব ও সর্ব্বাত্মকত্ব এবং তাহার বিজ্ঞানে সর্ব্ববিজ্ঞান প্রাপ্তি প্রভৃতি বিষয় জানা যায়, তাহাই পরা বিদ্যা; পরা বিদ্যা ও ব্রহ্মবিদ্যা অভিন্ন পদার্থ। প্রথমোক্ত অপরা বিদ্যার ফলে তীব্র বৈরাগ্য না হইলে, এই পরা বিদ্যায় প্রবৃত্তি হয় না; এই কারণে প্রথমে অপরা বিদ্যা এবং পরে পরা বিদ্যা ও তদা- নুষঙ্গিক বিষয় গুলি পর পর সন্নিবেশিত ও সমর্থিত হইয়াছে। ইতি।

শ্রীদুর্গাচরণ শর্ম্মা

সম্পাদক।

মুণ্ডকোপনিষদের বিষয় ও সূচী।

প্রথম মুণ্ডকে প্রথম খণ্ডে শ্রুতি—শ্রুতিপর্য্যন্ত।

বিষয় শ্লোক-সংখ্যা হইতে-পর্যন্ত। ১। ব্রহ্মা হইতে যে সমস্ত আচার্য্য-পর্যায়ক্রমে এই ব্রহ্মবিদ্যা জগতে প্রচারিত হইয়াছে, তাহার নির্দেশ।... ১—২ ২। ব্রহ্মবিদ্যালাভের উদ্দেশে অঙ্গিরা ঋষির নিকট শৌনকের গমন এবং এক বিজ্ঞানে সর্ব্ববিজ্ঞান-বিষয়ক প্রশ্ন কথন।... ৩—০ ৩। অঙ্গিরা কর্তৃক পরা ও অপরাভেদে বিদ্যার দ্বৈবিধ্য কথন এবং পরা ও অপরাবিদ্যার স্বরূপ নিরূপণ।... ৪—৫ ৪। পরা বিদ্যায় বিদ্যার বিষয় অক্ষর ব্রহ্মের স্বরূপকথন এবং উর্ণনাভদৃষ্টান্তে ব্রহ্মের সর্ব্বকারণত্ব সমর্থন।... ৬—৯ দ্বিতীয় খণ্ডে— ৫। অপরা বিদ্যার বিষয় অগ্নিহোত্রাদি কর্ম্মের উপদেশ এবং অঙ্গহানিতে দোষ কথন।... ১—৩ ৬। অগ্নির সপ্ত জিহ্বা কথন, অবস্থাভেদে সেই সকল জিহ্বার আহুতির প্রশংসা ও ফল নির্দ্দেশ।... ৪—৬ ৭। জ্ঞানরহিত কৰ্ম্ম ও কর্মাসক্ত অজ্ঞ জনের নিন্দাপূর্ব্বক পুনরাবৃত্তি কথন।... ৭—১০ ৮। সগুণ ব্রহ্মজ্ঞানসম্পন্ন আশ্রমোচিত কৰ্ম্মানুষ্ঠাতৃগণের সাংসারিক ফল- লাভ কথন।... ১১—০ ৯। সাংসারিক কর্মফলে বৈরাগ্য লাভের পর ব্রহ্মজ্ঞানোপদেশের জন্য ব্রহ্মবিৎ গুরুর আশ্রয় গ্রহণ এবং গুরুর পক্ষেও উপযুক্তশিষ্যে ব্রহ্মজ্ঞানো- পদেশের বিধি। ১২—১৩ দ্বিতীয় মুণ্ডকে প্রথম খণ্ডে— ১০। সত্য স্বরূপ অক্ষর ব্রহ্ম হইতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ দৃষ্টান্তে বিবিধ জীবোৎপত্তি কথন। ১— ১১। অক্ষর পুরুষের সর্ব্বকারণত্ব ও সর্ব্বাত্মকত্ব ও অপ্রাণত্বাদি কথন এবং তদ্বিজ্ঞানের ফল অবিদ্যানিবৃত্তি কথন। ২—১০
সূচীপত্র সমাপ্ত

দ্বিতীয় খণ্ডে—

বিষয় শ্লোক-সংখ্যা হইতে—পর্যন্ত। ১১। ব্রহ্মের সর্ব্বভূতে গুহাচরত্ব ও সর্ব্বাশ্রয়ত্ব কখন এবং তাহাকে লক্ষ্য করিবার উপদেশ।........ ১—২ ১২। অক্ষর ব্রহ্মজ্ঞানের উপায়-কথন-প্রসঙ্গে প্রণব প্রভৃতির ধনুরাদি ভাবে রূপককল্পনা এবং লক্ষ্য ব্রহ্মের স্বরূপ নির্দেশপূর্ব্বক তদ্বিজ্ঞানের ফল কথন। ৩—৯ ১৩। সূর্য্যাদি জ্যোতিঃ তাঁহাকে প্রকাশকরিতে পারে না, তিনিই সূর্য্যাদি জ্যোতির প্রকাশক ইহা প্রতিপাদন এবং তদ্বিজ্ঞানে সর্ব্ববিজ্ঞান কথন। ১০—১২ তৃতীয় মুণ্ডকে প্রথম খণ্ডে— ১৪। দেহকে বৃক্ষরূপে এবং জীব ও পরমাত্মাকে দুইটি পক্ষিরূপে কীর্ত্তন। একই দেহ-বৃক্ষে উভয়ের অবস্থান, এবং জীবের ভোক্তৃত্ব আর পরমাত্মার অভোক্তত্ব—ঔদাসীন্য কথন ১—২ ১৫। ব্রহ্মজ্ঞের ব্রহ্মসারূপ্যলাভ এবং সর্ব্বশ্রেষ্ঠত্ব কথন ৩—৪ ১৬। ব্রহ্মজ্ঞানে তত্ত্বজ্ঞানের সহকারী সত্যাদি সাধন নিরূপণ ও তৎপ্রশংসা। ৫—৬ ১৭। ব্রহ্মের দুজ্ঞেয়ত্ব ও তদুপলব্ধির জন্য চিত্ত শুদ্ধির একান্ত আবশ্যকতা কখন। ৭—১০ দ্বিতীয় খণ্ডে— ১৮। কামনা বিহীন মুমুক্ষুর পক্ষেই আত্মদর্শনের সুলভত্ব কথন। ১—২ ১৯। একমাত্র অভেদানুসন্ধান ভিন্ন কেবল পদ-পদার্থাদি জ্ঞানে আত্ম- দর্শনের অসম্ভাবনা কথন। ৩—৪ ২০। আত্মবিৎ পুরুষের কৃতকৃত্যতালাভ, দেহত্যাগের সঙ্গে দেহোপাদান প্রাণাদি পঞ্চদশ কলায় নিজ নিজ কারণে বিলয় প্রাপ্তি এবং সর্ব্বোপাধি পরিত্যাগ পূর্ব্বক নির্বিশেষ ব্রহ্মভাবপ্রাপ্তি কথন ৫—৯ ২১। ব্রহ্মবিদ্যা সম্প্রদানের উপযুক্ত পাত্র নির্দেশ এবং শাস্ত্রার্থের উপ- সংহার। ১০—১১

অথর্ববেদীয়- মুণ্ডকোপনিষৎ

শাঙ্কর-ভাষ্যসমেতা।

তাথ প্রথমমুণ্ডকে

প্রথমঃ খণ্ডঃ।

॥ ওঁ ॥ ব্রহ্মণে নমঃ ॥

ভদ্রং কর্ণেভিঃ শৃণুয়াম দেবাঃ। ভদ্রং পশ্যেমাক্ষভির্যজত্রাঃ। স্থিরৈরঙ্গৈস্তুষ্টুবাংসস্তনৃভিঃ। ব্যশেম দেবহিতং যদায়ুঃ ॥ ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ॥

হে দেবগণ, আমরা কর্ণ দ্বারা যেন উত্তম বিষয় শ্রবণ করিতে পাই, চক্ষু দ্বারা যেন উত্তম বিষয় দর্শন করিতে পাই, এবং স্থিরতর অঙ্গ- সম্পন্ন দেহে স্তোত্রপরায়ণ হইয়া দেবগণের হিতকর যে আয়ু, তাহা যেন ভোগ করিতে পাই ॥ ১ ॥

ভাষ্যাবতরণিকা।

ওঁ ॥ ‘ব্রহ্মা দেবানাম্’ ইত্যাদ্যর্থবর্ণোপনিষৎ(১)।

(১) ‘ব্রহ্মোপনিষৎ’ ‘গর্ভোপনিষৎ’ প্রভৃতর আথর্ব্বণবেদস্য বহ্য উপনিষদঃ সন্তি; তাসাং শারীরকে হনুপযোগিত্বেন অব্যাচিখ্যাসিতত্বাৎ ‘অদৃশ্যত্বাদিগুণকো ধর্মোক্তেঃ” ইত্যাদ্যধি- করণোপযোগিতয়া মুণ্ডকস্য ব্যাচিখ্যাসিতস্য প্রতীকমাদত্তে-ব্রহ্মা দেবানামিত্যাদ্যাথর্ব্বণোপ- নিষদ্‌“ইতি, * * * । ননু ইয়মুপনিষদ্ মন্ত্ররূপা; মন্ত্রাণাঞ্চ “ঈশেত্বা” ইত্যাদীনাং কৰ্ম্মসম্বন্ধেনৈব প্রয়োজন- বস্তুম। এতেষাং চ মন্ত্রাণাং কৰ্ম্মসু বিনিযোজক-প্রমাণানুপলন্তেন তৎসম্বন্ধাসম্ভবাৎ নিষ্প্রয়ো

২ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

অস্যাশ্চ(২) বিদ্যা-সম্প্রদায়কর্তৃ-পারম্পর্য্যলক্ষণ-সম্বন্ধমাদাবেবাহ স্বয়মেব স্তুত্যর্থম্। এবং হি মহদ্ভিঃ পরমপুরুষার্থসাধনত্বেন গুরুণায়াসেন লব্ধা বিদ্যেতি শ্রোতৃবুদ্ধি- প্ররোচনায় বিদ্যাং মহীকরোতি; স্তত্যা প্ররোচিতায়াং হি বিদ্যায়াং সাদরাঃ প্রবর্তেরন্নিতি। প্রয়োজনেন তু বিদ্যায়াঃ সাধ্য-সাধনলক্ষণসম্বন্ধমুত্তরত্র বক্ষ্যতি,- “ভিদ্যতে হৃদয়গ্রন্থিঃ” ইত্যাদিনা। অত্র চ অপরশব্দবাচ্যায়াম্ ঋগ্বেদাদিলক্ষণায়াং বিধি-প্রতিষেধমাত্রপরায়াং বিদ্যায়াং সংসারকারণাবিদ্যাদিদোষনিবর্তকত্বং নাস্তীতি স্বয়মেবোক্ত্বা পরাপর-বিদ্যা-ভেদকরণ-পূর্ব্বকম “অবিদ্যায়ামন্তরে বর্তমানাঃ” ইত্যা- দিনা; তথা পর-প্রাপ্তিসাধনং সর্ব্ব-সাধন-সাধ্যবিষয়-বৈরাগ্য পূর্ব্বকং গুরুপ্রসাদ- লভ্যাং ব্রহ্মবিদ্যামাহ “পরীক্ষ্য লোকান্” ইত্যাদিনা। প্রয়োজনঞ্চ অসকৃদ্রবীতি “ব্রহ্ম বেদ ব্রহ্মৈব ভবতি”ইতি, “পরামৃতা: পরিমুচ্যান্তি সর্ব্বে” ইতি চ।

  1. জনত্বাদ ব্যাচিখ্যাসিতত্ব’ ন সম্ভবতি; ইতি শঙ্কমানস্থোত্তরং- সত্যং কৰ্ম্মসম্বন্ধাভাবেহপি
  2. ব্রহ্মবিদ্যা-প্রকাশন-সামর্থ্যাৎ বিদ্যয়া সম্বন্ধো ভবিষ্যতি। ইতি আনন্দগিরিঃ।
  3. অভিপ্রায় এই যে, অথর্ববেদমধ্যে ‘ব্রহ্মোপনিষৎ’ ‘গর্ভোপনিষৎ’ প্রভৃতি অনেকগুলি উপনিষৎ
  4. আছে; কিন্তু শারীরক-সূত্র বেদান্তদর্শনে ঐ সকল উপনিষদের সাক্ষাৎ উপযোগিতা না থাকায়
  5. সে সকলের ব্যাখ্যায় কোন প্রয়োজন নাই; অথচ, “অদৃশ্যত্বাদিগুণকো ধর্মোক্তেঃ”(১।২।২১)
  6. এই শারীরক সূত্রে মুণ্ডক-শ্রুতি পরিগৃহীত হওয়ায় অবশ্য ব্যাখ্যের হইতেছে; এই কারণে
  7. ভাষ্যকার “ব্রহ্মা দেবানাং” ও “আথর্বণোপনিষৎ” শব্দ দুইটির উল্লেখ করিয়াছেন।
  8. প্রশ্ন হইতে পারে যে, এই উপনিষৎটি যখন মন্ত্রাত্মক, অথচ “ঈশে ত্বা” ইত্যাদি সমস্ত মন্ত্রই
  9. যখন ক্রিয়া-বিনিযুক্ত হইয়াই সফলতা লাভ করিয়া থাকে, তখন এই উপনিষদুক্ত মন্ত্রসমূহ
  10. ক্রিয়া-সম্বন্ধ রাহিত্যনিবন্ধন নিশ্চয়ই নিরর্থক: নিরর্থক বলিয়াই ত ব্যাখ্যার যোগ্য হইতে পারে
  11. না; এইরূপ শঙ্কার উত্তরে বলিতেছেন যে, হাঁ, এতদুক্ত মন্ত্রসমূহের কর্মসম্বন্ধ বা ক্রিয়াতে
  12. বিনিয়োগ না থাকিলেও ব্রহ্মবিদ্যা-প্রকাশক বলিয়া বিদ্যার সহিত নিশ্চয়ই সম্বন্ধ লাভ করিবে;
  13. [ব্রহ্মবিদ্যা সম্বন্ধ বশতঃই এ সকলের সফলত্ব এবং সেই সফলত্ব নিবন্ধনই ব্যাখ্যেয়ত্ব সিদ্ধ
  14. হইতেছে ॥
  15. (২) অস্যাশ্চেতি। বিদ্যায়াঃ সম্প্রদায়-প্রবর্তকা এব পুরুষাঃ, নতু উৎপ্রেক্ষয়া নিৰ্ম্মা-
  16. তারঃ; সম্প্রদায়কর্তৃত্বমপি নাধুনাতনং, যেনানাশ্বাসঃ স্যাৎ; কিন্তু, অনাদিপারস্পর্য্যাগতম্।
  17. ততোহনাদি-প্রসিদ্ধ-ব্রহ্মবিদ্যাপ্রকাশন-সমর্থোপনিষদঃ পুরুষসম্বন্ধঃ সম্প্রদায়কর্তৃত্বপারস্পর্য্য-
  18. লক্ষণ এব, তমাদাবেব আহেত্যর্থঃ। আনন্দগিরিঃ।
  19. অভিপ্রায় এই যে, আচার্য্যপদারূঢ় পুরুষগণ স্ব স্ব বুদ্ধি অনুসারে কল্পনা করিয়া এই বিদ্যার
  20. সৃষ্টি করেন নাই; পরন্তু, গুরু-শিষ্যসম্প্রদায়ক্রমে জনসমাজে প্রবর্তনা বা প্রচার করিয়াছেন
  21. মাত্র। সেই সম্প্রদায় প্রবর্তনাও যে আধুনিক, -যাহার ফলে বিদ্যায় অশ্রদ্ধা সমুৎপন্ন হইতে
  22. পারে, তাহা নহে; কিন্তু অনাদিকাল হইতে প্রবৃত্ত গুরু-শিষ্যপারম্পর্য্যক্রমে আগত। ব্রহ্ম-
  23. বিদ্যা-প্রকাশক উপনিষৎসমূহের সহিত আচার্য্যগণের এই মাত্র সম্বন্ধ যে, তাঁহারা সম্প্রদায়-
  24. সংস্থাপনপূর্ব্বক শিষ্য-প্রশিষ্য এই ক্রমে বিদ্যার প্রচার করিয়াছেন মাত্র। উপনিষদের প্রারম্ভেই
  25. সেই সম্প্রদায়পারম্পর্য্যরূপ সম্বন্ধটি “ব্রহ্মা দেবানাং” ইত্যাদি বাক্যে প্রকাশ করিতেছেন।
খণ্ডঃ।] প্রথমং মুণ্ডকম্। ৩

জ্ঞানমাত্রে যদ্যপি সর্ব্বাশ্রমিণামধিকারঃ, তথাপি সন্ন্যাসনিষ্ঠৈব ব্রহ্মবিদ্যা মোক্ষসাধনং, ন কৰ্ম্মসহিতেতি ‘ভৈক্ষচর্য্যাং চরন্তঃ” “সন্ন্যাসযোগাৎ” ইতিচ ব্রুবন্ দর্শয়তি। বিদ্যা-কৰ্ম্মবিরোধাচ্চ; ন হি ব্রহ্মাত্মৈকত্ব-দর্শনেন সহ কৰ্ম্ম স্বপ্নেহপি সম্পাদয়িতুং শক্যম্। বিদ্যায়াঃ কালবিশেষাভাবাদনিয়তনিমিত্তত্বাৎ কাল-সঙ্কোচা- নুপপত্তিঃ। যত্তু গৃহস্থেষু ব্রহ্মবিদ্যাসম্প্রদায়কর্তৃত্বাদি লিঙ্গং, ন তৎস্থিতং ন্যায়ং বাধিতুমুৎসহতে। নহি বিধিশতেনাপি তমঃপ্রকাশয়োরেকত্র সম্ভাবঃ শক্যতে কর্ত্তুং, কিমুত লিঙ্গৈঃ কেবলৈরিতি।

এবমুক্তসম্বন্ধ-প্রয়োজনায়া উপনিষদোহল্লাক্ষরং গ্রন্থবিবরণমারভ্যতে। য ইমাং ব্রহ্মবিদ্যামুপয়ন্ত্যাত্মভাবেন শ্রদ্ধাভক্তিপুরঃসরাঃ সন্তঃ, তেষাং গর্ভজন্ম- জরা-রোগাদ্যনর্থপূগং নিশাতয়তি পরং বা ব্রহ্ম গময়তি, অবিদ্যাদিসংসারকারণঞ্চ অত্যন্তমবসাদয়তি—বিনাশয়তি, ইত্যুপনিষৎ। উপনিপূর্ব্বস্য সদেরেবমর্থস্মরণাৎ ॥

ভাষ্যাবতরণিকা।

“ব্রহ্মা দেবানাং” ইত্যাদি উপনিষৎটি অথর্ব্ব-বেদীয় উপনিষৎ; শ্রুতি নিজেই স্তুতির প্রশংসার উদ্দেশে ইহার বিদ্যা-সম্প্রদায়-প্রবর্ত্তক- গণের পারম্পর্য্যরূপ সম্বন্ধ প্রথমেই বলিয়া দিতেছেন, অর্থাৎ উত্তরোত্তর কে কাহার নিকট এই বিদ্যা প্রাপ্ত হইলেন, তাহার ক্রম বলিতেছেন। অভিপ্রায় এই যে; এই বিদ্যা পরম পুরুষার্থ মোক্ষ- সাধন; এই নিমিত্ত মহাত্মারা এইরূপ অতিকষ্টে প্রভূত পরিশ্রমে এই বিদ্যা লাভ করিয়াছিলেন; এইরূপে শ্রোতৃগণের হৃদয়ে রুচি- সমুৎপাদনার্থ বিদ্যার প্রশংসা করিতেছেন। কারণ প্রশংসা দ্বারা মনঃপ্রিয় হইলেই বিদ্যাবিষয়ে শ্রোতৃবর্গ সাদরে প্রবৃত্ত হইতে পারেন,(নচেৎ নহে)

প্রয়োজনের সহিত ব্রহ্মবিদ্যার সাধ্য-সাধন-রূপ সম্বন্ধ, অর্থাৎ বিদ্যা সাধন বা ফল, আর প্রয়োজন তাহার সাধ্য; ইহা “ভিদ্যতে হৃদয়- গ্রন্থিঃ” ইত্যাদি বাক্যে কথিত হইবে। এখানে কেবলই বিধি-নিষেধ প্রতিপাদনে তৎপর, অপর—শব্দবাচ্য ঋগ্বেদাদি বিদ্যাতে(অপরা

৪ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

বিদ্যাতে) যে, সংসার-কারণীভূত অবিদ্যাদি দোষ নিবর্তিত হয় না, ইহা নিজেই, পরা ও অপরা বিদ্যার বিভাগ নিরূপণপূর্ব্বক ‘যাহারা অবিদ্যার মধ্যে বর্তমান’, ইত্যাদি বাক্যে প্রতিপাদন করিয়াছেন; অনন্তর ‘কৰ্ম্মফল সমূহ পরীক্ষা করিয়া, ইত্যাদি বাক্য দ্বারাও সাধন- সাধ্য( ক্রিয়াসাধ্য) সর্ব বিষয়ে বৈরাগ্য প্রদর্শনপূর্ব্বক পরব্রহ্ম প্রাপ্তির উপায়ীভূত গুরুপ্রসাদ-লভ্য ব্রহ্মবিদ্যা বলিতেছেন। তাহার পর ‘ব্রহ্মবিৎ’ পুরুষ ব্রহ্মই হন, ‘এবং সকলে পরমামৃতস্বরূপ-প্রাপ্ত বিমুক্ত হন।’ এই সকল বাক্যেও বিদ্যার প্রয়োজন বারংবার বলিতেছেন।

যদিও জ্ঞানলাভে সমস্ত আশ্রমবাসীরই অধিকার তুল্য; তথাপি ব্রহ্মবিদ্যা যে কেবল-সন্ন্যাস-গত হইয়াই মোক্ষ সাধন হয়, কৰ্ম্ম সহকারে হয় না, ইহাও ‘সংন্যাস অবলম্বনপূর্ব্বক[যাহারা] ভৈক্ষ্যচর্য্যা আচরণ করেন’ ইত্যাদি বাক্য বলিয়া প্রদর্শন করি- তেছেন। বিদ্যা ও কর্ম্মের পরস্পর বিরোধও ইহার অপর হেতু; কারণ ব্রহ্ম ও আত্মার একত্বানুভূতির সহিত একত্র কৰ্ম্ম সম্পাদন করা স্বপ্নেও সম্ভবপর হয় না। বিশেষতঃ বিদ্যাসম্বন্ধে কাল-বিশেষের কোন নিয়ম নাই; সুতরাং তাহার নিমিত্ত বা উৎপত্তি-কারণ সম্বন্ধেও কোন নিয়ম থাকিতে পারে না; এই কারণে কালবিশেষ দ্বারাও উহার সঙ্কোচ করা যুক্তিসিদ্ধ হয় না।

গৃহস্থগণের সম্বন্ধেও যে, ব্রহ্মবিদ্যা-প্রবর্ত্তক সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব সূচক নিদর্শন দেখা যায়, তাহা কখনই পূর্ব্ব প্রদর্শিত স্থিরতর নিয়মের বাধা.করিতে সমর্থ হয় না। কারণ, শত শত বিধি দ্বারাও আলোক ও অন্ধকারের একত্র সদ্ভাব সম্পাদন করিতে পারা যায় না; ঐরূপ সূচক বাক্যের আর কথা কি? এইরূপে যাহার সম্বন্ধ ও প্রয়োজন কথিত হইল; সেই উপনিষদের(এই মুণ্ডকোপনিষদের) অল্লাক্ষরযুক্ত(অনতিবিস্তীর্ণ) বিবরণ গ্রন্থ আরব্ধ হইতেছে—

খণ্ডঃ।] প্রথমং মুণ্ডকম্। ৫

যে সকল সজ্জন শ্রদ্ধা-ভক্তি পুরঃসর এই ব্রহ্মবিদ্যাকে আত্ম- ভাবে আশ্রয় করেন, ইহা তাঁহাদের গর্ভবাস, জন্ম, জরা ও রোগাদি অনর্থরাশি বিনষ্ট করে, অথবা ব্রহ্ম-প্রাপ্তি ঘটায় এবং সংসার- কারণীভূত অবিদ্যা প্রভৃতি দোষসমূহ অবসন্ন করে--বিনষ্ট করিয়া দেয় বলিয়া[ব্রহ্মবিদ্যা] উপনিষৎ-পদবাচ্য হয়। কারণ, উপ+নি পূর্ব্বক সদ্ ধাতুর এইরূপ অর্থই স্মরণ করা হইয়া থাকে(৩)।

ওঁ ॥ ব্রহ্মা দেবানাং প্রথমঃ সম্বভূব।

বিশ্বস্য কর্ত্তা ভূবনস্য গোপ্তা ॥

স ব্রহ্মবিদ্যাং সর্ব্ববিদ্যাপ্রতিষ্ঠাম্ অথর্ব্বায় জ্যেষ্ঠপুত্রায় প্রাহ ॥ ১ ॥

[ প্রণম্য গুরুপাদাজং স্মৃতা শঙ্করসম্মতিম্। মুণ্ডকোপনিষদ্ব্যাখ্যা সরলাখ্যা বিতন্যতে ॥

বিশ্বস্য(জগতঃ) কর্তা(উৎপাদকঃ), ভুবনস্য(উৎপন্নস্য চ জগতঃ) গোপ্তা(পালকঃ) ব্রহ্মা(হিরণ্যগর্ভঃ) দেবানাং(ইন্দ্রাদীনাং), প্রথমঃ [সন্] সংবভূব(প্রাদুরভূৎ)। সঃ(ব্রহ্মা) অথর্ব্বায়(অথর্ব্বনামে) জেষ্ঠ-পুত্রায় সর্ব্ববিদ্যা-প্রতিষ্ঠাং(সর্ব্বাসাং বিদ্যানাং অভিব্যক্তি-হেতুভূতাং) ব্রহ্মবিদ্যাং(ব্রহ্মবিষয়াং, ব্রহ্মণা প্রোক্তাং বা বিদ্যাং পরাপরলক্ষণাং) প্রাহ(অকথয়ৎ) ॥

সমস্ত জগতের কর্তা(উৎপাদক) এবং উৎপন্ন জগতের পরিরক্ষক ব্রহ্মা দেবগণের প্রধানরূপে প্রথমে প্রাদুর্ভূত হইয়াছিলেন। তিনি অথর্ব্বনামক জ্যেষ্ঠ পুত্রকে সর্ব্ববিদ্যার আকর ব্রহ্মবিদ্যা উপদেশ করিয়াছিলেন ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

ব্রহ্মা পরিবৃঢ়ো মহান্ ধৰ্ম্ম-জ্ঞান-বৈরাগ্যৈশ্বর্য্যৈঃ সর্ব্বান্ অন্যানতিশেত ইতি। দেবানাং দ্যোতনবতামিন্দ্রাদীনাং প্রথমো গুণৈঃ প্রধানঃ সন্ প্রথমোহগ্রে বা

৩ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

সম্বভূব অভিব্যক্তঃ সম্যক্ স্বাতন্ত্র্যেণেত্যভিপ্রায়ঃ। ন তথা, যথা ধৰ্মাধৰ্ম্মবশাৎ সংসারিণোহন্যে জায়ন্তে। “যোহসাবতীন্দ্রিয়োহগ্রাহ্যঃ”ইত্যাদিস্মৃতেঃ। বিশ্বস্য সর্ব্বস্য জগতঃ কর্তা উৎপাদয়িতা। ভুবনস্য উৎপন্নস্য গোপ্তা পালয়িতেতি বিশেষণং ব্রহ্মণো বিদ্যাস্তুতয়ে। স এবং প্রখ্যাতমহত্ত্বো ব্রহ্মবিদ্যাং ব্রহ্মণঃ পরমাত্মনো বিদ্যাং ব্রহ্ম- বিদ্যাং, “যেনাক্ষরং পুরুষং বেদ সত্যম্” ইতি বিশেষণাৎ পরমাত্মবিষয়া হি সা। ব্রহ্মণা বা অগ্রজেনোক্তেতি ব্রহ্মবিদ্যা। তাং ব্রহ্মবিদ্যাং সর্ব্ববিদ্যা-প্রতিষ্ঠাং সর্ব্ববিদ্যাভিব্যক্তিহেতুত্বাৎ সর্ব্ববিদ্যাশ্রয়ামিত্যর্থঃ। সর্ব্ববিদ্যা-বেদ্যং বা বস্তু অনয়ৈব বিজ্ঞায়ত ইতি, “যেনাশ্রুতং শ্রুতং ভবতি, অমতং মতমবিজ্ঞাতং বিজ্ঞাতম্” ইতি শ্রুতেঃ। সব্ববিদ্যাপ্রতিষ্ঠামিত চ স্তৌতি বিদ্যাম্। অথর্ব্বায় জ্যেষ্ঠপুত্রায় -- জ্যেষ্ঠশ্চাসৌ পুত্রশ, অনেকেষু ব্রহ্মণঃ সৃষ্টিপ্রকারেঘন্যতমস্য সৃষ্টি প্রকারস্য প্রমুখে পূর্ব্বম্ অথর্ব্বা সৃষ্ট ইতি জ্যেষ্ঠঃ; তস্মৈ জ্যেষ্ঠপুত্রায় প্রাহ উক্তবান্ ॥ ১॥

ভাষ্যানুবাদ।

ধৰ্ম্ম, জ্ঞান, বৈরাগ্য ও ঐশ্বর্য্য দ্বারা সর্বাতিশায়ী মহান্ প্রভু ব্রহ্মা দীপ্তিমান্ ইন্দ্রাদি দেবগণের মধ্যে নানা গুণে প্রথম অর্থাৎ প্রধান হইয়া অথবা তাহাদেরও প্রথমে সম্ভূত হইয়াছিলেন। অভিপ্রায় এই যে, তিনি স্বতন্ত্র বা স্বেচ্ছাধীন হইয়া যথাযথরূপে অভিব্যক্ত হইয়া- ছিলেন; কিন্তু অপরাপর সংসারিগণ যেরূপ ধর্ম্মাধর্ম্ম পরবশ হইয়া জন্ম লাভ করে, তিনি সেরূপ করেন নাই। কারণ মনুস্মৃতি বলিয়াছেন যে, ‘এই যিনি(হিরণ্যগর্ভ) অতীন্দ্রিয় ও মনের অগ্রাহ্য।’[তিনি] বিশ্বের—সমস্ত জগতের কর্তা—উৎপাদক, এবং উৎপন্ন জগতের গোপ্তা—পালনকর্ত্তা। উক্ত বিশেষণটি ব্রহ্ম-বিদ্যার প্রশংসার্থ [প্রযুক্ত হইয়াছে]। ঈদৃশ প্রসিদ্ধ মহিমান্বিত সেই ব্রহ্মা ব্রহ্মবিদ্যাকে অর্থাৎ ব্রহ্ম অর্থ পরমাত্মা, তদ্বিষয়ক বিদ্যা—ব্রহ্ম-বিদ্যা; পরেই ‘যাহা দ্বারা সত্য অক্ষর পুরুষকে জানা যায়’ এইরূপ বিশেষণ থাকায় এই বিদ্যাকে পরমাত্ম-বিষয়ক[বলিতে হইবে], অথবা প্রথম জাত ব্রহ্মাকর্তৃক উক্ত হইয়াছে বলিয়াই ইহা ‘ব্রহ্মবিদ্যা’ পদবাচ্য।

খণ্ডঃ।] প্রথমং মুণ্ডকম্। ৭

সর্ববিদ্যার অভিব্যক্তির নিদান বলিয়া অথবা ‘যাহা দ্বারা অশ্রুত বিষয়ও শ্রুত হয়, অমত(অচিন্তিত) বিষয়ও মত হয় এবং অবিজ্ঞাত বিষয়ও বিজ্ঞাত হয়,’ এই শ্রুতি অনুসারে জানা যায় যে, অন্যান্য বিদ্যা দ্বারা যাহা যাহা জ্ঞাতব্য, এই বিদ্যাদ্বারা তৎসমুদয়ও বিজ্ঞাত হয়; এই জন্যই সর্ববিদ্যার আশ্রয়রূপা—‘সর্ববিদ্যাপ্রতিষ্ঠা’ পদবাচ্য হয়। অবশ্য, ‘সর্ববিদ্যা-প্রতিষ্ঠা’ এই বিশেষণটি বিদ্যার প্রশংসা- সূচক মাত্র; সর্ববিদ্যা-প্রতিষ্ঠারূপা সেই ব্রহ্মবিদ্যা জ্যেষ্ঠপুত্র অথর্বকে বলিয়াছিলেন। ব্রহ্মার বহুবিধ সৃষ্টি আছে, তন্মধ্যে কোন একটি সৃষ্টির প্রারম্ভে প্রথমেই ‘অথর্ব ঋষি সৃষ্ট হইয়াছিলেন; এই জন্য তিনি জ্যেষ্ঠ; সেই জ্যেষ্ঠ পুত্রকে বলিয়াছিলেন ॥ ১ ॥

অথর্ব্বণে যাং প্রবদেত ব্রহ্মা খর্ব্বা তাং পুরোবাচঙ্গিরে ব্রহ্মবিদ্যাম্।

স ভারদ্বাজায় সত্যবহায়( ণ) প্রাহ ভারদ্বাজোহঙ্গিরসে পরাবরাম্ ॥ ২

[ ইদানীং বিদ্যায়াঃ সম্প্রদায়পারম্পর্য্যমাহ]—“অথর্ব্বণে” ইত্যাদিনা। ব্রহ্মা (আদিপুরুষঃ) অথর্ব্বণে(অথর্ব্বসংজ্ঞকায় ঋষয়ে) যাং(ব্রহ্মবিদ্যাং) প্রবদেত (প্রোক্তবান্); অথর্ব্বা(ব্রহ্মশিষ্যঃ) পুরা(প্রথমং) তাং(ব্রহ্মণঃ প্রাপ্তাং) ব্রহ্মবিদ্যাং অঙ্গিরে(তন্নামকায় ঋষয়ে) উবাচ(উক্তবান্)। সঃ(অঙ্গীঃ) ভারদ্বাজায় (ভরদ্বাজবংশজাতায়) সত্যবহায়(তন্নামধেয়ায়) প্রাহ[তাং ব্রহ্মবিদ্যামিতি শেষঃ]। ভারদ্বাজঃ[পুনঃ] পরাবরাং(পরস্মাৎ পরস্মাৎ আচার্য্যাৎ অবরেণ অবরেণ শিষ্যেণ প্রাপ্তাং ব্রহ্মবিদ্যাং) অঙ্গিরসে(অঙ্গিরঃসংজ্ঞকায় ঋষয়ে) [ প্রোবাচ ইতি শেষঃ] ॥

এখন ব্রহ্মবিদ্যা-প্রবর্ত্তক সম্প্রদায় ক্রম বলা হইতেছে—আদি পুরুষ ব্রহ্মা অথর্ব্বন্ ঋষিকে যে ব্রহ্মবিদ্যা বলিয়াছিলেন, অথর্ব্বা সর্ব্বপ্রথম সেই বিদ্যা অঙ্গিরনামক ঋষিকে বলেন; তিনি ভরদ্বাজবংশীয় সত্যবহকে বলেন; ভারদ্বাজ

৮ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

আবার পূর্ব্ব পূর্ব্ব গুরু হইতে পরবর্তী শিষ্যগণকর্ত্তৃক লব্ধ এই বিদ্যা অঙ্গিরা ঋষিকে বলিয়াছিলেন ॥ ২

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

যাম্ এতাম্ অথর্ব্বণে প্রবদেত প্রাবদৎ ব্রহ্মবিদ্যাং ব্রহ্মা, তামেব ব্রহ্মণঃ প্রাপ্তাম্ অথর্ব্বা পুরা পূর্ব্বম্ উবাচ উক্তবান্ অঙ্গিরে অঙ্গীর্নামে ব্রহ্মবিদ্যাম্। স চাঙ্গীঃ ভার- দ্বাজায় ভরদ্বাজগোত্রায় সত্যবহনায় সত্যবহনাম্নে প্রাহ প্রোক্তবান্। ভারদ্বাজঃ অঙ্গিরসে স্বশিষ্যায় পুত্রায় বা পরাবরাং পরস্মাৎ পরস্মাদবরেণ প্রাপ্তেতি পরাবরা, পরাবরসর্ব্ববিদ্যাবিষয়ব্যাপ্তের্ব্বা, তাং পরাবরামঙ্গিরসে প্রাহেত্যনুষঙ্গঃ ॥ ২ ॥

ভাষ্যনুবাদ।

ব্রহ্মা এই যে ব্রহ্ম-বিদ্যা অথর্বকে বলিয়াছিলেন; ব্রহ্মা হইতে লব্ধ সেই বিদ্যাকেই আবার অথর্বা প্রথমে অঙ্গিরনামক ঋষির উদ্দেশে বলেন; অঙ্গির আবার ভারদ্বাজ—ভরদ্বাজগোত্রীয় সত্যবহকে অর্থাৎ সত্যবহনামক ঋষির উদ্দেশে বলেন; ভারদ্বাজ আবার অঙ্গিরস্নামক স্বীয় শিষ্য কিংবা পুত্রের উদ্দেশে সেই পরাবরা বিদ্যা বলিয়াছিলেন। ‘পরাবরা’ অর্থ—পূর্ব্ব পূর্ব্ব[ আচার্য্য] হইতে অবর—শিষ্যগণকর্তৃক প্রাপ্তা; অথবা পরাবিদ্যা ও অবরা বিদ্যার যাহা যাহা জ্ঞাতব্য বিষয়, তৎসমস্তই ইহার অন্তর্নিহিত আছে।[ শেষ বাক্যে ক্রিয়াপদ না থাকিলেও] পূর্ব্বোক্ত ‘প্রাহ’( বলিয়াছিলেন) এই ক্রিয়ার সহিত সম্বন্ধ করিতে হইবে ॥ ২ ॥

শৌনকো হ বৈ মহাশালোহঙ্গিরসং বিধিবদুপসন্নঃ পপ্রচ্ছ। কস্মিন্নু ভগবৌ বিজ্ঞাতে সর্ব্বমিদং বিজ্ঞাতং ভবতীতি ॥ ৩ ॥

মহাশালঃ(গৃহস্থপ্রধানঃ) শৌনকঃ(শুনকনন্দনঃ) হ(ঐতিহ্যসূচকং) বৈ(প্রসিদ্ধৌ) বিধিবৎ(যথাবিধি) উপসন্নঃ(উপস্থিতঃ সন্) অঙ্গিরসং (তন্নামকং ভারদ্বাজশিষ্যং) পপ্রচ্ছ(পৃষ্টবান্)। মু(প্রশ্নে বিতর্কে বা) ভগবঃ (ভগবন্,) কস্মিন্(বস্তুনি) বিজ্ঞাতে(সতি) ইদং(পরিদৃশ্যমানং) সর্ব্বং(জগৎ) বিজ্ঞাতং(বিশেষেণ জ্ঞানগোচরং) ভবতি? ইতি॥

খণ্ডঃ।] প্রথমং মুণ্ডকম্। ৯

গৃহস্থপ্রধান শৌনক যথাবিধি উপস্থিত হইয়া অঙ্গিরাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন,—ভগবন্, কাহাকে জানিলে এই সমস্ত(জগৎ) বিজ্ঞাত হয় ॥

শঙ্কর ভাষ্যম্।

শৌনকঃ শুনকস্যাপত্যং মহাশালো মহাগৃহস্থঃ অঙ্গিরসং ভারদ্বাজ-শিষ্যমাচার্য্যং বিধিবদ যথাশাস্ত্রমিত্যেতৎ; উপসন্ন উপগতঃ সন্ পপ্রচ্ছ পৃষ্টবান্। শৌনকাঙ্গিরসোঃ সম্বন্ধাদর্ব্বাক বিধিবদবিশেষনাভাবাৎ উপসদনবিধেঃ পূর্ব্বেযামনিয়ম ইতি গম্যতে। মর্য্যাদাকরণার্থং বিশেষণম্। মধ্যদীপিকান্যায়ার্থং বা বিশেষণম্, অস্মদাদিঘপি উপসদনবিধেরিষ্টত্বাৎ। কিমিত্যাহ-কস্মিন্ নু ভগবো বিজ্ঞাতে, নু ইতি বিতর্কে, ভগবো হে ভগবন্ সর্ব্বং যদিদং বিজ্ঞেয়ং বিজ্ঞাতং বিশেষেণ জ্ঞাতম্ অবগতং ভবতীতি ‘একস্মিন্ বিজ্ঞাতে সর্ব্ববিদ্ভবতি, ইতি শিষ্টপ্রবাদং শ্রুতবান্ শৌনকঃ তদ্বিশেষং বিজ্ঞাতুকামঃ সন্ কস্মিন্নিতি বিতর্কয়ন্ পপ্রচ্ছ। অথবা, লোকসামান্যদৃষ্ট্যা জ্ঞাত্বৈব পপ্রচ্ছ। সন্তি হিলোকে সুবর্ণাদিশকলভেদাঃ সুবর্ণত্বাদ্যেকত্ববিজ্ঞানেন বিজ্ঞায়মানা লৌকিকৈঃ। তথা কিংনু অস্তি সর্ব্বস্য জগভেদস্যৈকং কারণং, যত্রৈকস্মিন(ক) বিজ্ঞাতে সর্ব্বং বিজ্ঞাতংভবতীতি।

নন্ববিদিতে হি ‘কস্মিন্’ ইতি প্রশ্নোহনুপপন্নঃ; ‘কিমস্তি তৎ’ইতি তদা প্রশ্নো যুক্তঃ; সিদ্ধে হ্যস্তিত্বে কস্মিন্নিতি স্যাৎ; যথা কস্মিন্নিধেয়মিতি। ন, অক্ষর- বাহুল্যাদায়াস-ভীরুত্বাৎ প্রশ্নঃ সম্ভবত্যেব—কিন্বস্তি তদ্‌, যস্মিন্নেকস্মিন্ বিজ্ঞাতে সর্ব্ববিৎ স্যাদিতি ॥ ৩

ভাষ্যানুবাদ।

মহাল অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ গৃহস্থ শুনকপুত্র—শৌনক ভারদ্বাজশিষ্য আচার্য্য অঙ্গিরার নিকট যথাবিধি—শাস্ত্রানুসারে উপসন্ন বা উপস্থিত হইয়া প্রশ্ন করিয়াছিলেন।—শৌনক ও অঙ্গিরার গুরুশিষ্য সম্বন্ধের পূর্ব্বে ‘বিধিবৎ’ বিশেষণ না থাকায় জানা যায় যে, তৎপূর্ববর্তীদিগের সম্বন্ধে ‘উপসদন’-বিধির কোন নিয়ম বা আবশ্যকতা ছিল না।[ এখান হইতেই যে, উপসদন-পদ্ধতি আরব্ধ হইল, এই] সীমা নির্দেশার্থ, অথবা আমাদের পক্ষেও যখন উপসদন-বিধি অভীষ্ট বা বাঞ্ছনীয়, তখন

১০ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

‘মধ্যদীপিকা’ ন্যায়ে ‘বিধিবৎ’ বিশেষণটি[প্রদত্ত হইয়াছে](৪)। কি? [বলিয়াছিলেন?] তাহা বলিতেছেন “কস্মিন্ নু ভগবো বিজ্ঞাতে”। এখানে ‘নু’ শব্দের অর্থ বিতর্ক(সংশয়); হে ভগবঃ!—ভগবন্! কোন্ পদার্থটি বিজ্ঞাত হইলে এই সমস্ত বিজ্ঞেয় বস্তু বিজ্ঞাত অর্থাৎ বিশেষ- রূপে জ্ঞাত—অবগত হইয়া থাকে। একটি(জানিলেই যে, সর্ববিৎ হওয়া যায়; শৌনক এইরূপ শিষ্ট প্রবাদ(সাধুজনের উক্তি) জানি-- তেন; তাই তিনি তদ্বিষয়ে বিশেষ অবস্থা জানিতে ইচ্ছুক হইয়া ‘কোন্টি’ এইরূপ বিতর্কপূর্ব্বক প্রশ্ন করিয়াছিলেন। অথবা, সাধারণ দৃষ্টিতে জানিয়াই প্রশ্ন করিয়াছিলেন; সাধারণ লোকেরাও যেরূপ সুবর্ণত্বাদির একত্ববিজ্ঞানে সুবর্ণাদির অংশগত ভেদ সমূহ অবগত হইয়া থাকে; সেইরূপ বিভিন্নপ্রকার সমস্ত জগতেরও এমন কোনও একটি কারণ আছে কি? যাহাতে একটি মাত্র বিজ্ঞাত হইলেই সমস্ত জগৎ বিজ্ঞাত হইতে পারে?

প্রশ্ন হইতেছে যে, পূর্ব্বে যে বিষয় জানা নাই, তদ্বিষয়ে ত ‘কস্মিন্’ (কোন্টি), এইরূপ প্রশ্ন উপপন্ন হইতে পারে না? পরন্তু তখন ‘সেরূপ কি কিছু আছে?’ এইরূপ প্রশ্নই যুক্তিযুক্ত হয়। কেন না, অস্তিত্ব প্রসিদ্ধ থাকিলেই তদ্বিষয়ে ‘কস্মিন্’(কোন্টি) এইরূপ বিশেষ প্রশ্ন হইতে পারে; যেমন ‘কোথায় স্থাপন করিতে হইবে?’ [এইরূপ প্রশ্ন হইয়া থাকে]। না—এ আপত্তি হইতে পারে না; [ঐরূপ প্রশ্নে] কথা বাড়িয়া যায়, সুতরাং শ্রমবাহুল্য ঘটে; সেই ভয়ে[এই প্রকার] অল্প কথায় প্রশ্ন করা অবশ্যই সম্ভবপর হয় যে, তেমন পদার্থ কি আছে, যাহা একটি মাত্র জানিলেই সর্ববিৎ হইতে পারা যায়(‘৫) ॥ ৩ ॥

(৪) তাৎপর্য্য—মধ্যস্থলে দীপ থাকিলে সে যেমন উভয় দিক্ই প্রকাশ করে, সেইরূপ এই ‘বিধিবৎ’ বিশেষণটিও শৌনক ও তৎপরবর্তী শিষ্যদিগেরও উপসদনের বিধি জ্ঞাপন করিতেছে।

খণ্ডঃ।] প্রথমং মুণ্ডকম্। ১১

তস্মৈ স হোবাচ। দ্বে বিদ্যে বেদিতব্য ইতি হ স্ম যদ্ ব্রহ্মবিদো বদন্তি—পরা চৈবাপরা চ ॥ ৪ ॥

[শৌনক-প্রশ্নস্যোত্তরং বক্ত মুপক্রমতে “তস্মৈ” ইত্যাদিনা।]—সঃ(অঙ্গিরাঃ) হ(ঐতিহ্যে) তস্মৈ(শৌনকায়) উবাচ—(উক্তবান্) যৎ ব্রহ্মবিদঃ (বেদতত্ত্বজ্ঞাঃ) হস্ম(কিল) পরা(পরমাত্মবিষয়া) চ, অপরা(ধর্মাধর্মাদি- বিষয়া) চ(অপি), এব(নিশ্চয়ে) দ্বে(পরাপরালক্ষণে) বিদ্যে(জ্ঞানরূপে) বেদিতব্যে(জ্ঞাতব্যে) ইতি বদন্তি(কথয়ন্তি)[বদন্তি স্ম(উক্তবন্তঃ, ইতি বা)] ॥

অঙ্গিরা শৌনকের উদ্দেশে বলিলেন যে, ব্রহ্মবিদ্গণ(বেদতাৎপর্য্য- বেত্তারা) এইরূপ বলিয়া থাকেন যে, পরা ও অপরা, এই দুইটি বিদ্যা অবশ্য জানিতে হয় ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

তস্মৈ শৌনকায় সঃ অঙ্গিরা আহ কিলোবাচ। কিমিতি? উচ্যতে-দ্বে বিদ্যে বেদিতব্যে জ্ঞাতব্যে ইতি। এবং হ স্ম কিল যব্রহ্মবিদো বেদার্থাভিজ্ঞাঃ পরমার্থদর্শিনো বদন্তি। কে তে? ইত্যাহ-পরা চ পরমাত্মবিদ্যা, অপরা চ ধৰ্ম্মাধর্মসাধন-তৎফলবিষয়া।

ননু ‘কস্মিন্ বিদিতে সর্ব্ববিদ্ভবতি’ ইতি শৌনকেন পৃষ্টং; তস্মিন্ বক্তব্যেহ- পৃষ্টমাহ অঙ্গিরা “দ্বে বিদ্যে” ইত্যাদি। নৈষ দোষঃ, ক্রমাপেক্ষত্বাৎ প্রতিবচনস্য। অপরা হি বিদ্যা অবিদ্যা, সা নিরাকর্ত্তব্যা; তদ্বিষয়ে হি বিদিতে ন কিঞ্চিৎ

১২ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

তত্ত্বতো বিদিতং স্যাদ, ইতি; ‘নিরাকৃত্য হি পূর্ব্বপক্ষং পশ্চাৎ সিদ্ধান্তো বক্তব্যো ভবতি’ ইতি ন্যায়াৎ ॥ ৪ ॥’

ভাষ্যানুবাদ।

আবার সেই অঙ্গিরা সেই শৌনকের উদ্দেশে বলিয়াছিলেন; কি? [তাহা] বলা হইতেছে,—দুইটি বিদ্যা জানিতে হইবে, ইহা ব্রহ্মবিৎ— বেদার্থাভিজ্ঞ অর্থাৎ পরমার্থদর্শিগণ বলিয়া থাকেন। সেই দুইটি কি? তাহা বলিতেছেন—পরা ও অপরা। পরমাত্মবিষয়ক বিদ্যা পরা, আর ধৰ্ম্ম, অধৰ্ম্ম ও তৎসাধনবিষয়ক বিদ্যা অপরা।

ভাল, শৌনক প্রশ্ন করিয়াছিলেন কোন্টি বিজ্ঞাত হইলে সর্বজ্ঞ হইতে পারা যায়; এখানে তাহাই বলা আবশ্যক, কিন্তু অঙ্গিরা তাহা না বলিয়া ‘দুইটি বিদ্যা’ ইত্যাদি অজিজ্ঞাসিত বিষয় বলিতেছেন! না,—এ দোষ হয় না; কারণ প্রশ্নোত্তরটি ক্রম-সাপেক্ষ।[অভিপ্রায় এই যে,] অপরা বিদ্যা প্রকৃত পক্ষে অবিদ্যাই বটে; কেন না, অপরা বিদ্যার জ্ঞাতব্য বিষয় বিজ্ঞাত হইলেও বস্তুতঃ কোন তত্ত্বই বিদিত হয় না। অতএব ‘প্রথম কল্পিত(অসৎ) পক্ষ প্রতিষেধ করিয়া পরে সিদ্ধান্ত পক্ষ বলিতে হয়’; এই নিয়মানুসারে অপরা বিদ্যার প্রত্যাখ্যান করা আবশ্যক।[উক্ত ক্রম-নিয়মানুসারে প্রথমে প্রত্যাখ্যেয় বিষয় নির্দেশ করিয়া পশ্চাৎ সিদ্ধান্তরূপে এক-বিজ্ঞানে সর্ব-বিজ্ঞানরূপ পরা বিদ্যার বিষয় বর্ণিত হইবে] ॥ ৪ ॥

তত্রাপরা—ঋগ্বেদো যজুর্ব্বেদঃ সামবেদোহথর্ব্ববেদঃ শিক্ষা কল্লো ব্যাকরণং নিরুক্তং ছন্দো জ্যোতিষমিতি। অথ পরা— যয়া তদক্ষরমধিগম্যতে ॥ ৫ ॥

[ইদানীং পরাপরবিদ্যয়োঃ স্বরূপং বিভজ্যাহ তত্রেতি।]—তত্র(তয়োঃ পরাপরয়োঃ মধ্যে) অপরা(বিদ্যা)[উচ্যতে]।[কা সা? ইত্যাহ] ঋগ্বেদঃ, যজুর্ব্বেদঃ, সামবেদঃ, অথর্ব্ববেদঃ,[এতে চ দ্বারো বেদাঃ], শিক্ষা

খণ্ডঃ।] প্রথমং মুক্তকম্। ১৩
(খ) সঙ্গতোহপি ‘উক্তা’ইতি পাঠঃ বহুযু পুস্তকেষু নোপলভ্যতে। (গ) ‘মার্থস্য ভেদঃ’ ইতি কচিৎ কচিৎ পাঠঃ। (ঘ) ‘যাশ কাশ্চ কুদুষ্টয়ঃ’ ইত্যংশঃ সাধীয়ানপি বহুযু পুস্তকেষু পরিত্যক্তঃ

(বর্ণোচ্চারণাদিবিষয়কঃ গ্রন্থঃ), কল্পঃ(কর্মানুষ্ঠানজ্ঞাপকঃ শ্রৌতসূত্রগ্রন্থঃ), ব্যাকরণং, নিরুক্তং(বৈদিকশব্দানাং অর্থপ্রকাশকং), ছন্দঃ, জ্যোতিষং, [এতানি ষট, বেদাঙ্গানি], ইতি,(ইতি শব্দঃ অপরা বিদ্যা সমাপ্তিসূচকঃ), [অপরাণ্যপি শাস্ত্রাণি যথাযোগং অত্রৈবান্তর্ভাব্যানি ইত্যাশয়ঃ]। অথ(অনন্তরং) পরা(বিদ্যা)[উচ্যতে],[কা সা? ইত্যাহ] যয়া(বিদ্যয়া) তৎ(অনন্তর মেব কথ্যমানং) অক্ষরং(ব্রহ্ম) অধিগম্যতে(অভিন্নতয়া প্রাপ্যতে) ॥

সেই উভয় বিদ্যার মধ্যে অপরা বিদ্যা কথিত হইতেছে—ঋগ্বেদ, যজুর্ব্বেদ, সামবেদ, অথর্ব্ববেদ, শিক্ষা, কল্পসূত্র, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দঃশাস্ত্র ও জ্যোতিষ। অনন্তর পরা বিদ্যা কথিত হইতেছে, যাহা দ্বারা সেই অক্ষর ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হওয়া যায় ॥

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

তত্র কা অপরা? ইত্যুচ্যতে—ঋগ্বেদো যজুর্ব্বেদঃ সামবেদোহথর্ব্ববেদ ইত্যেতে চত্বারো বেদাঃ। শিক্ষা কল্লো ব্যাকরণং নিরুক্তং ছন্দো জ্যোতিষম্, ইত্যঙ্গানি ষট্, এষা অপরাবিদ্যা উক্তা(খ)। অথেদানীমিয়ং পরা বিদ্যোচ্যতে-- যয়া তৎ বক্ষ্যমাণবিশেষণমক্ষরমধিগম্যতে প্রাপ্যতে; অধিপূর্ব্বস্য গমেঃ প্রায়শঃ প্রাপ্ত্যর্থত্বাৎ; ন চ পরপ্রাপ্তেরবগমার্থস্য চ(গ) ভেদোহস্তি; অবিদ্যায়া অপায় এব হি পরপ্রাপ্তিনার্থান্তরম্।

ননু ঋগ্বেদাদিবাহ্যা তহি সা কথং পরা বিদ্যা স্যান্মোক্ষসাধনঞ্চ? “যা বেদ- বাহ্যাঃ স্মৃতয়ো যাশ্চ কাশ্চ কুদৃষ্টয়ঃ”(ঘ) ইতি হি স্মরন্তি। কুদৃষ্টিত্বান্নিষ্কলত্বাদ- নাদেয়া স্যাৎ; উপনিষদাঞ্চ ঋগ্বেদাদিবাহ্যত্বং স্যাৎ। ঋগ্বেদাদিত্বে তু পৃথক্করণ- মনর্থকম্ “অথ পরা” ইতি। ন; বেদ্যবিষয়বিজ্ঞানস্য বিবক্ষিতত্বাৎ। উপ- নিষদ্-বেদ্যাক্সরবিষয়ং হি বিজ্ঞানমিহ পরা বিদ্যেতি প্রাধান্যেন বিবক্ষিতং, নোপনিষচ্ছব্দরাশিঃ। বেদশব্দেন তু সর্ব্বত্র শব্দরাশিবিবক্ষিতঃ। শব্দরাশ্য- ধিগমেহপি যত্নান্তরমন্তরেণ গুর্ব্বভিগমনাদিলক্ষণং বৈরাগ্যঞ্চ নাক্ষরাধিগমঃ সম্ভব- তীতি পৃথক্করণং ব্রহ্মবিদ্যায়াঃ, পরা বিদ্যাইতি কথনঞ্চেতি॥ ৫ ॥

১৪ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

ভাষ্যানুবাদ।

তন্মধ্যে অপরা কি? তাহা বলা হইতেছে—ঋগ্বেদ, যজুর্ব্বেদ, সাম- বেদ ও অর্থর্ববেদ, এই চারিটি বেদ; শিক্ষা, কল্পসূত্র, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দঃশাস্ত্র ও জ্যোতিষ, এই ছয়টি বেদাঙ্গ; ইহাই অপরা বিদ্যা বলিয়া উক্ত। অতঃপর এখন পরা বিদ্যা কথিত হইতেছে—যাহা দ্বারা সেই বক্ষ্যমাণ বিশেষণবিশিষ্ট অক্ষর ব্রহ্মকে অধিগত অর্থাৎ প্রাপ্ত হওয়া যায়; কারণ ‘অধি’পূর্ব্বক ‘গম’ ধাতুর ‘প্রাপ্তি’ অর্থই প্রায়িক; আর পরমাত্ম লাভ ও অবগতির যে অর্থগতও কোন ভেদ আছে, তাহা নাই; কারণ, পরপ্রাপ্তি অর্থ অবিদ্যাধ্বংস ছাড়া আর কিছুই নহে।

ভাল, পরা বিদ্যা যদি ঋগ্বেদাদির বহির্ভূত হইল, তাহা হইলে উহা পরা বিদ্যা এবং মোক্ষ-সাধনই বা হয় কিরূপে? স্মৃতিকারগণ বলিয়া থাকেন যে, ‘বেদবহির্ভূত যে সমস্ত স্মৃতি, এবং যে কোনও অসৎ জ্ঞানোপদেশ,[তৎসমস্ত উপেক্ষণীয়]।’ তৎসমস্তই অসদুপদেশ; সুতরাং নিষ্ফল, নিষ্ফলত্ব হেতুই অগ্রাহ্য হইয়া থাকে, এবং উপনিষৎ- সমূহেরও ঋগ্বেদাদি-বাহ্যতা হইতে পারে? আর ঋগ্বেদাদির অন্তর্গত হইলে “অথ পরা” বলিয়া পৃথকভাবে নির্দেশ করিবারও কিছুমাত্র প্রয়োজন থাকে না। না—পৃথক্ নির্দেশ নিরর্থক হয় না; কারণ, বিজ্ঞেয় বিষয়ের বিজ্ঞান বা সাক্ষাৎকারই এখানে বিবক্ষিত(বক্তার—শ্রুতির অভিপ্রেত)। অর্থাৎ উপনিষদ্- বেদ্য যে, অক্ষর ব্রহ্মবিষয়ক জ্ঞান, তাহাই এখানে ‘পরা বিদ্যা’ বলিয়া প্রধানতঃ বিবক্ষিত হইয়াছে, কিন্তু উপনিষদের শব্দসমূহ নহে। পক্ষান্তরে, বেদ-শব্দে কিন্তু সর্ব্বত্রই কেবল শব্দ সমূহমাত্র বিবক্ষিত হইয়াছে। কেবল শব্দসমূহ অধিগত হইলেও গুরুসমীপে গমনাদিরূপ প্রযত্ন এবং বৈরাগ্য লাভ ব্যতীত যে, অক্ষর ব্রহ্মপ্রাপ্তির সম্ভবই হয় না, ইহা প্রতিপাদনার্থই ব্রহ্মবিদ্যার পৃথক করণ, এবং ‘পরা বিদ্যা’ নাম- করণ হইয়াছে ॥ ৫ ॥

খণ্ডঃ] প্রথমং মুণ্ডকম্। ১৫

যত্তদদ্রেশ্যমগ্রাহ্যমগোত্রমবর্ণ- মচক্ষুঃশ্রোত্রং তদপাণিপাদং নিত্যং বিভুং সর্ব্বগতং সুসূক্ষ্মং তদব্যয়ং যদ্ভূতযোনিং পরিপশ্যন্তি ধীরাঃ ॥ ৬ ॥

[পরাং বিদ্যাং বিশেষয়িতুং অক্ষরস্বরূপমাহ—যৎ তদিত্যাদি।]—যৎ তৎ (বক্ষ্যমাণং) অদ্রেশ্যম্(অদৃশ্যং জ্ঞানেন্দ্রিয়াগম্যম্), অগ্রাহ্যম্(কর্ম্মেন্দ্রিয়াগ্রাহ্যম্), অগোত্রম্(গোত্রং বংশঃ, মূলমিতি যাবৎ, তদ্রহিতম্,), অবর্ণম্(রূপাদিহীনম্), অচক্ষুঃশ্রোত্রং(চক্ষুঃকর্ণহীনম্),[পুনশ্চ] তৎ অপাণিপাদং(পাণি-পাদবর্জ্জিতং), নিত্যং(অবিনাশি), বিভুং(বিবিধাকারং), সর্ব্বগতং(ব্যাপকং), সুসূক্ষ্মং। [কিঞ্চ,] তৎ অক্ষরম্ অব্যয়ং(অপচয়োপচয়রহিতং), যৎ(উক্তলক্ষণং) ভূতযোনিং(ভূতানাং কারণম্ অক্ষরং) ধীরাঃ(বিবেকিনঃ)[পরবিদ্যয়া] পরিপশ্যন্তি(সর্ব্বতঃ অবগচ্ছন্তি)[সা ‘পরা বিদ্যা’ ইত্যাশয়ঃ] ॥

ধীর বিবেকিগণ[ এই পরা বিদ্যা দ্বারা] সেই যে, অদৃশ্য, অগ্রাহ্য, অগোত্র (মূলরহিত) নীরূপ, এবং চক্ষুঃ ও কর্ণরহিত, হস্তপদবিহীন, নিত্য, বিভু, সর্ব্বব্যাপী ও অতি সূক্ষ্ম, সেই যে ভূতযোনি(সর্ব্বকারণ) অক্ষরকে সর্ব্বতোভাবে অবগত হইয়া থাকেন ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

যথা বিধিবিষয়ে কর্ত্রাদ্যনেককারকোপসংহারদ্বারেণ বাক্যার্থজ্ঞানকালাদন্য- ত্রানুষ্ঠেয়োহর্থোহস্তি অগ্নিহোত্রাদিলক্ষণঃ, ন তথেহ পরবিদ্যাবিষয়ে; বাক্যার্থজ্ঞান- সমকাল এব তু পর্যবসিতো ভবতি, কেবলশব্দপ্রকাশিতার্থজ্ঞানমাত্রনিষ্ঠাব্যতি- রিক্তাভাবাৎ। তস্মাদিহ পরাং বিদ্যাং সবিশেষণেনাক্ষরেণ বিশিনষ্টি—যত্তদদ্রেশ্য- মিত্যাদিনা।

বক্ষ্যমাণং বুদ্ধৌ সংহৃত্য সিদ্ধবৎ পরামৃশ্যতে-যত্তদিতি। অদ্রেশ্যমদৃশ্যং সর্ব্বেষাং বুদ্ধীন্দ্রিয়াণামগম্যমিত্যেতৎ, দূশের্ব্বহিঃপ্রবৃত্তস্য পঞ্চেন্দ্রিয়দ্বারকত্বাৎ। অগ্রাহ্যং কর্ম্মেন্দ্রিয়বিষয়মিত্যেতৎ। অগোত্রং-গোত্রমন্বয়ো মূলমিত্যনর্থান্তরম্, অগোত্রমনন্বয়মিত্যর্থঃ। ন হি তস্য মূলমস্তি, যেনান্বিতং স্যাৎ। বর্ণ্যন্ত ইতি বর্ণা দ্রব্যধৰ্ম্মা: স্থূলত্বাদয়ঃ শুক্লত্বাদয়ো বা, অবিদ্যমানা বর্ণা যস্য তদবর্ণম্ অক্ষরম্।

১৬ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

অচক্ষুঃশ্রোত্রং—চক্ষুশ্চ শ্রোত্রঞ্চ নামরূপবিষয়ে করণে সর্ব্বজন্তুনাং, তে অবিদ্যমানে যস্য তদচক্ষুঃশ্রোত্রম্। “যঃ সর্বজ্ঞঃ সর্ব্ববিৎ” ইত্যাদি-চেতনাবত্ববিশেষণাৎ প্রাপ্তং সংসারিণামিব চক্ষুঃশ্রোত্রাদিভিঃ করণৈরর্থসাধকত্বং, তদিহ ‘অচক্ষুঃশ্রোত্রম্’ ইতি বার্য্যতে, “পশ্যত্যচক্ষুঃ স শৃণোত্যকর্ণঃ” ইত্যাদিদর্শনাৎ।

কিঞ্চ, তদপাণিপাদং-কর্মেন্দ্রিয়রহিতমিত্যেতৎ। যত এবমগ্রাহ্যমগ্রাহকঞ্চ, অতো নিত্যমবিনাশি, বিভুং-বিবিধং ব্রহ্মাদিস্থাবরান্ত প্রাণিভেদৈর্ভবতীতি বিভুম্। সর্ব্বগতং ব্যাপকমাকাশবৎ। সুসূক্ষ্মং শব্দাদি-স্থূলত্বকারণরহিতত্ত্বাৎ। শব্দাদয়ো হ্যাকাশ-বাযাদীনামুত্তরোত্তরং স্থূলত্বকারণানি, তদভাবাৎ সুসুক্ষ্মম্। কিঞ্চ, তদব্যয়ম্ উক্তধৰ্ম্মত্বাদেব ন ব্যেতীত্যব্যয়ম্। ন হ্যনঙ্গস্য স্বাঙ্গাপচয়লক্ষণো ব্যয়ঃ সম্ভবতি শরীরস্যেব। নাপি কোষাপচয়লক্ষণো ব্যয়ঃ সম্ভবতি রাজ্ঞ ইব। নাপি গুণদ্বারকো ব্যয়ঃ সম্ভবত্যগুণত্বাৎ সর্ব্বাত্মকত্বাচ্চ। যদেবংলক্ষণং ভূত- যোনিং ভূতানাং কারণং-পৃথিবীব স্থাবরজঙ্গমানাং, পরি সৰ্ব্বত আত্মভূতং সর্ব্বসাক্ষরং পশ্যন্তি ধীরাঃ ধীমন্তো বিবেকিনঃ। ঈদৃশমক্ষরং যয়া বিদ্যয়া অধিগম্যতে, সা পরা বিদ্যেতি সমুদায়ার্থঃ ॥ ৬॥

ভাষ্যানুবাদ।

বিধিবিষয়ে অর্থাৎ কর্ম্মোপদেশক বিধিশাস্ত্রে যেরূপ কর্তা প্রভৃতি অনেকানেক কারক বা ক্রিয়ানিপ্পাদক বিষয়ের আবশ্যক হয়, এবং বিধিবাক্যের অর্থ প্রতীতি ছাড়া সময়ান্তরে অনুষ্ঠেয় অগ্নিহোত্রাদি- রূপ আরও বিষয় থাকে; এই পরবিদ্যা-বিষয়ে সেরূপ কিছু নাই, পরন্তু বাক্যার্থ জ্ঞানের সমকালেই তদর্থ সম্পন্ন হইয়া থাকে; কারণ, ইহাতে শব্দার্থ-জ্ঞানে তৎপরতা ভিন্ন আর কিছুমাত্র কর্তব্যতা নাই। এইজন্য এখানে “যৎ তৎ অদ্রেশ্যং” ইত্যাদি বিশেষণে বিশে- ষিত অক্ষর ব্রহ্ম নির্দেশের দ্বারা সেই পরা বিদ্যাকে বিশেষিত করিতেছেন।

পরে যাহা বর্ণিত হইবে, তাহাকে অগ্রে বুদ্ধিস্থ করিয়া(মনে করিয়া) প্রসিদ্ধের ন্যায় ‘যৎ তৎ’ শব্দে উল্লেখ করা হইয়াছে। অদ্রেশ্য —অদৃশ্য, অর্থাৎ[চক্ষুঃ প্রভৃতি] বুদ্ধীন্দ্রিয়ের অগম্য; কারণ, বাহ্যবিষয়ক

খণ্ডঃ।] প্রথমং মুণ্ডকম্। ১৭

জ্ঞান পাঁচটি ইন্দ্রিয় দ্বারাই সম্পন্ন হইয়া থাকে। অগ্রাহ্য-কর্ম্মেন্দ্রিয়ের অবিষয়। অগোত্র-গোত্র, বংশ ও মূল, এ সমস্তের অর্থগত ভেদ নাই; [সুতরাং] অগোত্র অর্থ-নিরন্বয় বা মূলরহিত। অভিপ্রায় এই যে, তিনিই সকলের মূল, তাঁহার আর কোনও মূল নাই-যাহার সহিত অন্বিত(কার্যরূপে সম্বদ্ধ) হইতে পারেন। যাহা বর্ণনার যোগ্য, তাহা বর্ণ-স্থূলত্বাদি কিংবা শুক্লত্বাদি বস্তু-ধৰ্ম্মসমূহ; কোনপ্রকার বর্ণ যাহাতে বিদ্যমান নাই, তিনি অবর্ণ ও ‘অক্ষর’ পদবাচ্য; অচক্ষুঃশ্রোত্র-নাম ও রূপ-গ্রাহক চক্ষুঃ কর্ণ ইন্দ্রিয় দুইটি সর্বপ্রাণি-সাধারণ; সেই ইন্দ্রিয় দুইটি যাহার নাই, তিনি অচক্ষুঃ-শ্রোত্র।[অভিপ্রায় এই যে,] ‘যিনি সর্বজ্ঞ ও সর্ববিৎ অর্থাৎ সামান্যভাবে ও বিশেষভাবে সমস্ত বিষয় জানেন’; ইত্যাদি শ্রুতি দ্বারা তাঁহাকে চৈতন্যসম্পন্ন বলিয়া বিশেষিত করায় অপরাপর সংসারীর ন্যায় তাঁহার সম্বন্ধেও চক্ষুঃ কর্ণাদি ইন্দ্রিয়ের সাহায্যেই কার্যকারিতা সম্ভাবিত হইয়াছিল; এখানে ‘অচক্ষুঃশ্রোত্র’ বিশেষণ দ্বারা তাহাই নিবারিত করা হইল; কারণ, ‘তিনি চক্ষুহীন, অথচ দর্শন করেন এবং কর্ণহীন, অথচ শ্রবণ করেন’, ইত্যাদি শ্রৌত প্রমাণ দেখা যায়।

অপিচ, তিনি অপাণি-পাদ অর্থাৎ কৰ্ম্মসাধন হস্তপদাদি ইন্দ্রিয়রহিত। যেহেতু তিনি গ্রহণযোগ্য নহেন, এবং তাঁহার গ্রাহকও কিছু নাই; অতএব তিনি নিত্য—বিনাশ-রহিত, বিভু—ব্রহ্মাদি স্থাবর পর্য্যন্ত নানা- বিধ প্রাণিভেদে প্রাদুর্ভূত হন, এইজন্য বিভু—সর্ব্বগত আকাশবৎ ব্যাপক। যেহেতু স্থূলতাপ্রাপ্তির কারণীভূত শব্দাদি ধর্ম্মরহিত; অতএব, সুসূক্ষ্ম অর্থাৎ শব্দাদি গুণই আকাশ বায়ু প্রভৃতি ভূতের উত্তরোত্তর স্থূলতার কারণ, তাহা না থাকায় তিনি অতি সূক্ষ্ম(৬)। আরও এক কথা,

১৮ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

তিনি অব্যয়, উক্তপ্রকার ধর্মসম্পন্ন বলিয়াই তিনি ব্যয় বা বিশেষরূপ প্রাপ্ত হন না, তাই অব্যয়; অঙ্গহীনের পক্ষে শরীরের ন্যায় স্বীয় অংশের অপচয়াত্মক ব্যয় কখনই সম্ভবপর হয় না, এবং রাজার যেমন ধনাগারের অপচয়ে ক্ষয় হয়, তেমন ক্ষয়ও তাঁহার সম্ভব হয় না; তিনি যখন নির্গুণ ও সর্বব্যাপক, তখন গুণাপচয় দ্বারাও তাঁহার ব্যয়ের সম্ভাবনা নাই। পৃথিবী যেরূপ স্থাবর-জঙ্গম সমূহের কারণ, তিনিও তদ্রূপ সমস্তভূতের যোনি—কারণ; এবস্তৃত সেই ভূতযোনি অক্ষরকে ধীর অর্থাৎ ধীসম্পন্ন বিবেকিগণ পরি--সর্বতোভাবে—সকলের আত্মভাবে দর্শন করিয়া থাকেন। এবংবিধ অক্ষরকে যে বিদ্যা দ্বারা প্রাপ্ত হওয়া যায়, তাহাই ‘পরা বিদ্যা’; ইহাই উক্ত বাক্যের সংক্ষিপ্ত অর্থ ॥ ৬॥

যথোর্ণনাভিঃ সৃজতে গৃহ্নতে চ, যথা পৃথিব্যামোষধয়ঃ সম্ভবন্তি। যথা সতঃ পুরুষাৎ কেশ-লোমানি, তথাক্ষরাৎ সম্ভবতীহ বিশ্বম্ ॥৭

[অথ অক্ষরস্য ভূতযোনিত্বং দৃষ্টান্তৈঃ সমর্থয়ন্ আহ]—যথেত্যাদি। যথা উর্ণনাভিঃ(লূতাকীটঃ)[বাহ্যসহায়নিরপেক্ষঃ সন্ স্বয়মেব তন্তন] সৃজতে (উৎপাদয়তি);[পুনঃ] গৃহ্নতে চ(আত্মসাৎ চ করোতি), যথা ওষধয়ঃ (তৃণলতাদীনি) পৃথিব্যাং(ভূমৌ) সম্ভবন্তি(সমুৎপদ্যন্তে), যথা চ সতঃ (বিদ্যমানাৎ) পুরুষাৎ(শিরঃপাণ্যাদিলক্ষণাৎ) কেশ-লোমানি(কেশা লোমানি চ)[সম্ভবন্তি]; তথা ইহ(সংসারে) অক্ষরাৎ(ব্রহ্মণঃ) বিশ্বং (কৃৎস্নং জগৎ) সম্ভবতি(উৎপদ্যতে)॥

ঊর্ণনাভি যেরূপ অপর কোন বস্তুর সাহায্য না লইয়া আপনিই তত্তুরাশি

খণ্ডঃ।] প্রথমং মুণ্ডকম্। ১৯

সৃষ্টি করে এবং পুনশ্চ সে সমস্ত আত্মসাৎ করিয়া থাকে; পৃথিবীতে যেরূপ ওষধিসমূহ প্রাদুর্ভূত হয়, এবং জীবৎ পুরুষদেহ হইতে যেরূপ কেশ ও লোম- সমূহ সমুৎপন্ন হয়; সেইরূপ এই সংসারে অক্ষর ব্রহ্ম হইতে সমস্ত জগৎ প্রাদুর্ভূত হইয়া থাকে ॥ ৭

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

ভূতযোনিরক্ষরমিত্যুক্তম্; তৎ কথং ভূতযোনিত্বম্, ইত্যুচ্যতে প্রসিদ্ধ- দৃষ্টান্তৈঃ,-যথা লোকে প্রসিদ্ধ ঊর্ণনাভিলূতাকীটঃ কিঞ্চিৎ কারণান্তরমনপেক্ষ্য স্বয়মেব সৃজতে স্বশরীরাব্যতিরিক্তান্ এব তন্ত্ৰন্ বহিঃ প্রসারয়তি, পুনস্তানেব গৃহুতে চ গৃহ্লাতি স্বাত্মভাবমেবাপাদয়তি; যথা চ পৃথিব্যামোষধয়ো ব্রীহ্যাদিস্থাবরান্তাঃ স্বাত্মাব্যতিরিক্তা এব প্রভবন্তি সম্ভবন্তি; যথা সতো বিদ্যমানাজ্জীবতঃ পুরুষাৎ কেশ-লোমানি কেশাশ্চ লোমানি চ সম্ভবন্তি বিলক্ষণানি। যথৈতে দৃষ্টান্তাঃ, তথা বিলক্ষণং সলক্ষণঞ্চ নিমিত্তান্তরানপেক্ষাদ্ যথোক্তলক্ষণাদক্ষরাৎ সম্ভবতি সমুৎপদ্যত ইহ সংসারমণ্ডলে বিশ্বং সমস্তং জগৎ। অনেকদৃষ্টান্তোপাদানত্ত্ব সুখার্থপ্রবোধনার্থম্ ॥ ৭

ভাষ্যানুবাদ।

পূর্ব্বে অক্ষরকে ‘ভূতযোনি’ বলা হইয়াছে; সেই ভূতযোনিত্ব কি প্রকারে হইতে পারে, এখন প্রসিদ্ধ দৃষ্টান্ত দ্বারা তাহা কথিত হইতেছে-লোকপ্রসিদ্ধ ঊর্ণনাভি অর্থাৎ লূতাকীট যেরূপ অপর কোনও কারণের অপেক্ষা না করিয়া নিজেই সৃষ্টি করে, অর্থাৎ স্বশরীর হইতে অপৃথক্ তন্তুরাশি বাহিরে প্রসারিত করে, আবার সেই সমস্ত- কেই গ্রহণও করে, অর্থাৎ স্বদেহভাবে পরিণত করে(ভক্ষণ করে); এবং পৃথিবী হইতে অপৃথগ ভাবাপন্ন ব্রীহি প্রভৃতি স্থাবরপর্য্যন্ত ওষধি- সমূহ যেরূপ পৃথিবীতে প্রাদুর্ভূত হয়; জীবৎপুরুষ(দেহ) হইতে যেরূপ তদ্বিলক্ষণ কেশ-লোম অর্থাৎ কেশ ও লোম সম্ভূত হয়। এই সকল দৃষ্টান্ত যেরূপ, সেইরূপ এই সংসারমণ্ডলে কারণের অনুরূপ ও বিরূপ সমস্ত জগৎই অপর নিমিত্ত-নিরপেক্ষ পূর্ব্বোক্তপ্রকার অক্ষর ব্রহ্ম হইতে সমুৎপন্ন হইয়া থাকে। অনায়াসে অর্থপ্রতীতির জন্য বহু দৃষ্টান্তের উল্লেখ হইয়াছে ॥৭

২০ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

তপসা চীয়তে ব্রহ্ম ততোহন্নমভিজায়তে। অন্নাৎ প্রাণো মনঃ সত্যং লোকাঃ কর্ম্মসু চামৃতম্ ॥ ৮

[উৎপত্তি ক্রমবিবক্ষয়া আহ]—তপসেতি। ব্রহ্ম(ভূতযোনিরক্ষরং) তপসা (জ্ঞানেন) চীয়তে(উপচীয়তে—সৃষ্টি-সমুন্মুখং ভবতি); ততঃ(তস্মাদ্বহ্মণঃ) অন্নম্ (জীবভোগার্হমব্যাকৃতম্) অভিজায়তে,(উৎপদ্যতে); অন্নাৎ(অব্যাকৃতাৎ) প্রাণঃ(সূত্রাত্মা—হিরণ্যগর্ভঃ);[তস্মাচ্চ প্রাণাৎ] মনঃ(সংকল্পবিকল্পধৰ্ম্মকং); [তস্মাচ্চ মনসঃ] সত্যং(আপেক্ষিকসত্যরূপং সূক্ষ্মভূতপঞ্চকং),[তস্মাচ্চ সত্যাৎ] লোকাঃ(ভূরাদয়ঃ সপ্ত);[তেষু চ] কর্মাণি(বর্ণাশ্রমাদ্যচিতানি); কর্মসুচ অমৃতম্(অমৃতায়মানং কৰ্ম্মফলম্)[অভিজায়তে ইতি সর্ব্বত্র সম্বধ্যতে]॥

এই শ্রুতিতে উৎপত্তির ক্রম কথিত হইতেছে,- তপস্যা অর্থাৎ উৎপাদনো- পযোগী জ্ঞান দ্বারা[উক্ত ভূতযোনি অক্ষর] ব্রহ্ম উপচয় প্রাপ্ত হন, অর্থাৎ সৃষ্টি বিষয়ে উন্মুখতা লাভ করেন; সেই ব্রহ্ম হইতে অন্ন অর্থাৎ জীবোপভোগ্য অব্যা- কৃত প্রকৃতি উৎপন্ন হয়, অন্ন হইতে প্রাণ’(হিরণ্যগর্ভ) হিরণ্যগর্ভ হইতে মনঃ (অন্তঃকরণ), তাহা হইতে সত্যনামক সূক্ষ্ম পঞ্চভূত, তাহা হইতে পৃথিব্যাদি লোকসমূহ,[লোকেতে আবার কৰ্ম্ম) এবং শুভ কর্মে আবার অমৃত অর্থাৎ কর্মফল সমুৎপন্ন হয় ॥ ৮

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

যব্রহ্মণ উৎপদ্যমানং বিশ্বং, তদনেন ক্রমেণোৎপদ্যতে, ন যুগপদ্বদরমুষ্টিপ্রক্ষেপবৎ, ইতি ক্রমনিয়মবিবক্ষার্থোহয়ং মন্ত্র আরভ্যতে-তপসা জ্ঞানেন উৎপত্তিবিধিজ্ঞতয়া ভূতযোন্যক্ষরং ব্রহ্ম চীয়তে উপচীয়তে উৎপাদয়িষাদিদং জগৎ অঙ্কুরমিব বীজমুচ্ছ, নতাং গচ্ছতি, পুত্রমিব পিতা হর্ষেণ। এবং সর্ব্বজ্ঞতয়া সৃষ্টি-স্থিতি-সংহারশক্তিবিজ্ঞানবত্তয়া উপচিতাৎ ততো ব্রহ্মণোহন্নং-অদ্যতে ভুজ্যত ইত্যন্নমব্যাকৃতং সাধারণং কারণং সংসারিণাং ব্যাচিকীর্ষিতাবস্থারূপেণ অভিজায়তে উৎপদ্যতে। ততশ্চ অব্যাকৃতাৎ চিকীবিতাবস্থাৎ অন্নাৎ প্রাণো হিরণ্যগর্ভো ব্রহ্মণো জ্ঞানক্রিয়াশক্ত্যধিষ্ঠিতঃ জগৎ- সাধারণঃ অবিদ্যাকামকৰ্ম্মভূতসমুদায়বীজাঙ্কুরো জগদাত্মা অভিজায়ত ইত্যনুষঙ্গঃ। তস্মাচ্চ প্রাণাৎ মনো মনআখ্যং সঙ্কল্প-বিকল্প-সংশয়-নির্ণয়াদ্যাত্মকম্ অভিজায়তে। ততোহপি সঙ্কল্লাদ্যাত্মকাৎ মনসঃ সত্যং সত্যাখ্যম্ আকাশাদিভূতপঞ্চকম্ অভি-

খণ্ডঃ। প্রথমং মুণ্ডকম্। ২১

জায়তে। তস্মাৎ সত্যাখ্যাৎ ভূতপঞ্চকাৎ অণ্ডক্রমেণ সপ্ত লোকা ভূরাদয়ঃ। তেষু মনুষ্যাদি-প্রাণি-বর্ণাশ্রমক্রমেণ কর্মাণি। কৰ্ম্মসু চ নিমিত্তভূতেষু অমৃতং কৰ্ম্মজং ফলম্; যাবৎ কৰ্মাণি কল্পকোটিশতৈরপি ন বিনশ্যন্তি, তাবৎ ফলং ন বিনশ্যতীত্যমৃতম্ ॥৮

ভাষ্যানুবাদ।

ব্রহ্ম হইতে যে জগৎ উৎপন্ন হয়, তাহা ক্রমশঃ-পর পর উৎপন্ন হয়, কিন্তু বদর-মুষ্টি নিক্ষেপের ন্যায় এক সঙ্গে নহে, এই জন্য সেই ক্রম-নিরূপণার্থ এই মন্ত্র আরব্ধ হইতেছে। -উক্ত ভূতযোনি ব্রহ্ম তপস্যা অর্থাৎ উৎপত্তিবিষয়ক জ্ঞান দ্বারা উপচিত হন, অর্থাৎ পিতা যেরূপ পুত্র-সমুৎপাদনার্থ আনন্দে বৃদ্ধি লাভ করে, সেইরূপ অঙ্কুর সদৃশ এই জগৎ-সমুৎপাদনার্থ উক্ত বীজও যেন স্ফীততা প্রাপ্ত হয়। এইরূপে সর্বজ্ঞতা নিবন্ধন সৃষ্টি, স্থিতি ও সংহারবিষয়ক শক্তি ও জ্ঞানে সমুপচিত সেই ব্রহ্ম হইতে অন্ন অর্থাৎ যাহা ভোগ করা যায়, তাহাই অন্ন, সংসারী জীবগণের অবিশিষ্ট(সাধারণ) কারণ অব্যাকৃত প্রধানই সেই অন্ন, তাহা অভিব্যজ্যমানরূপে উৎপন্ন হয়; অব্যাকৃত অথচ যাহাকে ব্যক্তীভূত করিতে হইবে, সেই অন্ন হইতে প্রাণ অর্থাৎ হিরণ্যগর্ভ জন্ম লাভ করেন; এই প্রাণই সর্বজগতের জ্ঞান ও ক্রিয়াশক্তির অধিষ্ঠাতা, অবিদ্যা কামনা ও তদনুগত কৰ্ম্মসমষ্টিরূপ বীজের অঙ্কুরস্বরূপ এবং জগতের আত্মা। সেই প্রাণ হইতে আবার সংকল্প, বিকল্প, সংশয় ও নির্ণয়াদি স্বভাবসম্পন্ন মনোনামক অন্তঃকরণ উৎপন্ন হয়, সেই সংকল্লাদি স্বভাবসম্পন্ন মন হইতেও সত্য-অর্থাৎ ‘সত্য’নামক আকাশাদি সূক্ষম পঞ্চ ভূত সমুৎপন্ন হয়, সেই ভূতপঞ্চক হইতেই সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড যথাক্রমে পৃথিব্যাদি লোকসমূহ সৃষ্ট হয়; সেই সমস্ত লোকে আবার মনুষ্যাদি প্রাণিবর্গের বর্ণ ও আশ্রমানুযায়ী নানাবিধ কৰ্ম্ম, এবং সেই কর্মাধীন অমৃত অর্থাৎ কর্মফল[সমুৎপন্ন হয়]; যে পর্যন্ত শতকোটি কল্পেও কৰ্ম্মসমূহ বিনষ্ট না হয়, তাবৎ তৎফলও বিনষ্ট হয় না, অর্থাৎ

২২ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

যতকাল কৰ্ম্ম, তাহার ফলও ততকাল অক্ষুণ্ণ থাকে; এই কারণে কৰ্ম্মফলকে ‘অমৃত’[ বলা হইয়াছে](৭) ॥৮॥

যঃ সর্ব্বজ্ঞঃ সর্ব্ববিদ্ যস্য জ্ঞানময়ং তপঃ।

তস্মাদেতদ্ ব্রহ্ম নাম রূপমন্নঞ্চ জায়তে ॥ ৯

ইত্যর্থবেদীয় মুণ্ডকোপনিষদি প্রথম মুণ্ডকে প্রথমঃ খণ্ডঃ।

[ ইদানীমুক্তমর্থমুপসংহরন্ বক্ষ্যমাণমর্থমাহ]—য ইত্যাদি। যঃ(অক্ষরাখ্যঃ পরমেশ্বরঃ) সর্ব্বজ্ঞঃ(সামান্যতঃ সর্ব্বং জানাতীত্যর্থঃ), সর্ব্ববিৎ(বিশেষভাবেন চ সর্ব্বং বেত্তীত্যর্থঃ)। যস্য(অক্ষরস্য) জ্ঞানময়ং(জ্ঞানমেব) তপঃ(তপঃ- ফলপ্রদায়কম্), তস্মাৎ(অক্ষরাৎ) এতৎ(উক্তলক্ষণং) ব্রহ্ম(হিরণ্যগর্ভাখ্যং), নাম(দেবদত্ত-যজ্ঞদত্তাদি), রূপং(শুক্লকৃষ্ণাদি), অন্নং(ভক্ষণীয়ং ধান্যাদিকং চ) জায়তে(উৎপদ্যতে) ॥

যিনি সর্ব্বজ্ঞ ও সর্ব্ববিৎ, সর্ব্বজ্ঞতারূপ জ্ঞানই যাঁহার তপস্যা, সেই অক্ষর ব্রহ্ম।

খণ্ডঃ।] প্রথমং মুণ্ডকম্। ২৩

হইতে এই পূর্ব্বোক্ত হিরণ্যগর্ভনামক ব্রহ্ম, নাম(সংজ্ঞা), শুক্লাদি রূপ ও ধান্যাদি অন্ন সমুৎপন্ন হয় ॥ ৯

ইতি প্রথম-মুণ্ডঃ; প্রথম খণ্ড।

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

উক্তমেবার্থমুপসংজিহীযুমন্ত্রো বক্ষ্যমাণার্থমাহ—য উক্তলক্ষণঃ অক্ষরাখ্যঃ সর্ব্বতঃ, সামান্যেন সর্ব্বং জানাতীতি সর্ব্বজ্ঞঃ; বিশেষেণ সর্ব্বং বেত্তীতি সর্ব্ববিৎ। যস্য জ্ঞানময়ং জ্ঞানবিকারমেব সার্ব্বজ্ঞ্যলক্ষণং তপঃ অনায়াসলক্ষণং, তস্মাদ যথোক্তাৎ সর্ব্বজ্ঞাৎ এতৎ উক্তং কার্য্যলক্ষণং ব্রহ্ম হিরণ্যগর্ভাখ্যং জায়তে। কিঞ্চ, নাম ‘অসৌ দেবদত্তো যজ্ঞতত্ত্বঃ’ ইত্যাদিলক্ষণম্; রূপম্ ‘ইদং শুক্লং নীলম্’ ইত্যাদি, অন্নঞ্চ ব্রীহিষবাদিলক্ষণং জায়তে পূর্ব্বমন্ত্রোক্তক্রমেণেত্যবিরোধো দ্রষ্টব্যঃ ॥ ৯ ॥

ইতি প্রথমমুণ্ডকে প্রথমখণ্ডভাষ্যম্ ॥ ১ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

এই মন্ত্রটি পূর্বকথিত বিষয়ের উপসংহার করতঃ বক্ষ্যমাণ বিষয় বলিতেছেন—পূর্ব্বে যাহার লক্ষণ উক্ত হইয়াছে, সেই অক্ষরনামক যিনি সামান্যরূপে সমস্ত জানেন বলিয়া সর্বজ্ঞ এবং বিশেষরূপেও সমস্ত জানেন বলিয়া সর্ববিৎ, জ্ঞানময় অর্থাৎ সর্বজ্ঞতারূপ জ্ঞান-পরিণতিই যাঁহার অনায়াসাত্মক তপস্যা; যথোক্তপ্রকার সেই সর্বজ্ঞ(অক্ষর) হইতে উক্ত হিরণ্যগর্ভনামক কার্য্য ব্রহ্ম জন্ম লাভ করেন। অপিচ, দেবদত্ত যজ্ঞদত্তা।দ নাম, এই শুক্ল-নীলাদি রূপ এবং ব্রীহি-যবাদি অন্ন ও তাঁহা হইতে সমুৎপন্ন হয়। এখানে পূর্বমন্ত্রোল্লিখিত ক্রমানুসারেই উৎপত্তি বুঝিতে হইবে; সুতরাং তাহা হইলে আর বিরোধ রহিল না(৮) ॥ ৯ ॥

ইতি প্রথম মুণ্ডকে প্রথম খণ্ডঃ।

প্রথমমুণ্ডকে দ্বিতীয়ঃ খণ্ডঃ

তদেতৎ সত্যং মন্ত্রেষু কর্ম্মাণি কবয়ো যান্যপশ্যং- স্তানি ত্রেতায়াং বহুধা সন্ততানি।

তান্যচরথ নিয়তং সত্যকামা।

এব বঃ পন্থাঃ সুকৃতস্য লোকে ॥ ১০ ॥ ১ ॥

তৎ(প্রকৃতং) এতৎ(বক্ষ্যমাণং) সত্যং।[কিং তং?] কৰয়ঃ (মনীষিণঃ) মন্ত্রেষু(নিহিতানি) যানি কর্মাণি অপশ্যন্(দৃষ্টবন্তঃ), ত্রেতায়াং (ত্রয়ীলক্ষণায়াং) বহুধা(অনেকপ্রকারং) সন্ততানি(প্রবৃত্তানি)।[হে শিষ্যাঃ] সত্যকামাঃ(সত্যফলাভিলাষিণঃ সন্তঃ) তানি(কর্মাণি) নিয়তং (নিত্যং) আচরথ(অনুতিষ্ঠত)। বঃ(যুষ্মাকং) সুকৃতস্য(সম্যক্ অনুষ্ঠিতস্য) লোকে(ফলপ্রাপ্তৌ) এষঃ পন্থাঃ(উপায়ঃ) ॥

ইহাই সেই সত্য বস্তু; কবিগণ(পণ্ডিতগণ) মন্ত্রমধ্যে যাহা দর্শন করিয়াছেন। সেই ঋষিদৃষ্ট কৰ্ম্মসমূহ ত্রেতাতে(ত্রয়ী-বেদে), বহুপ্রকার প্রবৃত্ত আছে।[হে শিষ্যগণ,] তোমরা সত্যকাম হইয়া সেই কর্ম্মসমূহ আচরণকর, ইহাই তোমাদের অনুষ্ঠিত কর্ম্মফললাভের পথ বা উপায় ॥ ১০ ॥ ১

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

সাঙ্গা বেদা অপরা বিদ্যোক্তা “ঋগ্বেদো যজুর্ব্বেদঃ” ইত্যাদিনা। “যত্তদদ্রেশ্যম্” ইত্যাদিনা—“নামরূপমন্নঞ্চ জায়তে” ইত্যন্তেন গ্রন্থেন উক্তলক্ষণমক্ষরং যয়া বিদ্যয়া অধিগম্যতে ইতি সা পরা বিদ্যা সবিশেষেণোক্তা। অতঃ পরম্ অনয়োর্বিদ্যয়ো- বিষয়ৌ বিবেক্তব্যৌ সংসারমোক্ষৌ, ইত্যুত্তরো গ্রন্থ আরভ্যতে—

তত্রাপরবিদ্যাবিষয়ঃ কর্ত্তাদিসাধন-ক্রিয়াফলভেদরূপঃ সংসারোহনাদিরনন্তো দুঃখস্বরূপত্বাদ্ হাতব্যঃ প্রত্যেকঃ শরীরিভিঃ সামস্ত্যেন নদীস্রোতোবদবিচ্ছেদরূপ- সম্বন্ধঃ, তদুপশমলক্ষণো মোক্ষঃ পরবিদ্যাবিষয়োহনাদ্যনন্তোহজরোহমরোহমৃতো-

খণ্ডঃ।] প্রথমং মুক্তকম্। ২৫

হভয়ঃ শুদ্ধঃ প্রসন্ন: স্বাত্মপ্রতিষ্ঠালক্ষণঃ পরমানন্দোহদ্বয় ইতি। পূর্ব্বং তাবদপর- বিদ্যায়া বিষয় প্রদর্শনার্থমারম্ভঃ; তদ্দর্শনে হি তন্নির্ব্বেদোপপত্তিঃ। তথা চ বক্ষ্যতি-“পরীক্ষ্য লোকান্ কর্মচিতান” ইত্যাদিনা। ন হ্যপ্রদর্শিতে পরী- ক্ষোপপদ্যতে, ইতি তৎ প্রদর্শয়ন্নাহ-তদেতৎ সত্যম্ অবিতথম্। কিং তৎ? মন্ত্রেষু ঋগ্বেদাদ্যাখ্যেযু কৰ্ম্মাণি অগ্নিহোত্রাদীনি মন্ত্রৈরেব প্রকাশিতানি কবয়ো মেধাবিনো বশিষ্ঠাদয়ো যানি অপশ্যন্ দৃষ্টবন্তঃ। যত্তদেতৎ সত্যমেকান্তপুরুষার্থসাধনত্বাৎ, তানি চ বেদবিহিতানি ঋষিদৃষ্টানি কর্মাণি ত্রেতায়াং ত্রয়ীসংযোগলক্ষণায়াং হৌত্রাধ্বর্য্য- বৌদগাত্র প্রকারায়াম্ অধিকরণভূতায়াং বহুধা বহুপ্রকারং সন্ততানি সংপ্রবৃত্তানি কৰ্মিভিঃ ক্রিয়মাণানি, ত্রেতায়াং বা যুগে প্রায়শঃ প্রবৃত্তানি; অতো যুয়ং তানি আচরথ নির্বর্ত্তয়ত নিয়তং নিত্যং, সত্যকামা যথা ভূতকর্মফলকামাঃ সন্তঃ। এষ বো যুগ্মাকং পন্থা মার্গঃ সুকৃতস্য স্বয়ং নির্ব্বাত্তিতস্য কর্মণো লোকে--ফল- নিমিত্তং লোক্যতে দৃশ্যতে ভুজ্যতে ইতি কৰ্ম্মফলং লোক উচ্যতে। তদর্থং তৎপ্রাপ্তয়ে এষ মার্গ ইত্যর্থঃ। যান্যেতানি অগ্নিহোত্রাদীনি ত্রয্যাং বিহিতানি কর্মাণি, তান্যেষ পন্থা অবশ্যফল প্রাপ্তিসাধনমিত্যর্থঃ ॥ ১০ ॥ ১ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

‘ঋগ্বেদ যজুর্ব্বেদ’ ইত্যাদি বাক্যে বেদ ও বেদাঙ্গ সমূহকে অপরা বিদ্যা বলা হইয়াছে। আর ‘সেই যে অদৃশ্য’ ইত্যাদি ‘নাম, রূপ ও অন্ন সমুৎপন্ন হয়,’ ইত্যন্ত গ্রন্থ দ্বারা কথিত হইয়াছে যে, যাহা দ্বারা সেই অক্ষরসংজ্ঞক পুরুষকে জানা যায়, তাহাই পরা বিদ্যা, ঐ বাক্যে পরা বিদ্যা সম্বন্ধে আরও যাহা বিশেষ আছে, তাহাও উক্ত হইয়াছে। অতঃপর উক্ত পরা ও অপরা বিদ্যার দ্বিবিধ বিষয়—মোক্ষ ও সংসার পৃথক্ করিয়া নির্দেশ করা আবশ্যক; এই উদ্দেশে পরবর্তী গ্রন্থ আরব্ধ হইতেছে।

তন্মধ্যে নদী-স্রোতের ন্যায় অবিচ্ছিন্নভাবে প্রবহমাণ, ক্রিয়া, ক্রিয়াসাধন, কর্তা প্রভৃতি ও ক্রিয়াকলাত্মক ভেদপূর্ণ এবং অনাদি, অনন্ত(৯) দুঃখময় এই যে সংসার, ইহাই অপরা বিদ্যার বিষয়;

২৬ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

সংসার দুঃখময় বলিয়া প্রত্যেক প্রাণীর পক্ষেই পরিত্যাজ্য; আর সেই দুঃখময় সংসারের উপশম বা অত্যন্ত নিবৃত্তিরূপ যে মোক্ষ, তাহাই পরা বিদ্যার বিষয়। উক্ত লক্ষণ মোক্ষও অনাদি, অনন্ত, জরা ও ক্ষয়বজ্জিত, বিনাশ ও ভয়রহিত, শুদ্ধ, নির্দোষ, স্ব-স্বরূপে অবস্থিতি- রূপ অদ্বিতীয় পরমানন্দ স্বরূপ। প্রথমেই অবিদ্যার বিষয় বিজ্ঞাত হইলে সহজেই তাহা হইতে বৈরাগ্য উপস্থিত হইতে পারে; এই কারণে প্রথমেই অবিদ্যার বিষয় প্রদর্শনার্থ উপক্রম করা হইয়াছে। ‘কৰ্ম্ম-সঞ্চিত লোক সমূহ(ফল সমূহ) পরীক্ষা করিয়া,’ ইত্যাদি বাক্য দ্বারাও এ কথা বলা হইবে। বিচার্য্য বিষয় নির্দেশ না করিলে, কখনই পরীক্ষা উপপন্ন হইতে পারে না; এই কারণে সেই সেই বিষয় প্রদর্শন করতঃ বলিতেছেন-সেই এই বস্তুটি সত্য অর্থাৎ অবিতথরূপ। সেই বস্তুটি কি? না-বশিষ্ঠ প্রভৃতি কবিগণ অর্থাৎ মেধাবিগণ ঋগ্বেদাদি মন্ত্রে প্রকাশিত অগ্নিহোত্রাদি যে সমস্ত কৰ্ম্ম দর্শন করিয়াছেন। কর্মসমূহ মন্ত্র দ্বারাই প্রকাশিত হইয়া থাকে;[এই কারণে মন্ত্রে দৃষ্ট বলা হইয়াছে।] নিশ্চিতরূপে পুরুষার্থ-সাধক এই যে সেই সত্য; বেদবিহিত এবং ঋষিদৃষ্ট সেই কৰ্ম্ম সমূহ ত্রেতায় অর্থাৎ হৌত্র, আধ্বর্য্যব ও ঔদগাত্রবিশিষ্ট(১০) বেদত্রয়ে বহুপ্রকারে সংপ্রবৃত্ত অর্থাৎ কৰ্মিগণকর্তৃক অনুষ্ঠিত; অথবা ত্রেতা- যুগে বহুলভাবে আরব্ধ হইয়াছে। অতএব তোমরা সত্যকাম হইয়া- যথাযথ কৰ্ম্মফলাকাঙ্ক্ষী হইয়া, সেই সকল কৰ্ম্ম সর্বদা সম্পাদন কর। সুকৃত অর্থাৎ তোমার নিজের সম্পাদিত কৰ্ম্ম-ফল ভোগের নিমিত্ত ইহাই তোমাদিগের প্রকৃত পথ-উপযুক্ত উপায়। যাহা অবলোকন করা হয়-দর্শন করা হয় অর্থাৎ ভোগ করা হয়, এই অর্থে ‘লোক’

খণ্ডঃ।] প্রথমং মুণ্ডকম্। ২৭

শব্দে কৰ্ম্মফল কথিত হইয়া থাকে। ইহা সেই লোকপ্রাপ্তির পথ। এই যে বেদবিহিত অগ্নিহোত্রাদি কৰ্ম্ম, ফলপ্রাপ্তির অবশ্য-সাধকত্বনিবন্ধন সেই কৰ্ম্মসমূহই এই পথ ॥১০ ॥১৷৷

যদা লেলায়তে হ্যর্চ্চিঃ সমিদ্ধে হব্যবাহনে। তদাজ্যভাগাবন্তরেণাহুতাঃ প্রতিপাদয়েৎ ॥১১॥২॥

[ প্রথমং তাবৎ অগ্নিহোত্রমেব উদাহ্রিয়তে]—‘যদা’ ইত্যাদিনা। যদা (যস্মিন্কালে) সমিদ্ধে(কাষ্ঠাদিভিঃ প্রদীপ্তে) হব্যবাহনে(অগ্নৌ) অর্চ্চিঃ (শিখা) লেলায়তে(চঞ্চলীভবতি); তদা(তস্মিন্কালে) আজ্যভাগৌ অন্তরেণ(আজ্যভাগয়োঃ মধ্যে আহবনীয়স্য দক্ষিণোত্তর-পার্শ্বয়োঃ আজ্যভাগৌ হুয়েতে, তয়োঃ মধ্যে ইত্যর্থঃ) আহুতাঃ(সায়ংপ্রাতঃ আহুতিদ্বয়ং) প্রতিপাদয়েৎ (প্রক্ষিপেৎ) ॥

প্রজ্বলিত অগ্নিতে যে সময় শিখামণ্ডল চঞ্চল হয়, তখনই আজ্যভাগদ্বয়ের মধ্যে আহুতি সমর্পণ করিবে ॥ ১১।২ ॥

শঙ্করভাষ্যম্।

তত্র অগ্নিহোত্রমেব তাবৎ প্রথমং প্রদর্শনার্থমুচ্যতে, সর্ব্বকৰ্ম্মণাং প্রাথম্যাৎ। তৎ কথম্? যদৈব ইন্ধনৈরভ্যাহিতৈঃ সম্যক্ ইদ্ধে সমিদ্ধে দীপ্তে হব্যবাহনে লেলায়তে চলতি অর্চ্চিঃ; তদা তস্মিন্ কালে লেলায়মানে চলত্যচ্চিষি আজ্যভাগৌ আজ্যভাগয়োরন্তরেণ মধ্যে আবাপস্থানে আহুতীঃ প্রতিপাদয়েৎ প্রক্ষিপেৎ দেব- তামুদ্দিশ্য। অনেকাহ:প্রয়োগাপেক্ষয়া আহুতীরিতি বহুবচনম্। এষ সম্যগাহুতি- প্রক্ষেপাদিলক্ষণঃ কৰ্ম্মমার্গো লোকপ্রাপ্তয়ে পন্থাঃ। তস্য চ সম্যক্‌করণং দুষ্করম্, বিপত্তয়ত্বনেকা ভবন্তি ॥ ১১ ॥ ২॥

ভাষানুবাদ।

তন্মধ্যে উদাহরণার্থ প্রথমতঃ অগ্নিহোত্রই উল্লিখিত হইতেছে; কারণ, উহাই সমস্ত কর্ম্মের প্রথম। তাহা কি প্রকার?—নিক্ষিপ্ত কাষ্ঠাদি দ্বারা প্রদীপ্ত অগ্নিতে যে সময়েই শিখা লেলায়মান—চলনশীল হয়, সেই সময় অগ্নিশিখা চলৎ থাকিতে থাকিতে আজ্যভাগদ্বয়ের

১৮ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

মধ্যে অর্থাৎ অর্পণযোগ্য স্থানে দেবতার উদ্দেশ করিয়া আহুতি সকল নিক্ষেপ করিবে। অনেক দিনের আহুতির বহুত্ব ধরিয়া মূলে ‘আহুতি’ শব্দে বহুবচন প্রযুক্ত হইয়াছে,[ নচেৎ অগ্নিহোত্র যজ্ঞে সায়ং ও প্রাতঃকালীন আহুতিদ্বয়ই প্রসিদ্ধ।] যথোপযুক্ত আহুতি প্রক্ষেপাদি স্বরূপ এই কর্মপথই লোকপ্রাপ্তির উপায়। কিন্তু তাহার যথাযথ- ভাবে অনুষ্ঠান বড় দুষ্কর; কারণ, ইহাতে অনেকপ্রকার বিপৎ উপস্থিত হইয়া থাকে ॥১১ ॥২॥

যস্যাগ্নিহোত্রমদর্শমপৌর্ণমাস- মচাতুর্ম্মাস্যমনাগ্রয়ণমতিথিবজিতঞ্চ। অহুতমবৈশ্বদেবমবিধিনা হুত মাসপ্রমাংস্তস্য লোকান্ হিনস্তি ॥ ১২ ॥ ৩ ॥

[ অগ্নিহোত্রস্য অযথানুষ্ঠানে দোষমাহ]—যস্যেতি। যস্য(অগ্নিহোত্রিণঃ) অগ্নি- হোত্রং(তদাখ্যং যাগকৰ্ম্ম) অদর্শম্(অমাবস্যাকর্তব্য-‘দর্শ’নামক-কর্মরহিতম্) অপৌর্ণমাসম্(পৌর্ণমাসীবিহিত-‘পৌর্ণমাস’সংজ্ঞক-কর্মবর্জিতম্), অচাতুর্মাস্যম্ (চাতুর্মাস্যকৰ্ম্মরহিতম্) অনাগ্রয়ণং(শরদাদি-কর্তব্যাগ্রয়ণেষ্টিশূন্যং), তথা অতিথিবর্জিতম্(অতিথিপূজনরহিতম্), অহুতম্(যথাকালে হোমরহিতম্), অবৈশ্বদেবম্(বৈশ্বদেব-বলিকর্মরহিতম্), অবিধিনা(শাস্ত্রোক্তবিধানম্ অনাদৃত্য) হুতং চ[ভবতি], তৎ অগ্নিহোত্রং] তস্য(কর্ত্তুঃ) আ সপ্তমান্(সপ্তমপর্য্যন্তান্) লোকান্(ভূরাদীন্ কৰ্ম্মফলরূপান্) হিনস্তি(বিনাশয়তি—নিবারয়তীতি যাবৎ) [অতঃ সাবধানেন অগ্নিহোত্রং কর্তব্যমিত্যাশয়:]।

যাহার ‘অগ্নিহোত্র’যাগ ‘দর্শ’ ও ‘পৌর্ণমাস’ যাগ রহিত হয়, চাতুর্মাস্য ও আগ্রয়ণ-যাগশূন্য এবং অতিথি-পূজনরহিত হয়, যথাকালে হুত না হয়, বৈশ্বদেব-কৰ্ম্মশূন্য এবং অবিধিপূর্ব্বক হুত হয়, সেই অগ্নিহোত্র যাগই তাহার ভূঃ প্রভৃতি সপ্তলোক(কর্মফল) বিনষ্ট করিয়া দেয় ॥ ১২৷৩ ॥

• শঙ্করভাষ্যম্।

কষ্যম্। বক্ষ্যাদিহৃৎপিণ্ডং অশ্বিনঃ অপ্সরাঃ কর্ম্মণা বর্জ্জিতম্। অশ্বি-

খণ্ডঃ।] প্রথমং মুণ্ডকম্। ২৯

হোত্রিণোৎবশ্যকর্তব্যত্বাদ্দর্শস্য—অগ্নিহোত্রিসম্বন্ধ্যগ্নিহোত্রবিশেষণমিব ভবতি; তদ- ক্রিয়মাণমিত্যেতৎ। তথা অপৌর্ণমাসম্ ইত্যাদিঘপি অগ্নিহোত্র-বিশেষণত্বং দ্রষ্টব্যম্; অগ্নিহোত্রাঙ্গত্বস্যাবিশিষ্টত্বাৎ। অপৌর্ণমাসং পৌর্ণমাসকৰ্ম্মবর্জিতম্। অচাতুৰ্মাস্যং চাতুৰ্মাস্যকৰ্ম্মবর্জিতম্। অনাগ্রয়ণং আগ্রয়ণং শরদাদিষু কর্তব্যং, তচ্চ ন ক্রিয়তে যস্য তৎ তথা। অতিথিবর্জিতঞ্চ অতিথিজনঞ্চ অহন্যহন্যক্রিয়মাণং যস্য। স্বয়ং সম্যগগ্নিহোত্রকালে অহুতম্। অদর্শাদিবৎ অবৈশ্বদেবং বৈশ্বদেবকর্মবর্জিতম্। হূয়মানমপি অবিধিনা হুতং, ন যথাহুতমিত্যেতৎ।

এবং দুঃসম্পাদিতম্ অসম্পাদিতম্ অগ্নিহোত্রাদ্যপলক্ষিতং কৰ্ম্ম কিং করোতী- ত্যুচ্যতে—আসপ্তমান্ সপ্তমসহিতান্ তস্য কর্ত্তুলোকান্ হিনস্তি হিনস্তীব আয়াসমাত্র- ফলত্বাৎ। সম্যক্রিয়মাণেষু হি কর্মসু কৰ্ম্মপরিণামানুরূপ্যেণ ভূরাদয়ঃ সত্যান্তাঃ সপ্ত লোকাঃ ফলং প্রাপ্যন্তে। তে লোকা এবস্তৃতেন অগ্নিহোত্রাদিকৰ্ম্মণা তু অপ্রাপ্যত্বাৎ হিংস্যন্ত ইব, আয়াসমাত্রন্তু অব্যভিচারীত্যতো হিনস্তীত্যুচ্যতে। পিণ্ড- দানাদ্যনুগ্রহেণ বা সম্বধ্যমানাঃ পিতৃপিতামহ প্রপিতামহাঃ পুত্রপৌত্র প্রপৌত্রাঃ স্বাত্মোপকারাঃ সপ্ত লোকা উক্ত প্রকারেণ অগ্নিহোত্রাদিনা ন ভবন্তীতি হিংস্যন্ত- ইত্যুচ্যতে॥ ১২ ॥ ৩ ॥

ভাষানুবাদ।

কি প্রকারে? অর্থাৎ বিপৎ সম্ভব হয় কি প্রকারে?[তাহা কথিত হইতেছে], যে অগ্নিহোত্রীর ‘অগ্নিহোত্র’ যাগটি অদর্শ—‘দর্শ’- নামক কৰ্ম্মবর্জ্জিত হয়, অগ্নিহোত্রীর পক্ষে ‘দর্শ’ যাগ অবশ্য কর্ত্তব্য; এই জন্য[দর্শ যাগটি যেন] অগ্নিহোত্রীর অনুষ্ঠেয় অগ্নিহোত্রের বিশেষণেরই মত প্রতীত হয়; তদ্রূপে ক্রিয়মাণ না হয়; ‘অপৌর্ণমাস’ প্রভৃতি স্থলেও সেইরূপই বুঝিতে হইবে; কারণ, অগ্নিহোত্রাঙ্গ বিষয়ে দর্শের সহিত ইহার কিছুমাত্র বিশেষ নাই, অর্থাৎ উভয়ই অগ্নিহোত্রের তুল্য অঙ্গ। অপৌর্ণমাস, অর্থাৎ ‘পৌর্ণমাস’-নামক কর্ম্মরহিত। অচাতুর্মাস্য অর্থাৎ চাতুর্মাস্যনামক কর্ম্মবর্জ্জিত, অনা- গ্রয়ণ—আগ্রয়ণ কর্ম্মটি শরদাদি ঋতুতে কর্ত্তব্য, যে অগ্নিহোত্রে তাহা অনুষ্ঠিত হয় না, তাহাই অনাগ্রয়ণ। অতিথিবর্জ্জিত অর্থাৎ প্রাহ্নহ

৩০ মুণ্ডকোপনিষৎ।,[ দ্বিতীয়ঃ

যাহার অতিথি সেবা করা না হয়। ‘স্বয়ং যথাযথভাবে অগ্নিহোত্র সময়েও যাহাতে হোম করা না হয়। দর্শাদি কর্ম্মের ন্যায় বৈশ্বদেব কৰ্ম্মও যাহাতে অনুষ্ঠিত হয় না; আর হইলেও যথাবিধি হোম হয় না, অর্থাৎ যথাবিধি হুত হয় না।

এইভাবে দুঃসম্পাদিত কিংবা অসম্পাদিত অগ্নিহোত্রাদি কৰ্ম্ম কি করিয়া থাকে? তাহা কথিত হইতেছে—সেই কর্মকর্তার আ সপ্তম অর্থাৎ সপ্তমের সহিত লোকসমূহ(সপ্ত লোকই) হিংসা করে, কেবল কষ্টমাত্র স’র বলিয়া যেন[সপ্ত লোককে] হিংসাই করে,[এইরূপ বুঝিতে হইবে]। কর্মসমূহ যথাযথভাবে সম্পাদিত হইলে, সেই সকল কর্মানুসারে ভূঃপ্রভৃতি সত্যলোক পর্য্যন্ত সপ্ত লোক ফলরূপে প্রাপ্ত হওয়া যায়; কিন্তু উক্তপ্রকার কৰ্ম্ম দ্বারা সেই সকল লোক প্রাপ্ত হওয়া যায় না; পরন্তু কর্মানুষ্ঠানে যে ক্লেশ, তাহা ত নিশ্চিতই থাকে, এই কারণে, হিংসা করে বলা হইতেছে। অথবা, পিণ্ডদানাদি দ্বারা সম্বধ্যমান পিতা, পিতামহ ও প্রপিতামহ এবং[গ্রাসাচ্ছাদনাদি দ্বারা] উপক্রিয়মাণ পুত্র, পৌত্র ও প্রপৌত্র আর নিজের উপকার, এই সপ্তপ্রকার লোক এইরূপ অগ্নিহোত্রাদি দ্বারা সম্পন্ন হয় না; এই কারণে ‘হিংসা করে’ বলা হইয়াছে ॥১২৷৷৩৷৷

কালী করালী চ মনোজবা চ সুলোহিতা যা চ সুধূম্রবর্ণা। স্ফুলিঙ্গিনী বিশ্বরুচী চ দেবী লেলায়মানা ইতি সপ্ত জিহ্বাঃ ॥ ১৩ ॥ ৪ ॥

[ হবিগ্রহণসমর্থা অগ্নেঃ সপ্ত জিহ্বা আহ]—কালীত্যাদিনা। কালী, করালী চ, মনোজবা চ সুলোহিতা, যা চ(অপি) সুধূম্রবর্ণা, স্ফুলিঙ্গিনী(স্ফুলিঙ্গবতী) দেবী(সর্ব্বতঃ প্রোজ্জলা) বিশ্বরুচী চ, লেলায়মানাঃ(চপলা হবিগ্রহণসমর্থাঃ) ইতি(এতাঃ) সপ্ত জিহ্বাঃ[ দহনস্যেতি শেষঃ]।

খণ্ডঃ।] প্রথমং মুক্তকম্। ৩১

কালী, করালী, মনোজবা, সুলোহিতা, সুধূম্রবর্ণা, স্ফুলিঙ্গিনী ও বিশ্বরুচী, এই সাতটি অগ্নির জিহ্বা ॥১৩৷৷৪॥]

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

কালী করালী চ মনোজবা চ সুলোহিতা যা চ সুধূম্রবর্ণা। স্ফুলিঙ্গিনী বিশ্বরুচী চ দেবী, লেলায়মানা ইতি সপ্ত জিহ্বাঃ। কাল্যাদ্যা বিশ্বরুচ্যন্তা লেলায়- মানা অগ্নেহবিরাহুতিগ্রসনার্থা এতাঃ সপ্ত জিহ্বাঃ ॥ ১৩ ॥ ৪ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

কালী, করালী, মনোজবা, সুলোহিতা, আর যে সুধূম্রবর্ণা, স্ফুলিঙ্গিনী এবং দ্যোতমানা বিশ্বরুচী, অগ্নির লেলায়মান এই সাতটি জিহ্বা আছে। ‘কালী’ হইতে ‘বিশ্বরুচী’ পর্য্যন্ত এই সাতটি অগ্নিজিহ্বা লেলায়মান অর্থাৎ হবির আহুতি গ্রহণ করিতে সমর্থ ॥ ১৩ ॥ ৪ ॥

এতেষু যশ্চরতে ভ্রাজমানেষু

তন্নয়ন্ত্যেতাঃ সূর্য্যস্য রশ্ময়ো যত্র দেবানাং পতিরেকোহধিবাসঃ ॥ ১৪ ॥ ৫ ॥

[ইদানীং তৎপ্রয়োগমাহ]—এতেষিতি। যঃ(অগ্নিহোত্রী) ভ্রাজমানেষু (দীপ্যমানেষু) এতেষু(জিহ্বাভেদেষু) চরতে(কৰ্ম্ম আচরতি); এতাঃ (অগ্নিহোত্রিণা সম্পাদিতাঃ) আহুতয়ঃ হি(নিশ্চয়ে) যথাকালং(যস্য কৰ্ম্মণঃ যঃ কালঃ, তং কালম্ অনতিক্রম্য) সূর্য্যস্য রশ্ময়ঃ[ভূত্বা] আদদায়ন্(যজমানম্ আদদানাঃ সত্যঃ) তং(দেশং) নয়ন্তি(প্রাপয়ন্তি), যত্র(স্বর্গে) একঃ(অদ্বিতীয়ঃ) দেবানাং পতিঃ(ইন্দ্রঃ) অধিবাসঃ(অধিবসতি)।

যে অগ্নিহোত্রী প্রদীপ্ত এই জিহ্বাসমূহে হোমকর্ম্ম অনুষ্ঠান করে, এই আহুতি সমূহই যথাকালে সূর্য্যরশ্মিভাবে সেই যজমানকে লইয়া সেই স্থান প্রাপ্ত করায়, যেখানে অদ্বিতীয় দেবপতি(ইন্দ্র) বাস করেন ॥১৪॥৫॥

শাঙ্করভাষ্যম্।

এতেষু অগ্নিহ্বাদেয়ং যঃ অগ্নিহোত্রী চরতে কর্ম্ম আচরতি অগ্নিহোত্রাদিকং

৫২ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

ভ্রাজমানেষু দীপ্যমানেষু। যথাকালঞ্চ যস্য কর্ম্মণো যঃ কালঃ তং কালম্ অনতিক্রম্য যথাকালং যজমানমাদদায়ন্ আদদানা আহুতয়ো যজমানেন নির্বর্তিতাঃ তং নয়ন্তি প্রাপয়ন্তি। এতা আহুতয়ঃ, যা ইমা অনেন নির্ব্বর্তিতাঃ সূর্য্যস্য রশ্ময়ো ভূত্বা, রশ্মি- দ্বারৈরিত্যর্থঃ। যত্র যস্মিন্ স্বর্গে দেবানাং পতিরিন্দ্র একঃ সর্ব্বানুপরি অধি- বসতীত্যধিবাসঃ ॥ ১ ॥ ৫ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

যে অগ্নিহোত্রী দীপ্যমান এইসকল অগ্নিজিহ্বাতে অগ্নিহোত্রাদি কর্ম্মের অনুষ্ঠান করে, যজমানসম্পাদিত অর্থাৎ যজমানকর্তৃক যে সকল আহুতি সম্পাদিত হইয়াছে, সেই আহুতিনিচয় যথাকালে যজমানকে আদানপূর্ব্বক সূর্যরশ্মি হইয়া অর্থাৎ সূর্যরশ্মি দ্বারা যেখানে—যে স্বর্গে দেবগণের পতি ইন্দ্র সর্ব্বোপরি বাস করিয়া থাকেন, সেই স্থান প্রাপ্ত করায় ॥ ১৪ ॥ ৫ ॥

এহ্যেহীতি তমাহুতয়ঃ সুবর্চ্চসঃ সূর্য্যস্য রশ্মিভির্যজমানং বহন্তি। প্রিয়াং বাচমভিবদন্ত্যোঽর্চ্চয়ন্ত্য

এষ বঃ পুণ্যঃ সুকৃতো ব্রহ্মলোকঃ ॥ ১৫ ॥ ৬ ॥

[ইদানীং সূর্যরশ্মিদ্বারকবহন প্রকারমাহ]--এহ্যেহীত্যাদি। সুবর্চ্চসঃ(দীপ্তি- মত্যঃ) আহুতয়ঃ(অগ্নিহোত্রে নিষ্পাদিতাঃ) ‘এহি এহি’ ইতি[আহ্বয়ন্ত্যঃ], অর্চ্চয়ন্ত্যঃ(স্তুত্যাদিভিঃ পূজয়ন্ত্যঃ), এষঃ(নিদ্দিশ্যমানঃ) পুণ্যঃ(পবিত্রঃ) ব্রহ্মলোকঃ(স্বর্গফলরূপঃ) বঃ(যুষ্মাকং) সুকৃতঃ(পন্থাঃ),[এবং] প্রিয়াং বাচং(বাক্যং) অভিবদন্ত্যঃ(কথয়ন্ত্যঃ চ)[সত্যঃ] সূর্যস্য রশ্মিভিঃ (দ্বারভূতৈঃ) তং যজমানং বহন্তি(স্বর্গং গময়ন্তীত্যর্থঃ)।

দীপ্তিসম্পন্ন সেই আহুতিসমূহ ‘এস এস’ বলিয়া আহ্বান করতঃ, স্তুতি প্রভৃতি দ্বারা অর্চ্চনা করতঃ এবং এই পবিত্র ব্রহ্মলোক তোমাদের কর্ম্মলব্ধ ফল, এইরূপ প্রিয়বাক্য কথনপূর্ব্বক সূর্যরশ্মি দ্বারা সেই যজমানকে বহন করিয়া থাকে ॥ ১৫ ॥ ৬

৩:।] প্রথমঃ মুণ্ডকম্। ৩৩

শাঙ্করভাষ্যম্।

কথং সূর্য্যস্য রশ্মিভির্যজমানং বহন্তীতি? উচ্যতে—এহি এহি ইতি আহ্বয়ন্তঃ তং যজমানম্ আহুতয়ঃ সুবর্চ্চসো দীপ্তিমত্যঃ; কিঞ্চ, প্রিয়াম্ ইষ্টাং বাচং স্তুত্যাদি- লক্ষণাম্ অভিবদন্ত্য উচ্চারয়ন্ত্যঃ অর্চ্চয়ন্ত্যঃ পূজয়ন্ত্যশ্চ এষ বো যুগ্মাকং পুণ্যঃ সুকৃতঃ ব্রহ্মলোকঃ ফলরূপঃ, এবং প্রিয়াং বাচম্ অভিবদন্ত্যো বহন্তীত্যর্থঃ। ব্রহ্মলোকঃ স্বর্গঃ প্রকরণাৎ ॥ ১৫ ॥ ৬ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

কিপ্রকারে সূর্যরশ্মি দ্বারা যজমানকে বহন করে? তাহা কথিত হইতেছে--সুবর্চ্চস্ অর্থাৎ দীপ্তিমতী আহুতিসমূহ সেই যজমানকে ‘এস এস’ বলিয়া আহ্বান করতঃ, আর স্তবাদিরূপ প্রিয়-ইষ্টবাক্য উচ্চারণকরতঃ এবং অর্চ্চনা-পূজা করতঃ এই পবিত্র ব্রহ্মলোকই তোমাদের সুকৃত-কৰ্ম্মফলস্বরূপ, এইপ্রকার প্রিয়বাক্য বলিতে বলিতে বহন করিয়া থাকে। প্রকরণানুসারে এখানে ব্রহ্মলোক অর্থ-স্বর্গ ॥ ১৫ ॥ ৬॥

প্লবা হোতে অদৃঢ়া যজ্ঞরূপা অষ্টাদশোক্তমবরং যেষু কৰ্ম্ম। এতচ্ছেয়ো যেইভিনন্দন্তি মূঢ়া জরামৃত্যুং তে পুনরেবাপি যন্তি ॥ ১৬ ॥ ৭ ॥[জ্ঞানরহিতস্য কর্মণো নিন্দার্থমাহ]-প্লবাঃ ইতি। যেষু(অষ্টাদশযু যজ্ঞরূপেষু) অবরং(জ্ঞানরহিতত্বাৎ নিকৃষ্টং) কৰ্ম্ম উক্তং(শাস্ত্রেণ বিহিতং); হি(যস্মাৎ) এতে অষ্টাদশ(ষোড়শ ঋত্বিজঃ, যজমানঃ, পত্নী চ, ইত্যষ্টাদশ- সংখ্যাকাঃ) যজ্ঞরূপাঃ(যজ্ঞনির্ব্বাহকাঃ) অথবা, এতে যজ্ঞরূপা অষ্টাদশ প্লবাঃ (সংসার-সন্তরণোপায়াঃ) অদৃঢ়াঃ(অস্থিরাঃ);[তস্মাৎ] প্লবন্তে(ফলেন সহ বিনশ্যন্তি ইত্যর্থঃ)। যে মুঢ়াঃ(বিবেকরহিতাঃ) এতৎ(জ্ঞানরহিতং কৰ্ম্ম) শ্রেয়ঃ(শ্রেয়োরূপং) অভিনন্দন্তি(বহু মন্যন্তে); তে(মুঢ়াঃ) পুনঃ এব(ভূয়োভূয়ঃ) জরা-মৃত্যুং(জরাং চ মৃত্যুং চ) অপিযস্তি(প্রাপ্নুবন্তি) [ন পুনর্মুক্তিম্, ইত্যভিপ্রায়ঃ]।

৩৪ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

এই যে, অষ্টাদশ ঋত্বিক্সাধ্য যজ্ঞরূপ প্লব(সংসার-সাগরোত্তরণের ভেলা) যাহাতে হীনফলপ্রদ কৰ্ম্ম উক্ত হইয়াছে; ইহা দৃঢ়তর নহে—বিনাশশীল। যে সকল মূঢ়ব্যক্তি ইহাকেই ‘শ্রেয়ঃ’ বলিয়া আদর করে, তাহারা পুনর্ব্বার জরা ও মৃত্যু লাভ করে(মুক্ত হইতে পারে না) ॥১৬৷৭॥

শাঙ্করভাষ্যম্।

এতচ্চ জ্ঞানরহিতং কৰ্ম্ম এতাবৎফলম্ অবিদ্যাকামকৰ্ম্মকাৰ্য্যম্, অতঃ অসারং দুঃখমূলমিতি নিন্দ্যতে-প্লবা বিনাশিনঃ ইত্যর্থঃ। হি যস্মাৎ এতে অদূঢ়াঃ অস্থিরাঃ যজ্ঞরূপাঃ যজ্ঞস্য রূপানি যজ্ঞরূপাঃ যজ্ঞানির্বর্ত্তকাঃ অষ্টাদশ অষ্টাদশসংখ্যাকাঃ ষোড়শ ঋত্বিজঃ পত্নী যজমানশ্চ ইত্যষ্টাদশ। এতদাশ্রয়ং কৰ্ম্ম উক্তং কথিতং শাস্ত্রেণ, যেষু অষ্টাদশসু অবরং কেবলং জ্ঞানবজ্জিতং কৰ্ম্ম। অতস্তেষাম্ অবরকর্মাশ্রয়াণাম্ অষ্টাদশানাম্ অদূঢ়তয়া প্লবত্বাৎ প্লবতে সহ ফলেন তৎসাধ্যং কৰ্ম্ম; কুণ্ডবিনাশাদিব (১১) ক্ষীরদধ্যাদীনাং তৎস্থানাং নাশঃ; যত এবমেতৎ কৰ্ম্ম শ্রেয়ঃ শ্রেয়ঃসাধনম্ ইতি যে অভিনন্দন্তি অভিহৃষ্যন্তি অবিবেকিনো মূঢ়াঃ, অতস্তে জরাং চ মৃত্যুং চ জরামৃত্যুং, কঞ্চিৎ কালং স্বর্গে স্থিত্বা পুনরেব অপি যন্তি ভূয়োহপি গচ্ছন্তি ॥ ১৬॥ ৭॥

এই যে জ্ঞানরহিত কৰ্ম্ম, ইহার ফলও এই পর্যন্ত-অবিদ্যা ও কামকৰ্ম্মপ্রসূত; অতএব অসার-দুঃখনিদান, এইজন্য ইহার নিন্দা করা হইতেছে-‘প্লব’ অর্থ-বিনাশশীল, যেহেতু যে অষ্টাদশের আশ্রয়ে আশ্রিত অবর-জ্ঞানরহিত কেবল কৰ্ম্ম শাস্ত্রে উক্ত হইয়াছে। যেহেতু, সেই এই অষ্টাদশ-ষোড়শ ঋত্বিক্, যজমান ও তৎপত্নী, এই অষ্টাদশসংখ্যক যজ্ঞরূপ যজ্ঞের নিরূপক-অর্থাৎ যজ্ঞনির্বাহক যাজ্ঞিকগণ অদূঢ় অস্থির(ক্ষয়োন্মুখ); অতএব, কুণ্ডের(পাত্রবিশেষের) বিনাশে যেরূপ সেই কুণ্ডস্থ দধিপ্রভৃতিও বিনষ্ট হইয়া যায়, সেইরূপ উক্ত অবর-কর্মাশ্রয়ীভূত অষ্টাদশের অদূঢ়তাহেতু তৎসাধ্য(তাহাদের নিষ্পাদিত) কৰ্ম্মও ফলের সহিত বিনষ্ট হইয়া যায়। যেহেতু মুঢ় অর্থাৎ বিবেকহীন ব্যক্তিরা উক্তপ্রকার কর্মকেই শ্রেয়ঃ অর্থাৎ পরম

খণ্ডঃ।] প্রথমং মুণ্ডকম্। ৫৫

কল্যাণসাধন বলিয়া সমাদর করে; অতএব, তাহারা কিয়ৎকাল স্বর্গে অবস্থিতি করিয়া পুনশ্চ জরা ও মৃত্যু প্রাপ্ত হইয়া থাকে ॥ ১৬ ॥ ৭ ॥

অবিদ্যায়ামন্তরে বর্তমানাঃ স্বয়ং ধীরাঃ পণ্ডিতম্মন্যমানাঃ। জঙ্ঘন্যমানাঃ পরিয়ন্তি মূঢ়া অন্ধেনৈব নীয়মানা যথান্ধাঃ ॥ ১৭ ॥ ৮ ॥

অবিদ্যায়াম্ অন্তরে(অবিদ্যামধ্যে) বর্তমানাঃ স্বয়ং[এব] ধীরাঃ(ধীমন্তঃ) পণ্ডিতম্মন্যমানাঃ(আত্মানং পণ্ডিতং মন্যন্তে) জঙ্ঘন্যমানাঃ(রোগাদিভিঃ ভূশং পুনঃ পুনর্ব্বা পীড্যমানাঃ) মূঢ়াঃ(অবিবেকাঃ) অন্ধেন নীয়মানাঃ(পরিচাল্যমানাঃ) অন্ধাঃ যথা(অন্ধা ইব) পরিয়ন্তি(বিভ্রমন্তি—বিপদ্যন্তে ইত্যর্থঃ)।

অবিদ্যামধ্যে বাস করে, সুতরাং আপনিই আপনাকে ধীর ও পণ্ডিত বলিয়া মনে করে এবং রোগাদি অনর্থরাশি দ্বারা বারবার অতিশয়রূপে পীড্যমান মূঢ় ব্যক্তিরা অন্ধপরিচালিত অন্ধের ন্যায়[উদ্ভ্রান্তভাবে] ভ্রমণ করে ॥১৭৷৮৷৷

শাঙ্করভাষ্যম্।

কিঞ্চ, অবিদ্যায়াম্ অন্তরে মধ্যে বর্তমানাঃ অবিবেকপ্রায়াঃ স্বয়ং বয়মেব ধীরাঃ ধীমন্তঃ পণ্ডিতা বিদিতবেদিতব্যাশ্চ ইতি মন্যমানা আত্মানং সম্ভাবয়ন্তঃ, তে চ জঙ্ঘন্যমানাঃ জরারোগাদ্যনেকানর্থব্রাতৈহন্যমানা ভূশং পীড্যমানাঃ পরিয়ন্তি বিভ্রমন্তি মূঢ়াঃ। দর্শনবজ্জিতত্বাৎ অন্ধেনৈব অচক্ষুষ্কেণৈব নীয়মানাঃ প্রদর্শ্যমানমার্গাঃ যথা লোকে অন্ধা অক্ষিরহিতা গর্ত্ত-কণ্টকাদৌ পতন্তি, তদ্বৎ ॥ ১৭ ॥ ৮ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

অপিচ, অবিদ্যার মধ্যে বর্তমান অর্থাৎ অবিবেকবহুল, নিজেই ‘আমরা ধীর, বুদ্ধিমান্ এবং পণ্ডিত অর্থাৎ সমস্ত জ্ঞাতব্য বিষয় অবগত হইয়াছি,’ এইরূপে আপনাকে সম্ভাবিত—সম্মানিত করে; সেই সকল মূঢ় ব্যক্তি জঙ্ঘন্যমান হইয়া—জরা ও রোগাদি নানাবিধ অনর্থ দ্বারা পীড্যমান হইয়া পরিভ্রমণ করে। দর্শনশক্তি না থাকায় অন্ধকর্তৃক অর্থাৎ অক্ষিহীনকর্তৃক নীয়মান—প্রদর্শিতপথ অন্ধ—চক্ষুরহিত লোক

৩৬ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

সমূহ যেরূপ গর্ত্ত ও কণ্টকাদিতে পতিত হইয়া থাকে, তাহারাও সেইরূপ—॥ ১৭ ॥ ৮ ॥

অবিদ্যায়াং বহুধা বর্তমানা বয়ং কৃতার্থা ইত্যভিমন্যন্তি বালাঃ। যৎ কর্ম্মিণো ন প্রবেদয়ন্তি রাগাৎ তেনাতুরাঃ ক্ষীণলোকাশ্যবন্তে ॥ ১৮ ॥ ৯ ॥

কিঞ্চ, অবিদ্যায়াং(অজ্ঞানবহুলব্যাপারে) বহুধা(নানাপ্রকারেণ) বর্তমানাঃ বালাঃ(অবিবেকিনঃ) বয়ং কৃতার্থাঃ(কৃতকৃত্যাঃ) ইতি(এবং) অভিমন্যন্তি(অভিমানং কুর্ব্বন্তি)। যৎ(যস্মাৎ হেতোঃ) কর্ম্মিণঃ(জ্ঞানরহিত- কর্মানুষ্ঠাতারঃ) রাগাৎ(ফলাসক্তেঃ হেতোঃ) ন প্রবেদয়ন্তি(তত্ত্বং ন জানন্তি), [তস্মাৎ] ক্ষীণলোকাঃ(ক্ষীণকর্মফলাঃ`[অতএব] আতুরাঃ(দুঃখার্ত্তাঃ সন্তঃ) চ্যবন্তে(স্বর্গাৎ পতন্তীত্যর্থঃ) ॥

নানাপ্রকারে অবিদ্যার অভ্যন্তরে অবস্থিত, বালকগণ(মূঢ়গণ) অভিমান করিয়া থাকে যে, ‘আমরা কৃতার্থ হইয়াছি।’ যেহেতু কর্মাসক্ত ব্যক্তিরা ফলাসক্তিবশতঃ(প্রকৃত তত্ত্ব] জানিতে পারে না, সেইহেতু স্বর্গাদি লোক- ভোগ শেষ হইলে দুঃখার্ত্ত হইয়া সেই লোক হইতে চ্যুত হইয়া থাকে ॥১৮৷৯৷

শঙ্করভাষ্যম্।

কিঞ্চ, অবিদ্যায়াং বহুধা বহুপ্রকারং বর্তমানাঃ বয়মেব কৃতার্থাঃ কৃতপ্রয়োজনা ইত্যেবম্ অভিমন্যন্তি অভিমন্যন্তে অভিমানং কুর্ব্বন্তি বালা অজ্ঞানিনঃ। যদ্ যস্মাদেবং কর্মিণো ন প্রবেদয়ন্তি তত্ত্বং ন জানন্তি, রাগাৎ কৰ্ম্মফলরাগাভিভবনিমিত্তং, তেন কারণেন আতুরা দুঃখার্তাঃ সন্তঃ ক্ষীণলোকাঃ ক্ষীণকৰ্ম্মফলাঃ স্বর্গলোকাৎ চ্যবন্তে ॥ ১৮ ॥ ৯ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

নানাপ্রকারে অবিদ্যার মধ্যে বর্তমান বালকগণ অর্থাৎ অজ্ঞলোকেরা ‘আমরা নিশ্চয়ই কৃতার্থ অর্থাৎ প্রয়োজন সম্পাদন করিয়াছি,’ এইরূপ অভিমান করিয়া থাকে। যেহেতু এইপ্রকার কর্ম্মিগণ রাগবশতঃ

খণ্ডঃ।] প্রথমং মুক্তকম্। ৩৭

অর্থাৎ কর্মফলে অনুরাগজনিত অভিভব বশতঃ প্রকৃত তত্ত্ব বুঝিতে পারে না; সেইহেতু ক্ষীণলোক অর্থাৎ স্বর্গাদি লোকক্ষয়ের পর আতুর —দুঃখার্ত্ত হইয়া স্বর্গলোক হইতে চ্যুত হইয়া থাকে ॥ ১৮॥ ৯॥

ইষ্টাপূর্ত্তং মন্যমানা বরিষ্ঠং নান্যচ্ছে য়ো বেদয়ন্তে প্রমূঢ়াঃ। নাকস্য পৃষ্ঠে তে সুকৃতেহনুভূত্বে- মং লোকং হীনতরং বা বিশন্তি ॥ ১৯—১০ ॥

কিঞ্চ, প্রমূঢ়াঃ(অবিবেকিনঃ) ইষ্টাপূর্ত্তং(ইষ্টং-শ্রৌতং যাগাদি, পূর্ত্তং- স্মার্ত্তং বাপীকূপাদি-দানলক্ষণং কৰ্ম্ম) বরিষ্ঠং(সর্ব্বোৎকৃষ্টং) মন্যমানাঃ(চিন্তয়ন্তঃ সন্তঃ) অন্যৎ শ্রেয়ঃ(পরমকল্যাণং)[অস্তীতি] ন বেদয়ন্তে(বুধ্যন্তে)। তে(প্রমূঢ়াঃ) সুকৃতে(কর্মলন্ধে) নাকস্য পৃষ্ঠে(স্বর্গোপরি) অনুভূত্বা(ফলম্ অনুভূয়) ইমং লোকং(মর্ত্যাখ্যং) হীনতরং(ইতোহপি নিকৃষ্টং লোকং) বা(অপি) আবিশন্তি,-তত্র জায়ন্তে ইত্যর্থঃ।

অত্যন্ত মূঢ়গণ ইষ্ট ও পূর্ত্ত কর্ম্মকেই সর্ব্বশ্রেষ্ঠ মনে করিয়া থাকে; অপর শ্রেয়ঃ আছে বলিয়া জানে না। তাহারা পুণ্যলব্ধ স্বর্গপৃষ্ঠে কর্ম্মফল অনুভব করিয়া এই লোকে কিংবা ইহা অপেক্ষাও অপকৃষ্ট লোকে প্রবেশ করে ॥১৯৷৷১০৷৷

শঙ্করভাষ্যম্।

ইষ্টাপূর্তম্—ইষ্টং যাগাদি শ্রৌতং কৰ্ম্ম, পূর্ত্তং বাপীকূপতড়াগাদি স্মার্ত্তং কৰ্ম্ম, মন্যমানা এতদেব অতিশয়েন পুরুষার্থসাধনং বরিষ্ঠং প্রধানমিতি চিন্তয়ন্তঃ, অন্যৎ আত্মজ্ঞানাখ্যং শ্রেয়ঃসাধনং ন বেদয়ন্তে ন জানন্তি প্রমূঢ়াঃ পুত্রপশুবান্ধবাদিযু প্রমত্ততয়া মূঢ়াঃ; তে চ নাকস্য স্বর্গস্থ্য পৃষ্ঠে উপরিস্থানে সুকৃতে ভোগায়তনে অনুভূত্বা অনুভূয় কর্ম্মফলং পুনরিমং লোকং মানুষম্ অস্মাৎ হীনতরং বা তির্য্যঙ- নরকাদিলক্ষণং যথাকৰ্ম্মশেষং বিশস্তি ॥ ১৯ ॥ ১০ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

ইষ্টাপূর্ত্ত—ইষ্ট অর্থে—শ্রুতিবিহিত যাগাদি কৰ্ম্ম, আর পূর্ত্ত অর্থে স্মৃতিবিহিত বাপী-কূপ-তড়াগাদি দানক্রিয়া, প্রমুঢ়গণ অর্থাৎ পুত্র,

৩৮ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

পশু ও বন্ধুবর্গে আসক্তিনিবন্ধন মোহগ্রস্ত ব্যক্তিরা, উক্ত ইষ্টাপূর্ত্ত কর্মকেই নিরতিশয় পুরুষার্থ-সাধন—বরিষ্ঠ বা প্রধান মনে করে— চিন্তা করে, তদতিরিক্ত প্রকৃত শ্রেয়ঃসাধন আত্মজ্ঞান জানিতে পারে না। তাহারা সুকৃত অর্থাৎ ভোগায়তন নাকপৃষ্ঠে অর্থাৎ স্বর্গের উপরিস্থানে কর্মফল অনুভব করিয়া, পুনর্ব্বার এই মনুষ্য- লোকে অথবা এতদপেক্ষা হীনতর তির্য্যগ্যোনি ও নরকাদিস্থানে নিজ নিজ কৰ্ম্মশেষানুসারে(১২) প্রবেশ করে ॥১৯৷৷১০

তপঃশ্রদ্ধে যে হ্যপবসন্ত্যরণ্যে, শান্তা বিদ্বাংসো ভৈক্ষচর্য্যাং চরন্তঃ। সূর্যদ্বারেণ তে বিরজাঃ প্রয়ান্তি যত্রামৃতঃ স পুরুষো হব্যয়াত্মা ॥ ২০ ॥ ১১ ॥

[ইদানীং জ্ঞানবতাং ফলমাহ]—‘তপঃ’ ইত্যাদিনা। যে হি শান্তাঃ (সংযতেন্দ্রিয়াঃ বানপ্রস্থাঃ সন্ন্যাসিনশ্চ) ভৈক্ষচর্য্যাং চরন্তঃ(ভিক্ষামাত্রোপজীব্যাঃ) অরণ্যে[বর্ত্তমানাঃ সন্তঃ] বিদ্বাংসঃ(জ্ঞানবন্তঃ গৃহস্থাঃ চ) তপঃশ্রদ্ধে—তপঃ স্বাশ্রমবিহিতং কৰ্ম্ম, শ্রদ্ধা(হিরণ্যগর্ভাদিবিষয়া বিদ্যা), তে তপঃশ্রদ্ধে উপ- বসন্তি(সেবন্তে), তে বিরজাঃ(বিরজস্কাঃ পুণ্যপাপরহিতাঃ সন্তঃ) সূর্য্যদ্বারেণ (উত্তরেণ পথা) যত্র(যস্মিন্ সত্যলোকাদৌ) হি সঃ(প্রসিদ্ধঃ) অব্যয়াত্মা (যাবৎসংসারস্থায়ী) অমৃতঃ পুরুষঃ(হিরণ্যগর্ভঃ)[বর্ত্ততে]; তত্র প্রযান্তি (গচ্ছন্তি)।

ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বনপূর্ব্বক অরণ্যে বাস করতঃ যে সমস্ত সংযতেন্দ্রিয়

খণ্ডঃ।] প্রথমং মুণ্ডকম্। ৩৯

বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাসী এবং জ্ঞানসম্পন্ন যে সকল গৃহস্থ তপস্যা ও শ্রদ্ধার সেবা করেন, তাহারা সূর্য্য দ্বারা অর্থাৎ উত্তরায়ণ পথে—যেখানে সেই অব্যয়- স্বরূপ অমৃতপুরুষ হিরণ্যগর্ভ বাস করেন, সেখানে গমন করেন ॥২০॥১১৷৷

শাঙ্করভাষ্যম্।

যে পুনস্তদ্বিপরীতজ্ঞানযুক্তা বানপ্রস্থাঃ সন্ন্যাসিনশ্চ, তপঃশ্রদ্ধে হি-তপঃ স্বাশ্রমবিহিতং কৰ্ম্ম, শ্রদ্ধা হিরণ্যগর্ভাদিবিষয়া বিদ্যা, তে তপঃশ্রদ্ধে উপবসন্তি সেবন্তে অরণ্যে বর্তমানাঃ সন্তঃ। শান্তা উপরতকরণগ্রামাঃ। বিদ্বাংসো গৃহস্থাশ্চ জ্ঞানপ্রধানা ইত্যর্থঃ। ভৈক্ষচর্য্যাং চরন্তঃ পরিগ্রহাভাবাৎ উপবসন্ত্যরণ্যে ইতি সম্বন্ধঃ। সূর্য্যদ্বারেণ সূর্য্যোপলক্ষিতেন উত্তরেণ পথাতে বিরজাঃ বিরজসঃ ক্ষীণ- পুণ্যপাপকৰ্ম্মাণঃ সন্ত ইত্যর্থঃ। প্রযান্তি প্রকর্ষেণ যান্তি যত্র যস্মিন্ সত্যলোকাদৌ অমৃতঃ স পুরুষঃ প্রথমজো হিরণ্যগর্ভো হব্যয়াত্মা অব্যয়স্বভাবো যাবৎসংসারস্থায়ী। এতদন্তাস্ত সংসারগতয়োহপরবিদ্যাগম্যাঃ।

নন্वेतং মোক্ষমিচ্ছন্তি কেচিৎ? ন, “ইহৈব সর্ব্বে প্রবিলীয়ন্তি কামাঃ”, “তে সর্ব্বগং সর্ব্বতঃ প্রাপ্য ধীরা যুক্তাত্মানঃ সর্ব্বমেবাবিশন্তি” ইত্যাদিশ্রুতিভ্যঃ, অপ্রকরণাচ্চ। অপরবিদ্যাপ্রকরণে হি প্রবৃত্তে ন হ্যকস্মান্মোক্ষপ্রসঙ্গোহস্তি। বিরজত্ত্বন্তু আপেক্ষিকম্। সমস্তমপরবিদ্যাকার্য্যং সাধ্যসাধনলক্ষণং ক্রিয়াকারকফল- ভেদভিন্নং দ্বৈতম্ এতাবদেব যৎ হিরণ্যগর্ভপ্রাপ্ত্যবসানম্। তথাচ মনুনোক্তং স্থাবরাদ্যাং সংসারগতিমনুক্রামতা—“ব্রহ্মা বিশ্বসৃজো ধর্ম্মো মহানব্যক্তমেব চ। উত্তমাং সাত্ত্বিকীমেতাং গতিমাহুৰ্ম্মনীষিণঃ” ইতি ॥ ২০ ॥ ১১ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

পক্ষান্তরে, যাহারা তদ্বিপরীত জ্ঞানসম্পন্ন বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাসী অরণ্যে বাস করতঃ সংযতেন্দ্রিয় হইয়া এবং ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বনপূর্ব্বক, আর বিদ্বান্ অর্থাৎ জ্ঞানপ্রধান গৃহস্থগণও তপস্যাও শ্রদ্ধার—তপ অর্থ —নিজ নিজ আশ্রমবিহিত কৰ্ম্ম, আর শ্রদ্ধা অর্থ—হিরণ্যগর্ভাদিবিষয়ক বিদ্যা, এতদুভয়ের সেবা করেন। বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাসীর পক্ষে প্রতিগ্রহ নিষিদ্ধ, এইজন্য ভৈক্ষচর্য্যা তাঁহাদের সম্বন্ধেই বিহিত। তাঁহারা বিরজস্ক অর্থাৎ পুণ্যপাপরহিত হইয়া সূর্য্য দ্বারা অর্থাৎ সূর্য্যোপলক্ষিত

৪০ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

উত্তরায়ণ পথে সেই স্থানে প্রকৃষ্টরূপে গমন করে—যে সত্যলোকাদি স্থানে অমৃত ও অব্যয়াত্মা স্বভাবতঃ বিকার বা ক্ষয়হীন অর্থাৎ সম্পূর্ণ সংসারকালস্থায়ী সেই প্রথমোৎপন্ন পুরুষ হিরণ্যগর্ভ অবস্থান করেন। অপর বিদ্যা দ্বারা এই পর্য্যন্ত সংসারগতি লাভ করা যায়।

ভাল, কেহ কেহ ত এই গতিকেই মোক্ষ বলিয়া মনে করেন? না—ইহা হইতে পারে না; কারণ, ‘এখানেই সমস্ত কামনা বিলীন হইয়া যায়।’ ‘সেই ধীরগণ সর্ব্বগত ব্রহ্মকে সর্ব্বতোভাবে প্রাপ্ত হইয়া যুক্তাত্মা হইয়া সর্ব্বস্বরূপে প্রবেশ করেন’ ইত্যাদি শ্রুতি হইতে[জানা যায় যে, মুক্ত পুরুষের স্থানবিশেষে গতি হয় না]; অপ্রাসঙ্গিকতাও অপর হেতু—এখানে অপর বিদ্যাত্ব প্রকরণ আরব্ধ হইয়াছে; তন্মধ্যে অকস্মাৎ মোক্ষের প্রসঙ্গ আসিতে পারে না। তবে এখানে যে, বিরজ- স্কতা বলা হইয়াছে, তাহা আপেক্ষিক অর্থাৎ কর্ম্মিগণের অপেক্ষা বিরজ- স্কতামাত্র। সাধ্য-সাধনাত্মক এবং ক্রিয়া কারক ও ফলভেদ-সম্পন্ন, সমস্ত অপর বিদ্যার দ্বৈত ফল এই হিরণ্যগর্ভপদ প্রাপ্তি পর্য্যন্ত, এতদ- পেক্ষা আর অধিক ফল নাই। দেখ, স্থাবরাদি সংসারগতি বর্ণন প্রসঙ্গে মনুও বলিয়াছেন—‘ব্রহ্মা’ বিশ্বস্রষ্টা(মরীচি প্রভৃতি) ধর্ম্ম, মহান্ (হিরণ্যগর্ভ) ও প্রকৃতি, এই সকল পদপ্রাপ্তিকেই মনীষিগণ উত্তম সাত্ত্বিক গতি বলিয়া নির্দ্দেশ করিয়া থাকেন ॥ ২০॥১১ ॥

পরীক্ষ্য লোকান্ কৰ্ম্ম-চিতান্ ব্রাহ্মণো নির্ব্বেদমায়ান্নাস্ত্যকৃতঃ কৃতেন। তদ্বিজ্ঞানার্থং স গুরুমেবাভিগচ্ছেৎ সমিৎপাণিঃ শ্রোত্রিয়ং ব্রহ্মনিষ্ঠম্ ॥ ২১৷১২ ॥

[ অথেদানীং ব্রহ্মনিষ্ঠস্য বৈরাগ্যপ্রকারমাহ]—পরীক্ষ্যেত্যাদিনা। ‘ব্রাহ্মণঃ [(ব্রহ্মনিষ্ঠঃ জনঃ, ব্রাহ্মণজাতির্ব্বা) কর্ম্মচিতান্(কর্ম্মণা নিষ্পাদিতান্) লোকান্ (ফলানি) পরীক্ষ্য(অনিত্যতয়া অবধার্য্য)[সংসারে] অকৃতঃ(নিত্যঃ পদার্থঃ)

খণ্ডঃ।] প্রথমং মুণ্ডকম্। ৪১

নাস্তি,[সর্বমেব কৃতমিত্যাশয়ঃ], কৃতেন(অনিত্যেন)[নাস্তি মে প্রয়োজনম্; ইতি] অথবা কৃতেন(কর্মণা) অকৃতঃ(নিত্যঃ মোক্ষঃ) নাস্তি(ন ভবতি, ইতি কৃত্বা) নির্ব্বেদং(বৈরাগ্যং) আয়াৎ(গচ্ছেৎ)। তদ্বিজ্ঞানার্থং(তস্য সত্যব্রহ্মণঃ জ্ঞানার্থং) সঃ(নির্ব্বিন্নঃ) সমিৎপাণিঃ(উপায়নহস্তঃ সন্) শ্রোত্রিয়ং (বেদজ্ঞং) ব্রহ্মনিষ্ঠং(ব্রহ্মণি তৎপরং) গুরুম্ এব অভিগচ্ছেৎ(সর্বতঃ শরণং গচ্ছেৎ)।

ব্রাহ্মণ কর্ম্মার্জিত লোকসমূহ(ফলসমূহ) পরীক্ষা করিয়া অর্থাৎ অনিত্য অসার বলিয়া অবধারণ করিয়া—জগতে অকৃত(নিত্য) কোন বস্তু নাই, এবং কৃত বা অনিত্য বস্তুতেও আমার প্রয়োজন নাই; এই ভাবিয়া বৈরাগ্য লাভ করিবে। সেই বৈরাগ্য প্রাপ্ত ব্যক্তি সেই সত্য ব্রহ্মবিজ্ঞানের উদ্দেশে সমিৎপাণি হইয়া শ্রোত্রিয় ও ব্রহ্মনিষ্ঠ গুরুকেই সর্ব্বতোভাবে আশ্রয় করিবে ॥২১॥১২৷৷

শাঙ্করভাষ্যম্।

অথেদানীমস্মাৎ সাধ্য-সাধনরূপাৎ সর্বস্মাৎ সংসারাৎ বিরক্তস্য পরস্যাং বিদ্যায়া- মধিকার প্রদর্শনার্থমিদমুচ্যতে-পরীক্ষ্য যদেতদ্ ঋগ্বেদাদ্যপরবিদ্যাবিষয়ং স্বাভা- বিকাবিদ্যাকাম-কৰ্ম্মদোষবৎ-পুরুষানুষ্ঠেয়ম্ অবিদ্যাদিদোষবন্তম্ এব পুরুষং প্রতি বিহিতত্বাৎ, তদনুষ্ঠানকার্য্যভূতাশ্চ লোকা যে দক্ষিণোত্তরমার্গলক্ষণাঃ ফলভূতাঃ, যে চ বিহিতাকরণ-প্রতিষেধাতিক্রমদোষসাধ্যা নরকতির্য্যক্-প্রেত লক্ষণাঃ, তান্ এতান্ পরীক্ষ্য প্রত্যক্ষানুমানোপমানাগমৈঃ সর্ব্বতো যাথাত্ম্যেন অবধার্য্য লোকান্ সংসারগতিভূতান্ অব্যক্তাদিস্থাবরান্তান্ ব্যাকৃতাব্যাকৃতলক্ষণান্ বীজাঙ্কুরবদিতরে- তরোৎপত্তিনিমিত্তান্ অনেকানর্থশতসহস্রসঙ্কুলান্ কদলীগর্ভবদসারান্ মায়ামরীচ্যুদক- গন্ধর্ব্ব-নগরাকার-স্বপ্ন-জলবুদ্বুদফেনসমান্ প্রতিক্ষণপ্রধ্বংসান্ পৃষ্ঠতঃ কৃত্বা অবিদ্যা- কামদোষ প্রবর্তিতকর্মচিতান্ ধর্মাধর্মনির্বর্তিতান্ ইত্যেতৎ। -ব্রাহ্মণঃ ব্রাহ্মণস্যৈব বিশেষতোহধিকারঃ সর্ব্বত্যাগেন ব্রহ্মবিদ্যায়াম্ ইতি ব্রাহ্মণগ্রহণম্। পরীক্ষ্য লোকান্ কিং কুৰ্য্যাদিত্যুচ্যতে-নির্ব্বেদং, নিঃপূর্ব্বো বিদিরত্র বৈরাগ্যার্থে; বৈরাগ্যম্ আয়াৎ কুৰ্য্যাদিত্যেতং। স বৈরাগ্যপ্রকার: প্রদর্শ্যতে-ইহ সংসারে নাস্তি কশ্চিদপি অকৃতঃ পদার্থঃ। সর্ব্ব এব হি লোকাঃ কর্মচিতাঃ, কৰ্ম্মকৃতত্বাচ্চ অনিত্যাঃ। ন নিত্যং কিঞ্চিদস্তীত্যভিপ্রায়ঃ। সর্ব্বন্তু কৰ্মানিত্যস্যৈব সাধনম্। যস্মাচ্চতুর্বিধমেব হি সর্ব্বং কৰ্ম্ম কার্য্যম্ উৎপাদ্যমাপ্যং বিকার্য্যং সংস্কার্যং বা; নাতঃপরং কর্ম্মণো

৪২ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

বিষয়োহস্তি। অহঞ্চ নিত্যেন অমৃতেন অভয়েন কূটস্থেন অচলেন ধ্রুবের্থেন অর্থী, ন তদ্বিপরীতেন। অতঃ কিং কৃতেন কৰ্ম্মণা আয়াসবহুলেন অনর্থসাধনেন, ইত্যেবং নির্ব্বিগ্নোহভয়ং শিবমকৃতং নিত্যং পদং যৎ, তদ্বিজ্ঞানার্থং বিশেষেণ অধিগমার্থং স নির্ব্বিগ্নো ব্রাহ্মণো গুরুমেব আচার্য্যঃ শমদমদয়াদিসম্পন্নম্ অভিগচ্ছেৎ। শাস্ত্রজ্ঞো- হপি স্বাতন্ত্র্যেণ ব্রহ্মজ্ঞানান্বেষণং ন কুৰ্য্যাদিত্যেতৎ “গুরুমেব” ইত্যবধারণফলম্। সমিৎপাণিঃ সমিদ্দারগৃহীতহস্তঃ, শ্রোত্রিয়ম্ অধ্যয়নশ্রুতার্থসম্পন্নং ব্রহ্মনিষ্ঠং হিত্বা সর্ব্বকর্মাণি, কেবলেহদ্বয়ে ব্রহ্মণি নিষ্ঠা যস্য সোহয়ং ব্রহ্মনিষ্ঠঃ, জপনিষ্ঠস্তপোনিষ্ঠ ইতি যদ্বৎ। ন হি কর্মিণো ব্রহ্মনিষ্ঠতা সম্ভবতি, কৰ্ম্মাত্মজ্ঞানয়োর্বিরোধাৎ। স তং গুরুং বিধিবদুপসন্নঃ প্রসাদ্য পৃচ্ছেদক্ষরং পুরুষং সত্যম্ ॥ ২১॥১২॥

ভাষ্যানুবাদ।

অনন্তর, সাধ্য-সাধনভাবাপন্ন এই সমস্ত সংসার হইতে বিরক্ত ব্যক্তিরই যে, পরবিদ্যায় অধিকার তাহার প্রদর্শনার্থ এখন এই বাক্য কথিত হইতেছে—এই যে ঋগ্বেদাদি অপর বিদ্যার বিষয়ীভূত স্বভাব- সিদ্ধ অবিদ্যা ও কাম-কর্ম্মাদি দোষ সম্পন্ন পুরুষের অনুষ্ঠেয়, কেন না, অবিদ্যাদি দোষসম্পন্ন পুরুষের জন্যই ঐ সকল কর্ম্ম বিহিত হইয়াছে। [ সেই সকল কৰ্ম্ম ও] তদনুষ্ঠানের ফলস্বরূপ যে, দক্ষিণায়ন ও উত্তরা- য়ণগম্য লোকসমূহ, আর বিহিতের অকরণ ও প্রতিষেধ-লঙ্ঘন-দোষ জনিত যে নরক, তির্য্যক্ ও প্রেতভাবাদি অবস্থা, এই সমস্ত পরীক্ষা করিয়া প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান ও আগম প্রমাণ দ্বারা সর্ব্বতোভাবে যথাযথরূপে অবধারণ করিয়া অর্থাৎ অব্যক্ত প্রকৃতি হইতে স্থাবর পর্যন্ত, স্কুল-সূক্ষ্ম উভয়াত্মক, বীজাস্কুরের ন্যায় পরস্পর পরস্পরের হেতুভূত বহু শতসহস্র অনর্থসমাকুল, কদলীগর্ভের ন্যায় অসার মায়া মরীচিকা-জল, গন্ধর্ব্বনগরসদৃশ, স্বপ্ন ও জলবুদ্ধুদের ফেনতুল্য এবং প্রতিক্ষণ ধ্বংসোন্মুখ, অবিদ্যা ও কামকর্ম্মময়দোষপ্রসূত, ধর্ম্মাধর্ম্মজনক সংসারের গন্তব্য লোকসমূহ পশ্চাৎ রাখিয়া—ব্রাহ্মণ, সর্ব্বপরিত্যাগ পূর্ব্বক ব্রহ্মবিদ্যালাভে ব্রাহ্মণেরই বিশেষ অধিকার; এইজন্য ব্রাহ্মণের

[ খণ্ডঃ] প্রথমঃ মুণ্ডকম্। ৪৩

উল্লেখ হইয়াছে। লোকসমূহ পরীক্ষা করিয়া কি করিবে? তাহা বলা হইতেছে-(এখানে নির্ পূর্বক বিদধাতু বৈরাগ্যার্থে প্রযুক্ত হইয়াছে) নির্বেদ প্রাপ্ত হইবে-অর্থাৎ বৈরাগ্য লাভ করিবে।-এখন সেই বৈরাগ্যেরই প্রকার(বিশেষ ধৰ্ম্ম) প্রদর্শিত হইতেছে-এই সংসারে অকৃত(নিত্য) কোন পদার্থ নাই; কেন না, সমস্ত লোকই কৰ্ম্ম- নিষ্পাদিত; কৰ্ম্মনিষ্পাদিত বলিয়াই অনিত্য। অভিপ্রায় এই যে, (জগতে) কিছুমাত্র নিত্য পদার্থ নাই। আর কর্মমাত্রই অনিত্য ফলের সাধক, যেহেতু কর্তব্য কৰ্ম্ম সমুদয় চারি শ্রেণীতে বিভক্ত-উৎপাদ্য, আপ্য, বিকার্য্য ও সংস্কার্য্য,(১৩) এতদতিরিক্ত আর কর্মের বিষয় নাই। অথচ আমি কিন্তু নিত্য, অমৃত, অভয়, কূটস্থ, অচল ও ধ্রুব অর্থাৎ নিরতর অর্থের প্রার্থী,-তদ্বিপরীতের প্রার্থী নহি; অতএব, ক্লেশবহুল অনর্থসাধক কৃত-কর্ম্মে প্রয়োজন-কি? এইরূপে নির্বেদযুক্ত সেই ব্রাহ্মণ সর্বভয়রহিত মঙ্গলময়, অকৃত নিত্য যে পদ(ব্রহ্মপদ), তদ্বিজ্ঞা- নার্থ-বিশেষরূপে তাহা জানিবার জন্য শম, দম ও দয়াসম্পন্ন গুরুকেই অধিগত(প্রাপ্ত) হইবে। শাস্ত্রজ্ঞ হইলেও স্বাধীনভাবে ব্রহ্মকে জানিবার চেষ্টা করিতে নাই, ইহা জ্ঞাপন করাই “গুরুমেব” এই অবধারণের অভিপ্রায়। সমিৎপাণি অর্থ-হস্তে কাষ্ঠভার গ্রহণ করিয়া; শ্রোত্রিয় অর্থ- অধ্যয়নলব্ধ শাস্ত্রার্থ সম্পন্ন; ব্রহ্মনিষ্ঠ অর্থ- সমস্ত কৰ্ম্ম পরিত্যাগপূর্ব্বক একমাত্র অদ্বয় ব্রহ্মেতে যাঁহার নিষ্ঠা বা তৎপরতা আছে, তিনিই ব্রহ্মনিষ্ঠ, যেমন জপনিষ্ঠ ও তপোনিষ্ঠ ইত্যাদি। কর্মের সহিত আত্মজ্ঞানের যখন বিরোধ, তখন কর্মীর পক্ষে ব্রহ্মনিষ্ঠতা কখনই সম্ভবপর হয় না। সেই ব্রাহ্মণ যথাবিধি উপস্থিত

৪৪ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

হইয়া সেই গুরুকে প্রসন্ন করিয়া সত্যস্বরূপ অক্ষর পুরুষের কথা জিজ্ঞাসা করিবে ॥ ২১৷১২ ॥

তস্মৈ স বিদ্বানুপসন্নায় সম্যক্ প্রশান্তচিত্তায় শমান্বিতায়।

যেনাক্ষরং পুরুষং বেদ সত্যং প্রোবাচ তাং তত্ত্বতো ব্রহ্মবিদ্যাম্ ॥ ২২ ॥ ১৩ ॥

সঃ বিদ্বান্(গুরুঃ) উপসন্নায়(সমীপমাগতায়) সম্যক্ প্রশান্তচিত্তায়(দন্ত- দ্বেষাদিদোষরহিতমনসে) শমান্বিতায়(সংযতবহিরিন্দ্রিয়ায়) তস্মৈ(জিজ্ঞাসবে), যেন(যয়া বিদ্যয়া) সত্যম্ অক্ষরং(কূটস্থং) পুরুষং বেদ(বিজানাতি); তাং ব্রহ্মবিদ্যাং তত্ত্বতঃ(যথাবৎ) প্রোবাচ(প্রক্রয়াৎ)[ইত্যয়ং বিধিঃ] ॥ ইতি প্রথমমুণ্ডকে দ্বিতীয়খণ্ডব্যাখ্যা সমাপ্তা ॥

সেই অভিজ্ঞ গুরু সমীপাগত, সম্পূর্ণরূপে প্রশান্তচিত্ত(যাহার চিত্ত হইতে দন্তদ্বেষাদি দোষ বিদূরিত হইয়াছে), সমগুণান্বিত সেই শিষ্যের উদ্দেশে—যাহা দ্বারা সত্যস্বরূপ অক্ষর পুরুষকে জানা যায়, সেই ব্রহ্মবিদ্যা যথাযথরূপে বলিবে ॥২২৷৷২॥

ইতি প্রথমমুণ্ডক ব্যাখ্যা সমাপ্ত।

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

তস্মৈ স বিদ্বান্ গুরুঃ ব্রহ্মবিৎ, উপসন্নায় উপগতায়। সম্যগ, যথাশাস্ত্রমিত্যে- তৎ। প্রশান্তচিত্তায় উপরতদর্পাদিদোষায়। শমান্বিতায় বাহেন্দ্রিয়োপরমেণ চ যুক্তায়; সর্ব্বতো বিরক্তায়েত্যেতৎ। যেন বিজ্ঞানেন যয়া বিদ্যয়া চ পরয়া অক্ষরম্ অদ্রেশ্যাদিবিশেষণং, তদেবাক্ষরং পুরুষশব্দবাচ্যং পূর্ণত্বাৎ পুরি শয়নাচ্চ, সত্যং তদেব পরমার্থস্বাভাব্যাদব্যয়ম্, অক্ষরঞ্চ অক্ষরণাৎ অক্ষতত্বাৎ অক্ষয়ত্বাচ্চ, বেদ বিজা- নাতি; তাং ব্রহ্মবিদ্যাং তত্ত্বতো যথাবৎ প্রোবাচ প্রব্রয়াদিত্যর্থঃ। আচার্য্যস্যাপি অয়মের নিয়মঃ, যৎ ন্যায়প্রাপ্তসচ্ছিষ্য-নিস্তারণমবিদ্যা-মহোদধেঃ ॥ ২২ ॥ ১৩ ॥

ইতি প্রথমমুণ্ডকে দ্বিতীয়খণ্ডভাষ্যম্। ২॥,

ইতি শ্রীমৎপরমহংসপরিব্রাজকার্য্য-শ্রীগোবিন্দভগবৎপূজ্যপাদশিষ্য শ্রীমচ্ছঙ্কর- ভগবতঃ কৃতৌ মুণ্ডকোপনিষদ্ভাষ্যে প্রথমং মুণ্ডকং সমাপ্তম্ ॥

খণ্ডঃ।] প্রথমং মুণ্ডকম্। ৪৫

ভাষ্যানুবাদ।

সেই বিদ্বান্-ব্রহ্মবিৎ গুরু উপসন্ন-সমীপাগত, সম্যক্-শাস্ত্রানু- সারে প্রশান্তচিত্ত অর্থা: দর্পাদি-দোষবর্জিত, শমান্বিত অর্থাৎ যাহার বহিরিন্দ্রিয়নিচয় বিষয়-সঙ্গ হইতে নিবৃত্ত, অর্থাৎ সর্বতোভাবে বৈরাগ্যযুক্ত, সেই শিষ্যের উদ্দেশে-যে বিজ্ঞান বা যে পরাবিদ্যা দ্বারা অদৃশ্যত্বাদি গুণযুক্ত অক্ষরকে জানা যায়; সেই ব্রহ্মবিদ্যা যথাযথরূপে বলিবে অর্থাৎ তাহার উপদেশ দিবে। সেই অক্ষরই পূর্ণত্ব ও হৃদয়- পুরে অবস্থিতিহেতু ‘পুরুষ’ শব্দবাচ্য; সত্যস্বরূপ, অর্থাৎ স্বভাবতঃ পরমার্থ-স্বরূপ বিধায় অব্যয়াত্মক; আর ক্ষরণ-স্বরূপ-প্রচ্যুতি হয় না, ক্ষত হয় না, অথবা বিনষ্ট হয় না বলিয়া অক্ষর-পদবাচ্য।

যথারীতি সমাগত সৎ শিষ্যকে অবিদ্যা-মহাসমুদ্র হইতে নিস্তার করা যে, আচার্য্যের পক্ষেও অবশ্যপ্রতিপাল্য নিয়ম,[ “প্রক্রয়াৎ” শব্দে তাহাই বিজ্ঞাপিত হইয়াছে] ॥ ২২৷১৩॥

ইতি মুণ্ডকোপনিষদ্ ভাষ্যানুবাদে দ্বিতীয় খণ্ড। প্রথম মুণ্ডকভাষ্যানুবাদ সমাপ্ত ॥

দ্বিতীয়মুণ্ডকে

+3054

প্রথমঃ খণ্ডঃ।

তদেতৎ সত্যং, যথা সুদীপ্তাৎ পাবকাদ্বিস্ফূলিঙ্গাঃ সহস্রশঃ প্রভবস্তে সরূপাঃ।

তথাক্ষরাদ্বিবিধাঃ সোম্য ভাবাঃ

প্রজায়ন্তে তত্র চৈবাপিযন্তি ॥ ২৩ ॥ ১ ॥

[ইদানীং পরবিদ্যাবিষয়ং সত্যং পুরুষং বোধয়িতুমুপক্রমতে]-তদেতদিত্যাদিনা। তৎ(পূর্ব্বোক্তং পুরুষাখ্যম্ অক্ষরং) সত্যং(অনাপেক্ষিকসত্যস্বরূপং)। [দুর্জেয়ং তৎ কথং প্রতিপদ্যেত, ইত্যতো দৃষ্টান্তমাহ]-যথা সুদীপ্তাৎ(প্রজ- লিতাৎ) পাবকাৎ(বহ্নেঃ) বিস্ফুলিঙ্গাঃ(ক্ষুদ্রা অগ্নবয়বাঃ) সরূপাঃ(অগ্নি-সজা- তীয়া এব) সহস্রশঃ(অনেকশঃ) প্রভবন্তে(জায়ন্তে); হে সোম্য, তথা বিবিধাঃ(অনেকপ্রকারাঃ) ভাবাঃ(পদার্থাঃ) অক্ষরাৎ(সত্যাৎ পুরুষাৎ) প্রজায়ন্তে(উৎপদ্যন্তে) তত্র(অক্ষরে) এব অপিযন্তি(লীয়ন্তে) চ॥

সেই অক্ষর পুরুষই সত্যস্বরূপ, সুদীপ্ত অগ্নি হইতে যেমন তৎসদৃশ সহস্র সহস্র স্ফুলিঙ্গ সমুৎপন্ন হয়, হে সোম্য! তেমনি অক্ষর হইতে বিবিধ পদার্থ সমূহ সমুৎপন্ন হইয়া থাকে এবং তাহাতেই বিলীন হইয়া থাকে ॥ ২৩ ॥ ১ ॥

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

অপরবিদ্যায়াঃ সর্ব্বং কার্য্যমুক্তম্। স চ সংসারো বৎসারো যস্মাৎ মূলাৎ অক্ষরাৎ সম্ভবতি, যস্মিংশ্চ প্রলীয়তে, তদক্ষরং পুরুষাখ্যং সত্যম্। যস্মিন্ বিজ্ঞাতে সর্ব্বমিদং বিজ্ঞাতং ভবতি, তৎ পরস্যা ব্রহ্মবিদ্যায়া বিষয়ঃ; স বক্তব্য ইত্যুত্তরো গ্রন্থ আরত্যতে—

যদপরাধিব্যভিধায় কর্ম্মফললক্ষণং সত্যং, তদাপেক্ষিকম্। ইত্যর্থ পরিভাষা-

[৭৩।] দ্বিতীয়ং মুণ্ডকম্। ৪৭

বিষয়ং, পরমার্থ-সল্পক্ষণত্বাৎ। তদেতৎ সত্যং যথাভূতং বিদ্যাবিষয়ম্; অবিদ্যা- বিষয়ত্বাচ্চ অনৃতমিতরৎ। অত্যন্তপরোক্ষত্বাৎ কথং নাম প্রত্যক্ষবৎ সত্যম্ অক্ষরং প্রতিপদ্যেরন্? ইতি দৃষ্টান্তমাহ—যথা সুদীপ্তাৎ সুষ্টু দীপ্তাৎ ইদ্ধাৎ পাবকাৎ অগ্নেঃ বিস্ফুলিঙ্গা অগ্ন্যবয়বাঃ সহস্রশোহনেকশঃ প্রভবন্তে নির্গচ্ছন্তি সরূপা অগ্নি- সলক্ষণা এব, তথা উক্তলক্ষণাৎ অক্ষরাৎ বিবিধা নানাদেহোপাধিভেদমনু বিধীয়- মানত্বাৎ বিবিধা হে সোম্য, ভাবা জীবা আকাশাদিবৎ ঘটাদিপরিচ্ছিন্নাঃ সুষিরভেদা ঘটাদ্যপাধিপ্রভেদমনু ভবন্তি; এবং নানানামরূপকৃতদেহোপাধিপ্রভবমনু প্রজায়ন্তে, তত্র চৈব তস্মিন্নেবাক্ষরে অপিযন্তি দেহোপাধিবিলয়মনু লীয়ন্তে ঘটাদিবিলয়মনিৰ সুষিরভেদোৎপত্তি-প্রলয়নিমিত্তত্বং ঘটাদ্যপাধিকৃতমেব, তদ্বদক্ষরস্যাপি নামরূপকৃতদেহোপাধিনিমিত্তমেব জীবোৎপত্তি- প্রলয়নিমিত্তত্বম্ ॥২৩৷১।

ভাষ্যানুবাদ।

অপর বিদ্যার সমস্ত ফল কথিত হইয়াছে, সেই সংসারের যাহা সারভূত; অক্ষর-সংজ্ঞক যে মূল কারণ হইতে এই সংসার-সম্ভূত হয় এবং যাহাতে বিলীন হয়, সেই অক্ষর নামক পুরুষই সত্যস্বরূপ। যাহা বিজ্ঞাত হইলে এই সমস্তই বিজ্ঞাত হয়, তাহাই পরবিদ্যার বিষয়। তাহার নির্দেশের জন্যই পরবর্তী গ্রন্থ আরব্ধ হইতেছে—

অপর বিদ্যার বিষয়ীভূত যে কর্মফল, তাহা আপেক্ষিক সত্য; কিন্তু পরবিদ্যার বিষয় এই সত্যই[পারমার্থিক সত্য]; কারণ পারমার্থিক সত্তাই ইহার লক্ষণ বা স্বরূপ। পরবিদ্যার বিষয়ীভূত সেই এই পুরুষই সত্য—যথাভূত বস্তু; অপর বিদ্যার বিষয় বলিয়াই অপর সমস্ত অসত্য। সেই সত্য অক্ষর যখন অত্যন্ত পরোক্ষ(ইন্দ্রিয়ের অগোচর), তখন তাহাকে প্রত্যক্ষবৎ জানিতে পারা যায় কিরূপে? এই জন্য দৃষ্টান্ত বলিতেছেন—সুদীপ্ত অর্থাৎ উত্তমরূপে প্রজ্বলিত পাবক—অগ্নি হইতে যেরূপ সরূপ অর্থাৎ অগ্নিরই সমান-জাতীয় সহস্রশঃ—অনেকানেক বিস্ফুলিঙ্গ—অগ্নিকণা নির্গত হয়, হে সোম্য! তদ্রূপ উক্তপ্রকার অক্ষর হইতেও বিবিধ—নানাদেহরূপ উপাধি অনুসারে বিহিত হয়

৪৮ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

বলিয়া নানাবিধ ভাবসমূহ জীবগণ—আকাশাদি যেরূপ ঘটাদি দ্বারা পরিচ্ছিন্ন হইয়া ঘটাদি উপাধিভেদ অনুসারে বিভিন্ন ছিদ্রভাব প্রাপ্ত হইয়া থাকে; তদ্রূপ নানাবিধ নাম-রূপকৃত দেহরূপ উপাধির জন্ম অনুসারে জন্মলাভ করিয়া থাকে, আবার সেই অক্ষরেই অপ্যয় প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ ঘটাদির বিলয়ে যেমন তদধীন ছিদ্রভেদ সমূহ বিলীন হয়, ঠিক সেইরূপ বিলীন হইয়া থাকে। আকাশ যে ছিদ্রভেদের উৎপত্তি ও বিনাশ কারণ হয়, ঘটাদি উপাধিই যেমন তাহার নিদান, তেমনি অক্ষরই জীবের উৎপত্তি ও প্রলয়ের নিমিত্ত হয়, অর্থাৎ নামরূপকৃত দেহোপাধি সম্বন্ধই তাহার প্রকৃত কারণ ॥২৩৷১৷

দিব্যো হ্যমূর্ত্তঃ পুরুষঃ সবাহ্যাভ্যন্তরো হ্যজঃ। অপ্রাণো হ্যমনাঃ শুভ্রো হ্যক্ষরাৎ পরতঃ পরঃ॥২৪॥২॥

(সঃ অক্ষরঃ) পুরুষঃ হি(নিশ্চয়ে) দিব্যঃ(দ্যুতিমান্ অলৌকিকো বা), অমূর্ত্তঃ(মূর্তিবর্জিতঃ) সবাহ্যাভ্যন্তরঃ বাহ্যেন আভ্যন্তরেণ চ পদার্থেন সহ বর্ত- মানঃ), অজঃ(জন্মরহিতঃ), অপ্রাণঃ(ক্রিয়াশক্তিমৎপ্রাণবৃত্তিহীনঃ), অমনাঃ (জ্ঞানশক্তিযুক্তমনোবৃত্তিবর্জিতঃ) শুভ্রঃ(শুদ্ধঃ), পরতঃ(স্বকার্য্যাপেক্ষয়া পরত্বাৎ শ্রেষ্ঠাৎ) অক্ষরাৎ(অনুচ্ছেদস্বভাবাৎ অব্যক্তাৎ), পরঃ(শ্রেষ্ঠঃ) হি(নিশ্চয়ে) ॥

সেই অক্ষর পুরুষ নিশ্চয়ই দিব্য, মূর্ত্তিহীন, বাহ্য ও অভ্যন্তরে বর্তমান, অজ (জন্মরহিত), প্রাণ ও মনোহীন বিশুদ্ধ এবং কাৰ্য্যাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ অক্ষর-পদবাচ্য অব্যক্ত হইতেও পর ॥ ২৪ ॥ ২ ॥

শঙ্করভাষ্যম্।

নামরূপবীজভূতাৎ অব্যাকৃতাখ্যাৎ স্ববিকারাপেক্ষয়া পরাৎ অক্ষরাৎ পরং যৎ সর্ব্বোপাধিভেদবর্জ্জিতমক্ষরস্যৈব স্বরূপমাকাশস্যেব সর্ব্বমূর্ত্তিবর্জ্জিতং নেতি নেতীত্যাদিবিশেষণং বিবক্ষন্নাহ—

দিব্যো দ্যোতনবান্ স্বয়ংজ্যোতিষ্টাৎ। দিবি বা স্বাত্মনি ভবোহলৌকিকো বা। হি যস্মাৎ অমূর্ত্তঃ সর্ব্বমূর্ত্তিবর্জিতঃ, পুরুষঃ পূর্ণঃ পুরিশয়ো বা। সবাহ্যাভ্যন্তরঃ সহ বাহ্যাভ্যন্তরেণ বর্ত্তত ইতি। অজো ন জায়তে কুতশ্চিৎ স্বতোহন্যস্য

খণ্ডঃ।] দ্বিতীয়ং মুণ্ডকম্। ৪১

জন্মনিমিত্তস্য চাভাবাৎ; যথা জলবুদ্বুদাদের্ব্বাযাদিঃ; যথা নভঃসুষির- ভেদানাং ঘটাদিঃ। সর্ব্বভাববিকারাণাং জনিমূলত্বাৎ তৎপ্রতিষেধেন সর্ব্বে প্রতিষিন্ধা ভবন্তি। সবাহ্যাভ্যন্তরো হ্যজঃ, অতোহজরোহমৃতোহক্ষরো ধ্রুবোহভয় ইত্যর্থঃ।

যদ্যপি দেহাদ্যপাধিভেদদৃষ্টীনাম্ অবিদ্যাবশাৎ দেহভেদেবু * সপ্রাণঃ সমনাঃ সেন্দ্রিয়ঃ সবিষয় ইব প্রত্যবভাসতে তলমলাদিমদিবাকাশং, তথাপি তু স্বতঃ পরমার্থ- স্বরূপদৃষ্টীনাম্ অপ্রাণঃ অবিদ্যমানঃ ক্রিয়াশক্তিভেদবান্ চলনাত্মকো বায়ুর্যস্মিন্ অসৌ অপ্রাণঃ। তথা অমনাঃ--অনেকজ্ঞানশ ক্তিভেদবৎ সঙ্কল্লাদ্যাত্মকং মনোহপি অবিদ্য- মানং যস্মিন্ সোহরমমনাঃ। অপ্রাণো হামনাশ্চেতি প্রাণাদিবায়ুভেদাঃ কর্মেন্দ্রিয়াণি তদ্বিষয়াশ্চ তথা বুদ্ধিমনসী বুদ্ধীন্দ্রিয়াণি তদ্বিষয়াশ্চ প্রতিষিদ্ধা বেদিতব্যাঃ; যথা শ্রুত্যন্তরে ধ্যায়তীব লেলায়তীবেতি। যস্মাচ্চৈবং প্রতিষিদ্ধোপাধিরদ্বয়স্তস্মাচ্ছুভ্রঃ শুদ্ধঃ, অতোহক্ষরান্নামরূপবীজোপাধিলক্ষিতস্বরূপাং সর্ব্বকার্যকারণবীজত্বেন উপ- লক্ষ্যমাণত্বাৎ পরং তত্ত্বং তদুপাধিলক্ষণম্ অব্যাকৃতাখ। মক্ষরং সর্ববিকারেভ্যঃ, তস্মাৎ পরতোহক্ষরাৎ পরো নিরুপাধিকঃ পুরুষ ইত্যর্থঃ। যস্মিংস্তদাকাশাখ্যমক্ষরং সংব্যবহারবিষয়মোতঞ্চ পোতঞ্চ। কথং পুনরপ্রাণাদিমত্ত্বং তস্যেতি উচ্যতে- যদি হি প্রাণাদয়ঃ প্রাগুৎপত্তেঃ পুরুষ ইব স্বেনাত্মনা সন্তি, তদা পুরুষস্য প্রাণাদিনা বিদ্যমানেন প্রাণাদিমত্ত্বং স্যাৎ, নতু তে প্রাণাদয়ঃ প্রাগুৎপত্তেঃ সন্তি। অতোহ- প্রাণাদিমান্ পরঃ পুরুষঃ, যথা অনুৎপন্নে পুত্রে অপুত্রো দেবদত্তঃ ॥২৪৷৷২৷৷

ভাষ্যানুবাদ।

স্বীয় বিকার অপেক্ষায় মহৎ এবং নাম-রূপের বীজস্বরূপ যে, অব্যাকৃত বা অব্যক্তসংজ্ঞক অপর, তদপেক্ষাও পর শ্রেষ্ঠ আকাশের ন্যায় সর্বপ্রকার আকারবর্জিত, ‘নেতি নেতি’(ইহা নহে ইহা নহে) ইত্যাদি শ্রুতি দ্বারা বিশেষিত এবং উপাধিকৃত সর্বপ্রকার ভেদবর্জিত যে অক্ষর পুরুষের স্বরূপ, তাহা বলিবার অভিপ্রায়ে বলিতেছেন—

তিনি দিব্য অর্থাৎ দ্যুতিমান, কারণ, তিনি স্বয়ং জ্যোতিঃস্বরূপ, অথবা দিবে—আপনাতেই অবস্থিত, কিংবা অলৌকিক স্বরূপ। যেহেতু

৫০ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

অমূর্ত্ত অর্থাৎ সর্বপ্রকার মূর্ত্তিবিহীন, পুরুষ অর্থাৎ পূর্ণ কিংবা পুরে শয়ান(হৃৎপদ্মে স্থিত), সবাহ্যাভ্যন্তর অর্থাৎ বাহ্য ও আভ্যন্তরের সহিত বর্তমান(ভিতরে বাহিরে, সর্বত্র অবস্থিত); অজ—কোনও কারণ হইতে জন্মে না; জলবুদ্ধুদাদির যেরূপ বায়ু প্রভৃতি কারণ, এবং আকাশ চ্ছিদ্রভেদাদির প্রতি যেরূপ ঘটাদি পদার্থ কারণ; তদ্রূপ অপর কোন জন্ম নিমিত্ত না থাকায় এবং আপনা হইতেও জন্মের সম্ভাবনা না থাকায় [ তিনি অজ]। বস্তুর যতপ্রকার বিকার আছে, জন্মই তাহাদের মূল বা প্রথম; সুতরাং তাহার প্রতিষেধেই অপর বিকারসমূহও প্রসিদ্ধ হইতেছে। যেহেতু সবাহ্যাভ্যন্তর এবং অজ, এই কারণেই জরা মৃত্যু ও ক্ষয় রহিত এবং ধ্রুব(নিত্য) ও অভয়স্বরূপ।

দেহাদি ভেদদর্শী ব্যক্তিবর্গের নিকট অবিদ্যা-দোষবশে যদিও বিভিন্ন দেহে সপ্রাণ, সমনা, সেন্দ্রিয় ও সবিষয় বলিয়াই যেন পুরুষ প্রতিভাত হয়, আকাশ যেরূপ তল ও মলিনত্বাদি বিশিষ্টরূপে প্রতীত হয়; তদ্রূপ। তাহা হইলেও যাঁহারা প্রকৃত তত্ত্বদর্শী, তাঁহাদের নিকট অপ্রাণ অর্থাৎ ক্রিয়াশক্তিবিশেষ-সম্পন্ন চলনস্বভাব বায়ু(প্রাণবায়ু) যাঁহাতে বিদ্যমান নাই, তিনি অপ্রাণ। অনেকপ্রকার জ্ঞান- শক্তিসম্পন্ন সংকল্পাদিস্বভাবক মনও যাঁহাতে বিদ্যমান নাই, তিনি অমনাঃ। অপ্রাণ ও অমনা বলাতেই প্রাণাদি বায়ুভেদ, কর্মেন্দ্রিয় ও তাহাদের বিষয়(আদান প্রভৃতি) এবং বুদ্ধি, মন, জ্ঞানেন্দ্রিয় ও তাহাদের বিষয়সমূহও(দর্শনাদিও) প্রতিষিদ্ধ হইল বুঝিতে হইবে। যেমন অপর শ্রুতিতেও আছে, ‘যেন ধ্যানই করে, যেন গমনই করে‘। যেহেতু এইরূপে তাহাতে উপাধিদ্বয়-সম্বন্ধ প্রতি- ষিদ্ধ হইল, অতএব শুভ্র অর্থাৎ শুদ্ধ। অতএব, নাম-রূপ বীজাত্মক উপাধি দ্বারা যাহার স্বরূপ পরিচিত হয়, সেই অক্ষর হইতে-সমস্ত কার্য্য-কারণভাবের বীজভাব লক্ষিত হয় বলিয়া পর এবং সমস্ত কাৰ্য্যাপেক্ষা স্থিরতর বলিয়া ‘অক্ষর’ পদবাচ্য যে নামরূপোপাধিলক্ষিত

খণ্ডঃ।] দ্বিতীয়ং মুণ্ডকম্। ৫১

অব্যক্ত, নিরুপাধিক পুরুষ সেই পর অক্ষর অপেক্ষাও পর—শ্রেষ্ঠ। সর্বপ্রকার ব্যবস্থানিপাদক প্রসিদ্ধ আকাশ নামক অক্ষর যাহাতে ওত-প্রোতভাবে অবস্থিত; তাহার অপ্রাণত্বাদি ধৰ্ম্ম হয় কিরূপে? বলিতেছি—সৃষ্টির পূর্বের পুরুষের ন্যায় প্রাণ প্রভৃতিও যদি স্বরূপতঃ বিদ্যমান থাকিত, তাহা হইলে সেই সকল বিদ্যমান প্রাণাদি দ্বারা পুরু- যেরও প্রাণাদি সত্তা উৎপন্ন হইতে পারিত; কিন্তু উৎপত্তির পূর্ব্বে ত কখনই প্রাণাদি বিদ্যমান থাকিতে পারে না; অতএব যেমন পুত্র না হওয়া পর্য্যন্ত দেবদত্ত অপুত্রক থাকে, তেমনি পুরুষও অপ্রাণাদি বিশিষ্ট থাকেন ॥২৪॥২॥

এতস্মাচ্ছায়তে প্রাণো মনঃ সর্ব্বেন্দ্রিয়াণি চ।

খং বায়ুর্জ্জ্যোতিরাপঃ পৃথিবী বিশ্বস্য ধারিণী ॥২৫॥৩॥

এতস্মাৎ(পুরুষাং) প্রাণঃ, মনঃ, সর্ব্বেন্দ্রিয়াণি, খং(আকাশং) বায়ুঃ, জ্যোতিঃ(তেজঃ), আপঃ(জলানি) বিশ্বস্য ধারিণী(ভূতধাত্রী) পৃথিবী চ জায়তে(উৎপদ্যতে) ॥

প্রাণ, মনঃ, সমস্ত ইন্দ্রিয়াদি, আকাশ, বায়ু, জ্যোতি, জল ও বিশ্বধাত্রী পৃথিবী এই পুরুষ হইতে সমুৎপন্ন হয় ॥ ২৫ ॥ ৩ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।

কথং তে ন সন্তি প্রাণাদয় ইতি, উচ্যতে-যস্মাৎ এতম্মাদেব পুরুষাৎ নাম- রূপবীজোপাধিলক্ষিতাৎজায়তে উৎপদ্যতে অবিদ্যাবিষয়ো বিকারভূতো নামধেয়োহ- নৃতাত্মক: প্রাণঃ, “বাচারম্ভণং বিকারো নামধেয়মনৃতম্” ইতি শ্রুত্যন্তরাৎ। নহি তেনাবিদ্যাবিষয়েণ অনৃতেন প্রাণেন সপ্রাণত্বং পরস্য স্যাৎ, অপুত্রস্য স্বপ্নদৃষ্টেনেব পুত্রেণ সপুত্রত্বম্। এবং মনঃ সর্ব্বাণি চেন্দ্রিয়াণি বিষয়াশ্চ এতস্মাদেব জায়ন্তে। তস্মাৎ সিদ্ধমস্য নিরুপচরিতম্ অপ্রাণাদিমত্ত্বমিত্যর্থঃ। যথা চ প্রাগুৎপত্তেঃ পরমার্থ- তোহসন্তঃ, তথা প্রলীনাশ্চেতি দ্রষ্টব্যাঃ। যথা করণানি মনশ্চেন্দ্রিয়াণি, তথা শরীর- বিষয়কারণানি ভূতানি খমাকাশং, বায়ুব্বাহ্য আবহাদিভেদঃ, জ্যোতিরগ্নিঃ। আপ উদকম্। পৃথিবী ধরিত্রী বিশ্বস্য সর্ব্বস্য ধারিণী; এতানি চ শব্দস্পর্শরূপ- রসগন্ধোত্তরোত্তরগুণানি পূর্ব্বপূর্ব্বগুণসহিতানি এতস্মাদেব জায়ন্তে ॥২৫৷৷৩৷৷

৫২ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

ভাষ্যানুবাদ।

পুরুষে কেন যে প্রাণাদি নাই, তাহা বলা হইতেছে, যেহেতু নাম- রূপের বীজরূপ উপাধি-লক্ষিত পুরুষ হইতে অবিদ্যাধিকারস্থ মিথ্যা নামাত্মক প্রাণ সমুৎপন্ন হইয়া থাকে; কারণ অপর শ্রুতিতে আছে যে, বিকার বা কার্য্য মাত্রই বাক্যারব্ধ নাম মাত্রই মিথ্যা। অপুত্রক ব্যক্তির যেমন স্বপ্নদৃষ্ট পুত্রদ্বারা পুত্রবত্তা হয় না, তেমনি অবিদ্যার বিষয়ীভূত মিথ্যাভূত সেই প্রাণ দ্বারাও পুরুষের সপ্রাণত্ব হইতে পারে না। এইরূপ মনঃ, সমস্ত ইন্দ্রিয় ও ইন্দ্রিয়ের বিষয় ইহা হইতেই জন্মলাভ করিয়া থাকে। এই কারণে ইহার যথার্থ অপ্রাণাদিমত্তা সিদ্ধ হইল। উৎপত্তির পূর্বের যেমন সত্যসত্যই অসৎ, তেমনি প্রলীনাবস্থায়ও বুঝিতে হইবে। যেমন করণভূত মন ও ইন্দ্রিয়বর্গ, তেমনি শরীর ও ইন্দ্রিয় বিষয়ের কারণস্বরূপ ভূতবর্গ—আকাশ, আবহাদি বাহ্য বায়ু জ্যোতি—অগ্নি, জল ও সর্ববস্তুর ধরিত্রী পৃথিবী, ইহারাও আবার পূর্ব্ব পূর্ব্বগুণ সহযোগে উত্তরোত্তর বৃদ্ধিপ্রাপ্ত শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ গুণের সহিত এই পুরুষ হইতেই উৎপন্ন হইয়া থাকে ॥২৫॥৩৷৷

অগ্নির্মূদ্ধা চক্ষুষী চন্দ্রসূর্য্যৌ দিশঃ শ্রোত্রে বাথিবৃতাশ্চ বেদাঃ। বায়ুঃ প্রাণো হৃদয়ং বিশ্বমস্য পদ্্যাং পৃথিবী হ্যেষ সর্বভূতান্তরাত্মা ॥২৬৷৷৪॥

অস্য(যস্য পুরুষস্য) অগ্নিঃ(দ্যুলোকঃ) মূর্দ্ধা(শিরঃ), চন্দ্রসূর্য্যৌ চক্ষুষী, দিশঃ(পূর্ব্বাদ্যাঃ) শ্রোত্রে(কর্ণো’), বেদাঃ চ বাগ্বিবৃতাঃ(বাগিন্দ্রিয়ং) বায়ুঃ প্রাণঃ, বিশ্বং,(নিখিলং জগৎ) হৃদয়ং(অন্তঃকরণং), পদ্ভ্যাং পৃথিবী[জাতা], এষঃ সর্বভূতান্তরাত্মা(সর্বেষাং ভূতানাম্ অন্তরাত্মস্বরূপঃ) ॥

অগ্নি(দ্যুলোক) যাহার মস্তক, চন্দ্র ও সূর্য্য চক্ষুদ্বয়, দিক্সমূহ শ্রোত্রদ্বয়, বেদ সমূহ বাগবিস্তার(বাগিন্দ্রিয়), বায়ু প্রাণস্বরূপ, এবং সমস্ত জগৎ যাহার অন্তঃকরণ, আর পৃথিবী যাঁহার পাদদ্বয় হইতে জাত; তিনিই সর্ব্বভূতের অন্তরাত্মা ॥২৬“৪৷৷

খণ্ডঃ।] দ্বিতীয়ঃ মুণ্ডকম্। ৫০

শঙ্করভাষ্যম্।

সক্ষেপতঃ পরবিদ্যাবিষয়মক্ষরং নির্বিশেষং পুরুষং সত্যং “দিব্যো হ্যমূর্ত্তঃ” ইত্যাদিনা মন্ত্রেণোক্ত্বা পুনস্তদেব সবিশেষং বিস্তরেণ বক্তব্যমিতি প্রববৃতে; সক্ষেপবিস্তরোক্তো হি পদার্থঃ সুখাধিগম্যো ভবতি সূত্রভাষ্যোক্তিবদিতি।

যোহি প্রথমজাৎ প্রাণাং হিরণ্যগর্ভাজ্জায়তে অণ্ডস্যান্তব্বিরাট্, স তত্ত্বান্তরি- তত্বেন লক্ষ্যমাণোহপি এতস্মাদেব পুরুষাজ্জায়তে এতন্ময়শ্চেত্যেতদর্থমাহ, তঞ্চ বিশিনষ্টি—অগ্নিদ্যলোকঃ, “অসৌ বাব লোকো গৌতমাগ্নিঃ” ইতি শ্রুতেঃ। মৃদ্ধা যস্যোত্তমাঙ্গং শিরঃ। চক্ষুষী চন্দ্রশ্চ সূর্য্যশ্চেতি চন্দ্রসূর্য্যৌ; যস্যেতি সর্ব্ব- ত্রানুষঙ্গঃ কর্ত্তব্যঃ ‘অস্য’ ইত্যস্য পদস্য বক্ষ্যমাণস্থ্য যস্তেতি বিপরিণামং কৃত্বা। দিশঃ শ্রোত্রে যস্য। বাক্ বিবৃতা উদঘাটিতাঃ প্রসিদ্ধা বেদাঃ যস্য। বায়ুঃ প্রাণো যস্য। হৃদয়মন্তঃকরণং বিশ্বং সমস্তং জগৎ অস্য যস্যেত্যেতৎ। সর্ব্বং হন্তঃকরণ- বিকারমেব জগৎ, মনস্যের সুযুগে প্রলয়দর্শনাৎ, জাগরিতেহপি তত এবাগ্নি- বিস্ফুলিঙ্গবদ্বিপ্রতিষ্ঠানাৎ। যস্য চ পদ্ভ্যাং জাতা পৃথিবী। এষ দেবো বিষ্ণুরনন্তঃ প্রথমশরীরী ত্রৈলোক্যদেহোপাধিঃ সর্ব্বেষাং ভূতানামন্তরাত্মা। স হি সর্ব্বভূতেষু দ্রষ্টা শ্রোতা মন্তা বিজ্ঞাতা সর্ব্বকরণাত্মা ॥ ২৬॥ ৪ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

“দিব্য অমূর্ত্ত পুরুষ” ইত্যাদি মন্ত্রে সংক্ষেপতঃ পরবিদ্যার বিষয়ীভূত নির্বিশেষ সত্য অক্ষর পুরুষকে নিরূপণ করিয়া পুনর্ব্বার সবিস্তরে তাহাকেই বলিতে হইবে, এই জন্য পরবর্তী গ্রন্থ প্রবৃত্ত হইতেছে। কেন না, সূত্র-ভাষ্যুক্তি ন্যায়ে অর্থাৎ সূত্রগুলি যেমন সংক্ষিপ্ত থাকে, ভাষ্যে তাহারই বিস্তৃতি করা হয়, সেই নিয়মানুসারে বক্তব্য পদার্থ প্রথমতঃ সংক্ষেপে বলিয়া পশ্চাৎ বিস্তৃতভাবে বলিলে সহজেই বুদ্ধি- গম্য হয়।

প্রথমজ প্রাণসংজ্ঞক হিরণ্যগর্ভ হইতে যে ব্রহ্মাণ্ড মধ্যবর্তী বিরাট্ পুরুষ জন্ম ধারণ করেন, তিনি[আপাত দৃষ্টিতে] পৃথক্ তত্ত্ব বলিয়া প্রতীত হইলেও বস্তুতঃ এই অক্ষর পুরুষ হইতেই জাত এবং এতৎ- স্বরূপও বটে, ইহা প্রতিপাদনার্থই তাহাকে বিশেষ করিয়া বলিতেছেন,

৫৪ মুণ্ডকোপনিষৎ। প্রথমঃ

অগ্নি অর্থ দ্যুলোক, ‘হে গৌতম, এই দ্যুলোকই অগ্নিস্বরূপ’ এই শ্রুতিই তাহার হেতু বা প্রমাণ।[এই অগ্ন] যাহার মূর্দ্ধা-উত্তমাঙ্গ-মস্তক; চন্দ্র ও সূর্য্য[যাহার] চক্ষুদ্বয়; পরবর্তী ‘অস্য’ পদটিকে ‘যস্য’রূপে পরিণত(যস্য) করিয়া ‘যস্য’ পদটির সববত্র সম্বন্ধ করিতে হইবে। দিক্সমূহ যাহার কর্ণদ্বয়। বিবৃত অর্থাৎ প্রকটিকৃত-প্রসিদ্ধ বেদ সমুদয় যাহার বাক্(বাগিন্দ্রিয়)। আবহাদি বায়ু যাহার প্রাণ, বিশ্ব- সমস্ত জগৎ ইহার অর্থাৎ যাহার হৃদয়-অন্তঃকরণ; কারণ, সমস্ত জগৎই অন্তঃকরণের(ইচ্ছাশক্তির) বিকার বা পরিণাম; কেন না সুষুপ্তি সময়ে মনেই সমস্ত বস্তুর প্রলয় হয়, এবং জাগ্রৎসময়ে আবার মন হইতেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গের ন্যায় বহির্গত হয়। যাহার পাদদ্বয় হইতে পৃথিবী জন্মিয়াছে। প্রথম শরীরধারী এবং ত্রৈলোক্য-দেহরূপ উপাধি- বিশিষ্ট এই ব্যাপক অনন্তদেবই সমস্ত ভূতের অন্তরাত্মা। কারণ, তিনিই দ্রষ্টা, শ্রোতা, মননকর্ত্তা, বিজ্ঞাতা ও সমস্ত কারণরূপে(ভোগ- সাধন ইন্দ্রিয়াদিরূপে) সববভূতে বর্তমান ॥২৬৷৪৷৷

তস্মাদগ্নিঃ সমিধো যস্য সূর্য্যঃ সোমাৎ পর্জন্য ওষধয়ঃ পৃথিব্যাম্। পুমান্ রেতঃ সিঞ্চতি যোষিতায়াং বহ্বীঃ প্রজাঃ পুরুষাৎ সম্প্রসূতাঃ ॥২৭৷৫॥

[ইদানীং তস্মাদেব পুঃষাৎ পঞ্চাগ্নিদ্বারেণ প্রজোৎপত্তিমাহ]—তস্মাদিত্যাদিনা। তস্মাৎ(পুরুষাং) অগ্নিঃ(দ্যুলোকঃ)[জায়তে]; সূর্য্যঃ যস্য(দ্যুলোকস্য) সমিধঃ(ইন্ধনস্থানীয়ঃ); সোমাৎ(সোমসম্পৃক্তাৎ দ্যুলোকাৎ) পর্জন্যঃ(মেঘঃ) [সম্প্রসূতঃ],[পর্জ্জন্যাৎ] ওষধয়ঃ(ব্রীহিযবাদয়ঃ) পৃথিব্যাং[সম্প্রসূতাঃ]; [ততশ্চ] পুমান্(পুরুষরূপঃ চতুর্থঃ অগ্নিঃ) যোষিতায়াং(যোষিতি) রেতঃ সিঞ্চতি(ত্যজতি), পুরুষাৎ বহ্বীঃ(বহ্ব্যঃ অনেকাঃ) প্রজাঃ সম্প্রসূতাঃ(সমুৎ- পন্না ভবন্তি)।॥

সূর্য্য যাহার কাষ্ঠ-স্থানীয়, সেই অগ্নি(দ্যুলোক) এই পুরুষ হইতে জন্ম লাভ

খণ্ডঃ। দ্বিতীয় মুণ্ডকম্। ৫৫

করে; দ্যুলোক-সম্বন্ধ সোম হইতে মেঘ হয়, মেঘ হইতে পৃথিবীতে ওষধি সমূহ জন্মে; অনন্তর পুরুষ স্ত্রীতে রেতঃসেক করে, পুরুষ হইতে বহুতর প্রজা উৎ- পন্ন হয় ॥২৭॥৫৷৷

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

পঞ্চাগ্নিদ্বারেণ চ যাঃ সংসারন্তি প্রজাঃ তা অপি তস্মাদেব পুরুষাৎ প্রজায়ন্ত ইহাচ্যতে—

তস্মাৎ পরস্মাৎ পুরুষাৎ পজাবস্তানবিশেষরূপোহগ্নিঃ। স বিশেষ্যতে— সমিধো যস্য সূর্য্যঃ, সমিধ ইব সমিধঃ; সূর্য্যেণ হি দ্যুলোকঃ সমিধ্যতে। ততো হি দ্যুলোকাগ্নের্নিষ্পন্নাৎ সোমাৎ পর্জ্জন্যা দ্বিতীয়োহগ্নিঃ সম্ভবতি। তস্মাচ্চ পর্জ্জন্যাদোষধয়ঃ পৃথিব্যাং ভবন্তি। ওষধিভ্যঃ পুরুষাগ্নৌ হুতাভ্য উপাদান- ভূতাভ্যঃ পুমানগ্নী রেতঃ বিঞ্চতি যোষিতায়াং যোষিতি যে-যাগ্নৌ স্ত্রিয়ামিতি। এবং ক্রমেণ বহ্বীর্ব্বহ্ব্যঃ প্রজাঃ ব্রাহ্মণাদ্যাঃ পুরুষাৎ পরস্মাৎ সম্প্রসূতাঃ সমুৎ- পন্নাঃ ॥ ২৭ ॥ ৫ ॥

ভাষানুবাদ।

যে সমস্ত প্রজা পঞ্চাগ্নি(১৪) দ্বারা জন্মলাভ করে, তাহারাও সেই পুরুষ হইতেই জন্মলাভ করে; ইহা কথিত হইতেছে—

(১৪) ছান্দোগ্যোপনিষদ ৫ম প্রঃ, তৃতীয় পণ্ডে পঞ্চাগ্নি সম্বন্ধে বিস্তৃত বিবরণ প্রদত্ত আছে। তাহার সংক্ষিপ্ত মর্ম্ম এইরূপ--শ্বেতকেতু নামক এক ঋষিকুমার পঞ্চালরাজের সভায় গমন করিয়াছিলেন। সেখানে প্রবাহণনামক রাজা শ্বেতকেতুকে পাঁচটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন; তন্মধ্যে একটি প্রশ্ন এই- “বেথ যথা পঞ্চম্যামাহুরৌ আপঃ পুরুষবচসো ভবন্তীত”। পঞ্চমী আহতিতে অ’হুত জল যেরূপে পুরুষ পদবাচ্য হয় অর্থাৎ মানুষদেহ লাভ করে, তাহা তুমি জান কি? শ্বেতকেতু সেই পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর প্রদানে অশক্ত হইয়া পিতার নিকট প্রত্যাগমন করিলেন এবং রাজার প্রশ্ন জ্ঞাপন করিলেন; তখন পিতা গৌতম নিজেই প্রবহণ রাজার সমীপে উপস্থিত হইয়া প্রশ্নের উত্তর জানিতে চাইলেন,-তদুত্তরে প্রবহণ গৌতমকে সম্বাধন করিয়া বলিতে লাগিলেন,-“অনৌ বাৰ গৌতম! অগ্নিঃ” অর্থাৎ হে গৌতম! এই যে দুলোক দর্শন করিতেছ, ইহা একটি প্রসিদ্ধ অগ্নি, এইরূপে দু. পর্জন্য(মেঘ), পৃথিবী, পুরুষ ও যোষিৎ, এই পাঁচটি পদার্থকে পাঁচটি আগ্ন বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন, এবং এতদ্বিষয়ক জ্ঞানকে ‘পঞ্চাগ্নি-বিদ্যা’ নামে অভিহিত করিয়াছেন। ইহার তাৎপর্য্য এই যে, যজ্ঞমাত্রই জলপ্রধান, যজ্ঞ সোম, ঘৃত প্রভৃতি যে সমস্ত পদার্থ আহুত হয়, তৎসমস্তই জলীয় ভাগে পূর্ণ। যাঁহারা সেই যজ্ঞানুষ্ঠানে নিরত থাকিয়া কাল-কবলে পতিত হন, তাঁহারা যজ্ঞ য় সেই জলীয় ভাগ সহকারে পুণ্যবলে চন্দ্রমণ্ডলে গমন করেন; সেখানে নিদ্দিষ্টকাল উপযুক্ত সুখভোগ করিয়া যখন প্রচ্যুত হন, তখন প্রথমে দ্যুলোকে পতিত হন, পরে

৫৮ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

সেই পরম পুরুষ হইতে প্রজাগণেরই অবস্থাবিশেষরূপ অগ্নি (সমুৎপন্ন হয়), সেই অগ্নিকে বিশেষিত করা হইতেছে—সূর্য্য যাহার (দ্যুলোকের) সমিধ, সমিধ অর্থ সমিধের ন্যায়; কেন না, সূর্য্য দ্বারাই দ্যুলোক সমিদ্ধ(প্রদীপ্ত) হইয়া থাকে। সেই দ্যুলোকরূপ অগ্নি হইতে সম্পন্ন সোম হইতে দ্বিতীয় অগ্নি পর্জন্য(মেঘ) সম্ভূত হইয়া থাকে। সেই পর্জন্য হইতে আবার পৃথিবীতে ওষধিসমূহ(ব্রীহি- যবাদি) সমুৎপন্ন হয়। পুরুষরূপ অগ্নিতে আহুত এবং দেহের উপা- দানস্বরূপ সেই ওষধি হইতে আবার পুরুষরূপ অগ্নি যোষিতে অর্থাৎ যোষারূপ অগ্নিতে—স্ত্রীতে রেতঃ সেক করিয়া থাকে। এই প্রকারে ক্রমে ক্রমে ব্রাহ্মণাদি প্রজাগণ পরম পুরুষ হইতে সমুৎপন্ন হইয়াছে ॥২৭॥৫॥

তস্মাদৃচঃ সাম যজূষ্যি দীক্ষা যজ্ঞাশ্চ সর্ব্বে দ্রুতবো দক্ষিণাশ্চ। সংবৎসরশ্চ যজমানশ্চ লোকাঃ সোমো যত্র পরতে যত্র সূর্য্যঃ ॥২৮॥৬৷৷

কিঞ্চ, তস্মাৎ(পুরুষাৎ) ঋচঃ(গায়ত্র্যাদি-চ্ছন্দোবিশিষ্টা মন্ত্রাঃ), সাম (স্তোমাদি গীতিযুক্তং), যজুংষি(অনিয়তাক্ষর-পাদযুক্তানি), দীক্ষাঃ(মৌঞ্জী-- ধারণাদি-নিয়মাঃ), সর্ব্বে যজ্ঞাঃ(অগ্নিহোত্রাদ্যাঃ), দ্রুতবঃ(সযুপাঃ) দক্ষিণাঃ চ (গো-সুবর্ণাদ্যাঃ), সংবৎসরঃ চ(দ্বাদশ মাসাঃ, ত্রয়োদশ মাসা বা), যজমানঃ(যজ্ঞ- কর্ত্তা), লোকাঃ(কর্মফলানি) যত্র(যেযু লোকেষু) সোমঃ(চন্দ্রঃ) পরতে (পুণাতি), যত্র চ সূর্য্যঃ তপতি(প্রকাশয়তি)।

খণ্ডঃ।] দ্বিতীয়ং মুণ্ডকম্। ৫৭

আরও, সেই পুরুষ হইতে ঋক্, সাম ও যজুঃ, এই ত্রিবিধ মন্ত্র, দীক্ষা, সমস্ত যজ্ঞ, সমস্ত ক্রতু, যজ্ঞীয় দক্ষিণাসমূহ, সংবৎসর কাল, যজমান(যজ্ঞকর্তা) সমস্ত কর্মফল- যেখানে চন্দ্র পবিত্রতা সম্পাদন করেন এবং যেখানে সূর্য্য তাপ দেন ॥ ২৮৷৬ ॥

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

কিঞ্চ, কৰ্ম্মসাধনানি ফলানি চ তস্মাদেবেত্যাহ-কথং? তস্মাৎ পুরুষাদূচো নিয়তাক্ষরপাদাবসানাঃ গায়ত্র্যাদিচ্ছন্দোবিশিষ্টা মন্ত্রাঃ; সাম পাঞ্চভক্তিকং সাপ্তভক্তিকঞ্চ স্তোমাদিগীতিবিশিষ্টম্; যজুংষি অনিয়তাক্ষরপাদাবসানানি বাক্যরূপাণি; এবং ত্রিবিধা মন্ত্রাঃ। দীক্ষা মৌঞ্জাদিলক্ষণাঃ কর্তৃনিয়মবিশেষাঃ। যজ্ঞাশ্চ সর্ব্বে অগ্নিহোত্রাদয়ঃ। দ্রুতবঃ সযূপাঃ। দক্ষিণশ্চ একগবাদ্যা অপরিমিত- সর্ব্বস্বান্তাঃ। সংবৎসরশ্চ কালঃ কৰ্মাঙ্গভূতঃ। যজমানশ্চ কর্তা, লোকান্তস্য কৰ্ম্মফলভূতাঃ, তে বিশেষ’ন্তে-সোমো যত্র যেষু লোকেষু পবতে পুনাতি লোকান্, যত্র চ যেষু সূর্য্যস্তপতি; তে চ দক্ষিণায়নোত্তরায়ণমার্গদ্বয়গম্যা বিদ্বদ- বিদ্বৎকর্তৃফলভূতাঃ ॥ ২৮ ॥ ৬ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

অপিচ, কৰ্ম্মসাধন এবং কৰ্ম্মফলসমূহও যে, তাহা হইতেই[হইয়া থাকে], ইহা বলিতেছেন-কি প্রকারে? সেই পুরুষ হইতে ঋক্- সমূহ, পরিমিত অক্ষরযুক্ত পাদে(শ্লোকের চারিভাগের এক ভাগের নাম পাদ, সেই পাদে) যাহার বিশ্রাম, সেই ‘গায়ত্রী’ প্রভৃতি ছন্দো- বিশিষ্ট মন্ত্র সকল; সামকে-(গেয় সামাংশবিশেষকে) ‘ভক্তি’ বলে; সেই পঞ্চবা সপ্তভক্তিযুক্ত স্তোমাদি গীতিবিশিষ্ট বেদভাগ; যজুঃসমূহ, অনিদ্দিষ্ট অক্ষরে যে সকলের পাদ সমাপ্তি, সেই বাক্যসমূহ; এই প্রকার ত্রিবিধ মন্ত্র। দীক্ষা-যজ্ঞকর্তার মৌঞ্জী(মুঞ্জাতৃণ-নির্মিত কাঞ্চীবিশেষ) ধারণ প্রভৃতি নিয়মবিশেষ। অগ্নিহোঁত্রাদি সমস্ত যজ্ঞও ক্রতুসমূহ-যাহাতে যুপের ব্যবহার আছে। দক্ষিণা-একটি মাত্র গোপ্রভৃতি হইতে সর্ব্বস্ব পর্যন্ত; সংবৎসর-কৰ্মাঙ্গভূতকাল; যজমান -কর্মকর্তা লোকসমূহ, যজমানের কর্মফলসমূহ; সেই লোকসমূহকে

৫৮ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

ও বিশেষিত করা হইতেছে—যে সমস্ত লোকে সোম(চন্দ্র) পবন করেন অর্থাৎ লোকসমূহকে পবিত্র করেন এবং যে সমস্ত লোকে সূর্য্য তাপ দেন; সেই লোকসমূহই দক্ষিণায়ন ও উত্তরায়ণমার্গ-গম্য এবং বিদ্বান্ ও অবিদ্বান্ কর্ত্তাদের কর্ম্মফলস্বরূপ ॥২৮॥৬৷৷

তস্মাচ্চ দেবা বহুধা সম্প্রসূতাঃ

সাধ্যা মনুষ্যাঃ পশবো বয়াংসি। প্রাণাপানো ব্রীহিবো তপশ্চ

শ্রদ্ধা সত্যং ব্রহ্মচর্য্যং বিধিশ্চ ॥২৯॥৭॥

অপিচ, তস্মাৎ চ(পুরুষাৎ)(এব) দেবাঃ(কর্মাঙ্গভূতাঃ) বহুধা(বহুপ্রকারেণ) সম্প্রসূতাঃ(সমুৎপন্নাঃ)।[তদ্যথা] সাধ্যাঃ(দেবতাবিশেষাঃ), মনুষ্যাঃ (কৰ্ম্মাধিকারিণঃ), পশবঃ(গ্রাম্যা আরণ্যাশ্চ), বয়াংসি(পক্ষিণঃ), প্রাণাপানৌ এতেষাং জীবনং), ব্রীহি-যবৌ(হোমাথৌ); তপঃ(কর্মাঙ্গং, স্বতন্ত্রং চ); শ্রদ্ধা(শাস্ত্রার্থে দৃঢ়প্রত্যয়ঃ, আস্তিক্যবুদ্ধিরিতি যাবৎ), সত্যং(অনৃতবর্জনং, যথার্থভাষণং, চ ব্রহ্মচর্য্যং(বীর্য্যধারণং), বিধি(কর্মানুষ্ঠানপদ্ধতিঃ) চ (অপি)॥

সেই পুরুষ হইতে দেবতাসমূহ অর্থাৎ কৰ্ম্মাঙ্গ সমূহ নানা প্রকারে প্রসূত হইয়াছে।[ যথা] সাধ্যগণ, মনুষ্যগণ, পশুসমূহ, পক্ষিসংঘ, প্রাণাপান, অর্থাৎ ঐ সকলের জীবন, ধান্য ও যব, তপস্যা, শ্রদ্ধা, সত্যব্যবহার, ব্রহ্মচর্য্য এবং বিধি বা কর্ম্মের অনুষ্ঠান পদ্ধতি ॥২৯॥৭ ॥

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

তস্মাচ্চ পুরুষাৎ কৰ্ম্মাঙ্গভূতা দেবা বহুধা বস্বাদিগণভেদেন সম্প্রসূতাঃ সম্যক্ প্রসূতাঃ-সাধ্যা দেববিশেষাঃ, মনুষ্যাঃ কর্ম্মাধিকৃতাঃ, পশবো গ্রাম্যারণ্যাঃ, বয়াংসি পক্ষিণঃ, জীবনঞ্চ মনুষ্যাদীনাং প্রাণাপানৌ; ব্রীহিযবৌ হবিরথৌ; তপশ্চ কৰ্ম্মাঙ্গং পুরুষসংস্কারলক্ষণং, স্বতন্ত্রঞ্চ, ফলসাধনম্; শ্রদ্ধা যৎপূর্ব্বকঃ সর্ব্বপুরযার্থসাধনপ্রয়োগশ্চিত্তপ্রসাদ আস্তিক্যবুদ্ধিঃ; তথা সত্যম্ অনৃতবর্জনং যথাভূতার্থবচনঞ্চ অপীড়াকরম্; ব্রহ্মচর্য্যং মৈথুনাসমাচারঃ; বিধিশ্চ ইতি- কর্তব্যতা ৷৷ ২৯ ৷৷ ৭ ৷৷

খণ্ডঃ।] দ্বিতীয়ং মুণ্ডকং। ৫৯

ভাষ্যানুবাদ।

সেই পুরুষ হইতে কর্মাঙ্গভূত দেবতাসমূহ বহু প্রকারে অর্থাৎ বসু প্রভৃতি বিশেষ বিশেষ গণভেদে সম্যরূপে প্রসূত হইয়াছে— সাধ্যগণ দেবতাবিশেষ, মনুষ্যগণ কর্মাধিকারসমূহ; গ্রাম্য ও আরণ্য, পশুসমূহ পক্ষিসমূহ এবং মনুষ্যাদির জীবন প্রাণ ও অপান, হবির নিমিত্ত ব্রীহি ও যব, তপঃ দ্বিবিধ—কর্ম্মাঙ্গ, যাহা দ্বারা পুরুষের সংস্কার বা পবিত্রতা জন্মে, আর স্বতন্ত্র, যাহা পৃথগভাবে ফলসাধন; শ্রদ্ধা— যাহা দ্বারা সর্ব্বপ্রকার পুরুষার্থ-সাধনে প্রবৃত্তি জন্মে, সেই চিত্তপ্রসাদ- কর আস্তিক্য বুদ্ধি। সেইরূপ, সত্য—সত্য অর্থ মিথ্যা পরিত্যাগ এবং পরের অপীড়াকর যথার্থ কথন; ব্রহ্মচর্য্য—মৈথুনবর্জ্জন, এবং বিধি—ইতিকর্তব্যতা, অর্থাৎ কর্ম্মপদ্ধতি ॥২৯॥৭॥

সপ্ত প্রাণাঃ প্রভবন্তি তস্মাৎ সপ্তার্চ্চিষঃ সমিধঃ সপ্ত হোমাঃ। সপ্তেমে লোকা যেষু চরন্তি প্রাণা গুহাশয়া নিহিতাঃ সপ্ত সপ্ত ॥৩০॥৮৷৷

কিঞ্চ, তস্মাৎ(পুরুষাৎ) সপ্ত প্রাণাঃ(শীর্ষণ্যানি চক্ষুরাদীনি ইন্দ্রিয়াণি), সপ্ত অর্চ্চিষঃ(দীপ্তয়ঃ স্বস্ববিষয়প্রকাশনানি). সপ্ত সমিধঃ(উত্তেজকাঃ রূপাদয়ো বিষয়াঃ), তথা সপ্ত হোমাঃ(স্বস্ববিষয়-বিষয়কজ্ঞানানি), ইমে (অনুভূয়মানাঃ) সপ্ত লোকাঃ(ইন্দ্রিয়স্থানানি), যেষু(লোকেষু) প্রাণাঃ (ইন্দ্রিয়াণি) চরন্তি(বিচরন্তি বর্তন্তে ইতি যাবৎ)[বিধাত্রা। নিহিতাঃ(প্রতি- দেহং স্থাপিতাঃ)[এতে] সপ্ত সপ্ত গুহাশয়ঃ(গুহায়াং দেহে স্থিতাঃ) তস্মাৎ ; পুরুষাৎ) প্রভবন্তি(জায়ন্তে ॥

মস্তকস্থ সপ্ত ইন্দ্রিয়, তাহাদের সপ্তপ্রকার দীপ্তি, সপ্ত প্রকার বিষয়, এবং সপ্তপ্রকার হোম(বিষয়ক জ্ঞান) সাতটি ইন্দ্রিয় স্থান,—যে সকল স্থানে ইন্দ্রিয়গণ সঞ্চরণ করে; বিধাতাকর্ত্তৃক[প্রতিদেহে] স্থাপিত শরীরস্ এই সাত সাতটি পদার্থ সেই পুরুষ হইতে প্রাদুর্ভূত হয় ॥ ৩০॥৮॥

মৃগকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

৬।

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

কিঞ্চ, সপ্ত শীর্ষণ্যাঃ প্রাণাঃ তস্মাদেব পুরুষাৎ প্রভবস্তি। তেষাঞ্চ সপ্ত অর্চিযো দীপ্তয়ঃ স্বস্ববিষয়াবদ্যোতনানি। তথা সপ্ত সমিধঃ সপ্ত বিষয়াঃ; বিষয়ৈহি সমিধ্যন্তে প্রাণাঃ! সপ্ত হোমাঃ তদ্বিষয়বিজ্ঞানানি, “যদস্য বিজ্ঞানং, তজ্জুহোতি” ইতি শ্রুত্যন্তরাৎ। কিঞ্চ, সপ্ত ইমে লোকা ইন্দ্রিয়স্থানানি, যেষু চরস্তি সঞ্চরন্তি প্রাণাঃ ইতি বিশেষণাৎ। প্রাণা যেষু চরন্তীতি প্রাণানাং বিশেষণমিদং প্রাণা- পানাদিনিবৃত্ত্যর্থম্। গুহায়াং শরীরে হৃদয়ে বা স্বাপকালে শেরত ইতি গুহা- শয়াঃ। নিহিতাঃ স্থাপিতা ধাত্রা সপ্ত সপ্ত প্রতিপ্রাণিভেদম্। যানিচ আত্ম- যাজিনাং বিদুষাং কৰ্ম্মাণি তৎসাধনানি কৰ্ম্মফলানি চ, অবিদুষাঞ্চ কর্মাণি তৎ- সাধনানি কৰ্ম্মফলানি চ, সর্ব্বঞ্চৈতৎ পরম্মাদেব পুরুষাৎ সর্বজ্ঞাৎ প্রসূতমিতি প্রকরণার্থঃ ॥ ৩০॥৮ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

আরও, সেই পুরুষ হইতেই সাতটি শীর্ষণ্য প্রাণ(মস্তকস্ত চক্ষুরাদি ইন্দ্রিয়) প্রাদুর্ভূত হয়। সেই ইন্দ্রিয় সমূহের সাত প্রকার অর্চ্চিঃ-দীপ্তি অর্থাৎ নিজ নিজ বিষয় প্রকাশন; সেইরূপ সপ্ত সমিধ অর্থাৎ সাত প্রকার বিষয়, কেননা-ইন্দ্রিয়গণ বিষয় সমূহ দ্বারাই উদ্দীপিত হইয়া থাকে। সপ্ত প্রকার হোম অর্থাৎ সেই সকল বিষয়-বিষয়ক জ্ঞান: যে হেতু শ্রুতি বলিয়াছেন যে, ‘ইহার যে, এই বিষয়-বিজ্ঞান, তাহাই হোম করা হয়।’ অপিচ, এই সাতপ্রকার লোক অর্থাৎ ইন্দ্রিয় স্থান--ইন্দ্রিয়গণ যে সকল স্থানে সঞ্চরণ করে; এই বিশেষণ থাকায়[‘লোক’ শব্দে ইন্দ্রিয় স্থান বুঝিতে হইবে]। ‘প্রাণসমূহ যে সকল স্থানে বিচরণ করে’ এই প্রাণ বিশেষণটি [প্রাণ শব্দের] প্রাণাপানাদি অর্থাশঙ্কা নিবৃত্ত্যর্থ[প্রদত্ত হইয়াছে]। গুহাতে-শরীরে কিংবা স্বপ্ন সময়ে হৃদয়ে অবস্থান করে, এই জন্য গুহাশয়, এই সাত সাতটি পদার্থ বিধাতা কর্তৃক প্রত্যেক প্রাণীতে নিহিত অর্থাৎ স্থাপিত হইয়াছে। আত্মযাজী জ্ঞানিগণের যে সমস্ত কৰ্ম্ম, কৰ্ম্ম-সাধন ও কৰ্ম্মফল, আর অজ্ঞানিগণেরও যে সমস্ত কৰ্ম্ম, কৰ্ম্ম-সাধন

পঃ।] দ্বিতীয়ং মুণ্ডকম্। ৬১

ও কৰ্ম্মফল, এ সমস্তই সেই সর্বজ্ঞ পরম পুরুষ হইতেই প্রসূত হইয়াছে, ইহাই এই প্রকরণের তাৎপর্য্য ॥ ৩০ ॥৮॥

অতঃ সমুদ্রা গিরয়শ্চ সর্ব্বে- হস্মাৎ স্যন্দন্তে সিন্ধবঃ সর্ব্বরূপাঃ। অতশ্চ সর্ব্বা ওষধয়ো রসশ্চ যেনৈষ ভূতৈস্তিষ্ঠতে হন্তরাত্মা ॥৩১॥৯৷৷

সর্ব্বে সমুদ্রাঃ গিরয়ঃ(পর্ব্বতাঃ) চ(অপি) অতঃ(অস্মাদেব পুরুষাৎ) [ জায়ন্তে]। সর্ব্বরূপাঃ(বহুরূপাঃ) সিন্ধবঃ(নদ্যঃ) চ অতঃ(পুরুষাৎ) স্যন্দন্তে(অবন্তি), সর্ব্বা: ওষধয়ঃ(ব্রীহিষবাদ্যাঃ) রসঃ চ(মধুরাদিকঃ) অতঃ (পুরুষাৎ)[জায়ন্তে], এষঃ অন্তরাত্মা(সূক্ষ্মং শরীরং) যেন(রসেন হেতুনা) ভূতৈঃ(আকাশাদিভিঃ)[বেষ্টিতঃ সন্] তিষ্ঠতে(তিষ্ঠতি বর্ত্ততে ইত্যর্থঃ) হি(নিশ্চয়ে)।

এই পুরুষ হইতেই সমস্ত সমুদ্র ও পৰ্ব্বত[সম্ভূত হয়]। নানাবিধ নদীসমূহও ইহা হইতেই প্রবাহিত হয়। সমস্ত ওষধি ও রস ইহা হইতেই[প্রাদুর্ভূত হয়], এই অন্তরাত্মা—সূক্ষ্ম শরীর যে রসে পঞ্চভূতে বেষ্টিত হইয়া অবস্থান করে ॥৩১॥৯॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

অতঃ পুরুষাৎ সমুদ্রাঃ সর্ব্বে ক্ষীরাদ্যাঃ; গিরয়শ্চ হিমবদাদয়ঃ অস্মাদেৰ পুরুষাৎ সর্ব্বে। স্যন্দন্তে স্রবন্তি গঙ্গাদ্যাঃ সিন্ধবো নদ্যঃ সর্ব্বরূপাঃ বহুরূপাঃ। অস্মাদেব পুরুষাৎ সর্ব্বা ওষধয়ো ব্রীহিযবাদ্যাঃ। রসশ্চ মধুরাদিঃ ষড়বিধঃ, যেন রসেন ভূতৈঃ পঞ্চভিঃ স্কুলৈঃ পরিবেষ্টিতস্তিষ্ঠতে তিষ্ঠতি হি অন্তরাত্মা লিঙ্গং সূক্ষ্মং শরীরম্। তদ্ধি অন্তরালে শরীরস্য আত্মনশ্চ আত্মবৎ বর্তত ইত্যন্তরাত্মা ॥৩১৷৷৯৷৷ ভাষ্যানুবাদ।

এই পুরুষ হইতে ক্ষারাদি(লবণাদি) সমস্ত সমুদ্র[উৎপন্ন হয়], এবং হিমালয় প্রভৃতি সমস্ত পর্বত এই পুরুষ হইতেই[উৎপন্ন হয়]; গঙ্গা প্রভৃতি সর্ব্বরূপ—বহুবিধ সিন্ধু—নদী সমূহ স্রবমান অর্থাৎ প্রবাহিত হয়। এই পুরুষ হইতেই ব্রীহি-যবাদি সমস্ত ওষধি

৬২ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

এবং মধুরাদি ষড়বিধ রস, যে রসের বলে স্থূল পঞ্চভূতে বেষ্টিত হইয়া অন্তরাত্মা—লিঙ্গ বা সূক্ষ্ম শরীর অবস্থিতি করে। যে হেতু শরীর ও আত্মার মধ্যবর্ত্তি ভাবে সূক্ষ্ম শরীর অবস্থান করে; এই জন্য তাহাকে অন্তরাত্মা বলা হইয়া থাকে ॥ ৩১ ॥ ৯ ॥

পুরুষ এবেদং বিশ্বং কৰ্ম্ম তপো ব্রহ্ম পরামৃতম্। এতদ্ যো বেদ নিহিতং গুহায়াং সোহবিদ্যাগ্রন্থিং বিকিরতীহ সোম্য ॥৩২॥১০॥

ইত্যর্থবেদীয়-মুণ্ডকোপনিষদি দ্বিতীয়মুণ্ডকে প্রথমঃ খণ্ডঃ ॥১॥

[প্রকৃতমুপসংহরন্ আহ]—পুরুষ ইত্যাদি। পুরুষঃ(উক্তলক্ষণঃ) এব(অব- ধারণে) ইদং বিশ্বং(সর্ব্বং, ন পুরুষাদতিরিক্তং কিঞ্চন অস্তীতি ভাবঃ)।[তদেব বিশ্বং দর্শয়ন্ আহ] কৰ্ম্ম(অগ্নিহোত্রাদি), তপঃ(জ্ঞানং)[তপঃকার্য্যঞ্চ এতৎ সর্ব্বং, অতঃ] গুহায়াং(হৃদয়ে) নিহিতং(স্থিতং) পরামৃতং(পরম্ অমৃতং চ) ব্রহ্ম(ব্রহ্মৈব) এতৎ(সর্ব্বং)[ইতি] যঃ(পুরুষঃ) বেদ(জানাতি); হে সোম্য—প্রিয়দর্শন, সঃ অবিদ্যা-গ্রন্থিং(অবিদ্যা বন্ধং) বিকিরতি(বিকিপতি বিনাশয়তীত্যর্থঃ)।

পূর্ব্বোক্ত সত্য পুরুষই এই সমস্ত জগৎ, কৰ্ম্ম ও জ্ঞান এই সর্ব্বোত্তম অমৃত ব্রহ্মেরই স্বরূপ। হে সৌম্য! গুহানিহিত ইহাকে যে লোক জানে, সে লোক অবিদ্যার গ্রন্থি ছিন্ন করে ॥ ৩২৷১০৷৷

দ্বিতীয় মুণ্ডকে প্রথম খণ্ড সমাপ্ত ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

এবং পুরুষাৎ সর্ব্বমিদং সম্প্রসূতম্, অতো বাচারম্ভণং বিকারো নামধেয়- মনৃতং, পুরুষ ইত্যেব সত্যম্; অতঃ পুরুষ এব ইদং বিশ্বং সর্ব্বম। ন বিশ্বং নাম পুরুষাদন্যৎ কিঞ্চিদস্তি। অতো যহুক্তং তদেতদভিহিতং “কস্মিন্ন ভগবো বিজ্ঞাতে সর্ব্বমিদং বিজ্ঞাতং ভবতি”ইতি। এতস্মিন্ হি পরস্মিন্ আত্মনি

খণ্ডঃ।] দ্বিতীয়ং মুণ্ডকম্। ৬৩

সর্ব্বকারণে পুরুষে বিজ্ঞাতে, পুরুষ এবেদং বিশ্বং নান্যদস্তীতি বিজ্ঞাতং ভবতীতি। কিং পুনরিদং বিশ্বম? ইত্যুচ্যতে--কৰ্ম্ম অগ্নিহোত্রাদিলক্ষণম্। তপো জ্ঞানং, তৎকৃতং ফলমন্যদেব তাবদ্ধীদং সর্ব্বম্; তচ্চৈতদ্বহ্মণঃ কার্য্যং, তস্মাৎ সর্ব্বং ব্রহ্ম পরামৃত্তং পরমমৃতমহমেবেতি যো বেদ নিহিতং স্থিতং গুহায়াং হৃদি সর্ব্বপ্রাণিনাং, স এবং বিজ্ঞানাদবিদ্যাগ্রন্থিং গ্রন্থিমিব দৃঢ়ীভূতামবিদ্যাবাসনাং বিকিরতি বিক্ষিপতি বিনাশয়তি, ইহ জীবন্নেব ন মৃতঃ সন্, হে সোম্য প্রিয়দর্শন ॥ ৩২॥ ১০ ॥ ইতি পরমহংস-পরিব্রাজকাচার্য্য-শ্রীমচ্ছঙ্কর-ভগবতঃ কৃতৌ মুণ্ডকোপ- নিষদ্ভাষ্যে দ্বিতীয়মুণ্ডকে প্রথমঃ খণ্ডঃ। ভাষ্যানুবাদ। এইরূপে পুরুষ হইতেই সমস্ত প্রসূত হইয়াছে। অতএবই বাক্যা- রব্ধ নামাত্মক বিকার বস্তু মিথ্যা, পুরুষই একমাত্র সত্য; অতএব পুরুষই এই বিশ্ব বা সর্বাত্মক। অর্থাৎ পুরুষ হইতে পৃথক্ বিশ্ব নামে কিছু নাই। অতএব, ‘ভগবন্, কোন বস্তুটি জানিলে এই সমস্ত বিজ্ঞাত হয়,’ এই যে প্রশ্ন উক্ত হইয়াছিল, তাহাই এখানে কথিত হইল। কেননা, সর্ব-কারণ, পরমাত্মস্বরূপ এই পুরুষ বিজ্ঞাত হইলেই ‘একমাত্র পুরুষই এই সমস্ত, তদতিরিক্ত আর কিছুই নাই, এই ভাব বিজ্ঞাত হইয়া থাকে। এই বিশ্বটিই বা কি প্রকার, তাহা কথিত হইতেছে-কৰ্ম্ম অগ্নিহোত্র প্রভৃতি, তপঃ-জ্ঞান, জ্ঞানজনিত ফল কৰ্ম্মফল হইতে পৃথক্ই বটে; সে সমস্তই এই বিশ্বপদবাচ্য। সেই এই বিশ্বও ব্রহ্মেরই কার্য্য; সুতরাং পরামৃত অর্থাৎ পর ও অমৃতস্বরূপ, ব্রহ্মই এ সমস্ত, এবং আমিই সেই ব্রহ্মস্বরূপ, যে লোক সর্ব প্রাণীর গুহায়- হৃদয়ে নিহিত অবস্থিত এইরূপে ব্রহ্মকে জানে, হে সৌম্য- প্রিয়দর্শন, সেই লোক এবংপ্রকার জ্ঞানের ফলে অবিদ্যা-গ্রন্থিকে অর্থাৎ গ্রন্থির ন্যায় দৃঢ়ীভূত অধর্মসংস্কারকে দূরীভূত করে, তাহাও মৃত্যুর পর নহে-জীবদবস্থায়ই বিনষ্ট করিয়া দেয় ॥৩২৷১০৷৷ ইতি অথর্ববেদীয়-মুণ্ডকোপনিষদ্ভাষ্যানুবাদে দ্বিতীয় মুণ্ডকে প্রথম খণ্ড সমাপ্ত।

দ্বিতীয়ঃ খণ্ডঃ।

శ్రీరామ జయము

আবিঃ সন্নিহিতং গুহাচরং নাম মহৎপদমত্রৈতৎ সমর্পিতম্।

এজং প্রাণনিমিষচ্চ যদেতজ্জানথ সদসদ্বরেণ্যং পরং বিজ্ঞানাদ্ যদ্বরিষ্ঠং প্রজানাম্ ॥৩৩॥১॥

আবিঃ(প্রকাশময়ং) সন্নিহিতং(সর্ব্বপ্রাণিহৃদয়ে স্থিতং), গুহাচরং (গুহাশয়ং) নাম(প্রসিদ্ধৌ) মহৎ(নিরতিশয়ং) পদং(সর্ব্বেষাম্ আশ্রয়ণীয়ং বস্তু)। অত্র(অস্মিন্ ব্রহ্মণি এজৎ(চলনস্বভাবং পক্ষিপ্রভৃতি) প্রাণৎ(প্রাণাদিমৎ মনুষ্যাদি),[কিং বহুনা-] যৎ নিমিষৎ(নিমেষং কুর্ব্বৎ) চকারাৎ(অনি- মিষৎ-নিমেষরহিতং) চ, এতৎ(সর্ব্বং) অত্র এব সমর্পিতং(সম্যক্ স্থাপিতং)। [হে শিষ্যাঃ,] এতৎ(সর্ব্বাস্পদভূতং ব্রহ্ম) সদসৎ(সং-মূর্তস্বরূপং, অসৎ- অমূর্তস্বরূপং চ) বরেণ্যং(বরণীয়ং সর্ব্বস্য প্রার্থনীয়মিত্যর্থঃ), প্রজানাং(জনানাং) বিজ্ঞানাৎ(বিষয়জ্ঞানাৎ) পরম্(অতিরিক্তং, লৌকিক-জ্ঞানাগোচরমিত্যর্থঃ), যৎ বরিষ্ঠং(অতিশয়েন শ্রেষ্ঠমিত্যর্থঃ) জানথ(তৎ অবগচ্ছত)[যূয়ম্ ইতি শেষঃ]॥

প্রকাশময়, সর্ব্বত্র সন্নিহিত, এবং গুহাচররূপে প্রসিদ্ধ যে মহৎ পদ(প্রার্থনীয় বস্তু); চলনশীল পক্ষ্যাদি, প্রাণধারণশীল মনুষ্যাদি,[অধিক কি,] নিমেষবান্ ও নিমেষরহিত এ সমস্তই ইহাতে সমর্পিত রহিয়াছে।[হে শিষ্যগণ, তোমরা] জানিও এই ব্রহ্মই সৎ ও অসৎস্বরূপ, সকলের বরণীয়, জনসমূহের জ্ঞানের অতীত এবং যাহা শ্রেষ্ঠরূপ ॥ ৩৩ ॥ ১ ॥

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

অরূপং সৎ অক্ষরং কেন প্রকারেণ বিজ্ঞেয়মিত্যুচ্যতে-আবিঃ প্রকাশং সন্নিহিতং বাগাদ্যপাধিভিঃ জ্বলতি ভ্রাজতীতি শ্রুত্যন্তরাৎ শব্দাদীন্ উপলব্ধমানবদবভাসতে; দর্শন-শ্রবণমননাবিজ্ঞানাদ্যপাধিধর্ম্মৈরাবির্ভূতং সল্লক্ষ্যতে হৃদি সর্ব্বপ্রাণিনাম্।

খণ্ডঃ।] দ্বিতীয়মুণ্ডকম্। ৬৫

যদেতদাবির্ভূতং ব্রহ্ম সন্নিহিতং সম্যক্ স্থিতং হৃদি তদ্‌গুহাচরং নাম, গুহায়াং চরতীতি দর্শনশ্রবণাদিপ্রকারৈঃ গুহাচরমিতি প্রখ্যাতম্। মহৎ সর্ব্বমহত্ত্বাৎ, পদং পদ্যতে সর্ব্বেণেতি সর্ব্বপদার্থাস্পদত্বাৎ।

কথং তন্মহৎপদমিতি? উচ্যতে-যতঃ অত্র অস্মিন্ ব্রহ্মণি এতৎ সর্ব্বং সম- র্পিতং প্রবেশিতং রথনাভাবিব অরাঃ-এজচ্চলৎ পক্ষ্যাদি, প্রাণৎ প্রাণিতীতি প্রাণাপানাদিমন্মুষ্যপশ্বাদি, নিমিষচ্চ যন্নিমিষাদিক্রিয়াবৎ যচ্চানিমিষৎ ‘চ’শব্দাৎ, সমস্তমেতদত্রৈব ব্রহ্মণি সমর্পিতম্। এতদ্ যদাস্পদং সর্ব্বং, জানথ হে শিষ্যা অবগচ্ছথ তদাত্মভূতং ভবতাং; সদসংস্বরূপম্, সদসতোমূর্ত্তয়োঃ স্কুলসূক্ষ্ময়োঃ তদ্ব্যতিরেকেণাভাবাৎ। বরেণ্যং বরণীয়ং, তদেব হি সর্ব্বস্য নিত্যত্বাৎ প্রার্থনীয়ং; পরং ব্যতিরিক্তং বিজ্ঞানাৎ প্রজানামিতি ব্যবহিতেন সম্বন্ধঃ; যল্লৌকিকবিজ্ঞানা- গোচরমিত্যর্থঃ। যদ্‌ বরিষ্ঠং বরতমং, সর্ব্বপদার্থেষু বরেষু; তদ্ধি একং ব্রহ্ম অতিশয়েন বরং সর্ব্বদোষরহিতত্বাৎ ॥ ৩৩ ॥ ১ ॥

ভাষ্যানুঘাদ।

অক্ষর পুরুষ যখন নীরূপ, তখন তাঁহাকে কি প্রকারে জানিতে হইবে? ইহা বলা হইতেছে-আবিঃ-প্রকাশস্বরূপ, সন্নিহিত অর্থাৎ শ্রুত্যন্তরে আছে-বাক্প্রভৃতি ইন্দ্রিয়রূপ উপাধি দ্বারা উজ্জ্বল হন এবং দীপ্তিমান্ হন; তদনুসারে[আত্মা] শব্দাদি বিষয়সমূহ উপলব্ধি করেন বলিয়াই যেন প্রতীতি হয়; অতএব দর্শন, শ্রবণ, মনন ও বিজ্ঞানাদি উপাধিগত ধৰ্ম্মসমূহ দ্বারা সমস্ত প্রাণিহৃদয়ে আবির্ভূত হইয়া লক্ষিত হন। এই যে প্রকাশস্বভাবও সন্নিহিত অর্থাৎ সর্ব্ব প্রাণিহৃদয়ে সম্যক্ অবস্থিত ব্রহ্ম; তাহাই আবার গুহাচর নামে অর্থাৎ গুহাতে সঞ্চরণ করে, এই জন্য দর্শন শ্রবণাদি ধর্ম্ম দ্বারা ‘গুহাচর’ নামে প্রসিদ্ধ। সর্বাপেক্ষা মহত্ত্বহেতু মহৎ, এবং সকলেই ইহাকে প্রাপ্ত হয়, এই জন্য সমস্ত পদার্থের আশ্রয়ত্বহেতু পদ শব্দবাচ্য।

ভাল, তিনি মহৎ পদ কি প্রকারে?[উত্তর] বলা হইতেছে,— যেহেতু, রথনাভিতে যেমন অর সমুদয়(শলাকাসমূহ) সমর্পিত থাকে, তেমনি এই ব্রহ্মে এই সমস্ত(জগৎ) সমর্পিত রহিয়াছে—‘এজৎ’

৬৬ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

চলনশীল পক্ষি-প্রভৃতি প্রাণৎ যাহারা প্রাণ ধারণ করে—মনুষ্য-পশু প্রভৃতি, নিমিষৎ যাহারা নিমেষকার্য্যকারী এবং ‘চ’ শব্দ হইতে অনিমিষৎও(নিমেষরহিতও) বুঝিতে হইবে। এই সমস্ত ব্রহ্মেই সমর্পিত আছে। এ সমস্ত যাহাতে আশ্রিত, হে শিষ্যগণ, জানিও— তিনিই তোমাদের আত্মা এবং সদসৎস্বরূপ; কেন না, সৎ ও অসৎ অর্থাৎ স্থূল ও সূক্ষ্ম, মূর্ত্ত ও অমূর্ত্ত কোন পদার্থেরই তদতিরিক্ত সত্তা নাই। বরেণ্য—বরণীয়; কারণ, নিত্যত্বনিবন্ধন তিনিই সকলের প্রার্থনীয়। পর অর্থে—ব্যতিরিক্ত, ‘প্রজাগণের বিজ্ঞান হইতে’ এই ব্যবহিত বাক্যের সহিত এই ‘পর’ শব্দের সম্বন্ধ; ইহার অর্থ এই যে, যিনি লৌকিক বা ব্যবহারিক জ্ঞানের অবিষয়; যিনি বরিষ্ঠ—শ্রেষ্ঠতম, সমস্ত শ্রেষ্ঠ পদার্থের মধ্যে এক ব্রহ্মই সর্বাপেক্ষা অতিশয় শ্রেষ্ঠ; কারণ, তিনি সর্বদোষ-বিবর্জ্জিত ॥৩৩॥১॥

যদর্চ্চিমদ্ যদণুভ্যোহণু চ যস্মিল্লোকা নিহিতা লোকিনশ্চ। তদেতদক্ষরং ব্রহ্ম, স প্রাণস্তদু বাঙ্মনঃ। তদেতৎ সত্যং তদমৃতং তদ্বেদ্ধব্যং সোম্য বিদ্ধি ॥৩৪॥২

যৎ অচ্চিমৎ(দীপ্তিমৎ) যৎ অণুভ্যঃ চ(অপি) অণু(সূক্ষ্মং), যস্মিন্ লোকাঃ(ভূরাদয়ঃ) লোকিনঃ(তল্লোকবাসিনঃ) চ(অপি) নিহিতাঃ(আশ্রিতাঃ) তৎ এতদ্(উক্তলক্ষণং) অক্ষরং(অক্ষরনামকং) ব্রহ্ম; সঃ প্রাণঃ; তৎ উ(অপি) বাঙ্মনঃ(বাক্ চ মনঃ চ সর্ব্বকরণাত্মক ইতিভাবঃ)। তৎ এতৎ(উক্তলক্ষণং ব্রহ্ম) সত্যং(যথার্থভূতং); তৎ অমৃতং(অবিনশ্বরং), তৎ(ব্রহ্ম) বেদ্ধব্যং (মনসা গ্রহণীয়ং) বিদ্ধি(জানীহি) হে সোম্য;(প্রিয়দর্শন,) ॥

যাহা দপ্তিমান্ এবং অণু হইতেও অণু(সুক্ষ্ম); যাহাতে ভূরাদি লোক সমূহ ও তল্লোকবাসিগণ(অবস্থিত); তিনিই এই অপর ব্রহ্ম, তিনিই প্রাণ, তিনিই বাক্ ও মনঃস্বরূপ; তিনিই সত্যস্বরূপ; তিনিই অমৃতস্বরূপ; হে সৌম্য তাঁহাকেই যেদ্ধব্য বলিয়া জানিবে। ৩৪॥২॥]

খণ্ডঃ।] দ্বিতীয় সূক্তম্। ৬৭

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

কিঞ্চ, যদর্চ্চিমদ্দীপ্তিমৎ; তদ্দীপ্ত্যা হি আদিত্যাদি দীপ্যত ইতি দীপ্তিমৎ ব্রহ্ম। কিঞ্চ, যদ্‌ অণুভ্যঃ শ্যামাকাদিভ্যোহপি অণু চ সূক্ষ্মম্। ‘চ’শব্দাৎ স্কুলেভ্যোহপি অতিশয়েন স্থূলং পৃথিব্যাদিভ্যঃ। যস্মিন্ লোকা ভূরাদয়ো নিহিতাঃ স্থিতাঃ, যে চ লোকিনো লোকনিবাসিনো মনুষ্যাদয়ঃ, চৈতন্যাশ্রয়া হি সর্ব্বে প্রসিদ্ধাঃ; তদেতৎ সর্ব্বাশ্রয়ম্ অক্ষরং ব্রহ্মঃ, স প্রাণঃ তদু বাঙ্মনো বাক্চ মনশ্চ সর্ব্বাণি চ করণানি তদু অন্তশ্চৈতন্যম্; চৈতন্যাশ্রয়ো হি প্রাণেন্দ্রিয়াদিসর্ব্বসঙ্ঘাতঃ, “প্রাণস্য প্রাণম্” ইতি শ্রুত্যন্তরাৎ। যৎ প্রাণাদীনামস্তশ্চৈতনমক্ষরং, তদেতৎ সত্যম্ অবিতথং; অতঃ অমৃতম্ অবিনাশি, তৎ বেদ্ধব্যং মনসা তাড়য়িতব্যম্; তস্মিন্ মনসঃ সমাধানং কর্তব্যমিত্যর্থঃ। যম্মাদেৰং হে সোম্য, বিদ্ধি অক্ষরে চেতঃ সমাধৎস্ব ॥ ৩৪ ॥ ২॥

ভাষ্যনুবাদ।

আরও, যিনি অর্চ্চিমৎ-দীপ্তিসম্পন্ন; দীপ্তিমান্ আদিত্য প্রভৃতিও তাঁহারই দীপ্তিতে দীপ্তিলাভ করেন, এই কারণে ব্রহ্মই প্রকৃত দীপ্তিমান্। আরও এক কথা, শ্যামাকাদি অণু অপেক্ষাও অণু-সূক্ষ্ম,[শ্যামাক একপ্রকার ক্ষুদ্র শস্য]। ‘চ’. শব্দ হইতে বুঝিতে হইবে যে, স্কুল পৃথিব্যাদি অপেক্ষাও অতিশয় স্থূল। ভূরাদি লোকসমূহ এবং যাহারা সেই লোকবাসী মনুষ্যাদি,(তাহারাও) যাহাতে নিহিত-অবস্থিত। কারণ, সকলেই চৈতন্যে আশ্রিত বলিয়া লোকে প্রসিদ্ধ আছে, ইহাই সেই সর্বাশ্রয় অক্ষর ব্রহ্ম; তিনিই প্রাণ এবং তিনিই বাক্ ও মন এবং সমস্ত করণস্বরূপ; প্রাণ ও ইন্দ্রিয়াদি-সমষ্টি সমস্তই চৈতন্যে আশ্রিত; সুতরাং চৈতন্যস্থ ইহা “[তিনি] প্রাণেরও প্রাণ” এই অপর শ্রুতি হইতে[জানা যায়]। প্রাণাদির অন্তঃস্থ যে অক্ষর চৈতন্য, তিনিই এই সত্য অর্থাৎ যথার্থস্বরূপ; অতএব অমৃত-বিনাশরহিত। তাহাকে বিদ্ধ অর্থাৎ মনের দ্বারা তাড়িত করিতে হইবে, অর্থাৎ তাহাতে মনকে সমাহিত করিতে হইবে। হে সৌম্য, যেহেতু এই প্রকার; অতএব তুমি সেই অক্ষরে চিত্ত সমাহিত কর ॥৩৪॥ ২॥

৬৮ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

ধনুর্গৃহীত্বোপনিষদং মহাস্ত্রং শরং হ্যপাসা-নিশিতং সংদধীত। আযম্য তদ্ভাবগতেন চেতসা

লক্ষ্যং তদেবাক্ষরং সোম্য বিদ্ধি ॥৩৫॥৩॥

ঔপনিষদং(উপনিষৎসু এব জ্ঞাতং) মহাস্ত্রং(মহৎ অস্ত্রং) ধনুঃ গৃহীত্বা(সমাদায়)[তস্মিন্] উপাসা-নিশিতং(অবিচ্ছেদধ্যানেন সূক্ষ্মীকৃতং) শরং সংদধীত(সন্ধানং কুৰ্য্যাৎ)। হে সোম্য, আযম্য(ধনুরাক্বষ্য—সান্তঃকর- ণানি ইন্দ্রিয়াণি স্বস্ব-বিষয়েভ্যঃ বিনিবর্ত্ত্য) তদ্ভাবগতেন(তস্মিন্ ব্রহ্মণি ভাবঃ তন্ময়তা, তদগতেন) চেতসা(মনসা) লক্ষ্যং(বেদ্ধব্যং) তৎ এব অক্ষরং (পুরুষং) বিদ্ধি(অবগচ্ছ) ॥

হে প্রিয়দর্শন, উপনিষদ্বেদ্য মহাস্ত্র ধনুঃ গ্রহণ করিয়া তাহাতে উপাসনা- শোধিত শর সংযোজিত কর; শর সন্ধান করিয়া অর্থাৎ বিষয় হইতে ইন্দ্রিয় ও অন্তঃকরণ প্রত্যাহৃত করিয়া ব্রহ্মে তন্ময়তাপ্রাপ্ত চিত্ত দ্বারা সেই লক্ষ্য অক্ষর পুরুষকে বেদ্ধব্য বলিয়া জানিও!! ৩৫৷৷৩৷৷

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

কথং বেদ্ধব্যমিতি, উচ্যতে-ধনুঃ ইষাসনং গৃহীত্বা আদায় ঔপনিষদম্ উপ- নিযৎসু ভবং প্রসিদ্ধং মহাস্ত্রং মহচ্চ তদস্ত্রঞ্চ মহাস্ত্রং ধনুঃ, তস্মিন্ শরম্; কিংবিশিষ্ট- মিত্যাহ-উপাসানিশিতং সন্ততাভিধ্যানেন তনূকৃতং, সংস্কৃতমিত্যেতৎ; সন্দধীত সন্ধানং কুৰ্য্যাৎ। সন্ধায় চ আযম্য আকৃষ্য সেন্দ্রিয়মন্তঃকরণং স্ববিষয়াদবিনিবর্ত্য লক্ষ্য এবাবর্জিতং কৃত্বেত্যর্থঃ। নহি হস্তেনের ধনুষ আযমনমিহ সম্ভবতি। তদ্ভাবগতেন তস্মিন্ ব্রহ্মণ্যক্ষরে লক্ষ্যে ভাবনা ভাবঃ, তদগতেন চেতসা লক্ষ্যং তদেব যথোক্তলক্ষণম্ অক্ষরং সোম্য, বিদ্ধি ॥ ৩৫ ॥৩॥

ভাষ্যানুবাদ।

কি প্রকারে বিদ্ধ করিতে হইবে, তাহা কথিত হইতেছে, ঔপনিষদ- উপনিষৎপ্রভব অর্থাৎ উপনিষৎপ্রসিদ্ধ মহৎ অস্ত্রস্বরূপ ধনু—যাহা দ্বারা বাণ নিক্ষিপ্ত হয়, সেই ধনুতে উপাসা-নিশিত অর্থাৎ অনবরত সম্যক্ ধ্যান দ্বারা তনূকৃত(সুক্ষ্মতাপ্রাপিত)—সংস্কারসমন্বিত শরের সন্ধান

খণ্ডঃ।] দ্বিতীয়মুণ্ডকম্। ৬৯

করিবে(শর-যোজনা করিবে), সন্ধানের পর আযমন করিয়া—আক- র্ষণ করিয়া—অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের সহিত অন্তঃকরণকে নিজ নিজ বিষয় হইতে নিবারিত করিয়া—অর্থাৎ একমাত্র লক্ষ্য বিষয়েই একাগ্রতা সম্পন্ন করিয়া; কারণ হস্ত দ্বারা যেমন ধনুর আকর্ষণ হয়, তেমন আকর্ষণ ত এখানে সম্ভব হয় না, কাজেই ঐরূপ অর্থ করিতে হইল। তদ্ভাবগত অর্থাৎ সেই যে লক্ষ্যস্বরূপ অক্ষর ব্রহ্ম, তদ্বিষয়ে ভাবনা— ভাবপ্রাপ্ত(অনুরাগসম্পন্ন) চিত্ত দ্বারা হে সোম্য, সেই লক্ষ্যস্বরূপ উক্ত- রূপ অক্ষর ব্রহ্মকে বেদ্ধব্য জানিবে ॥৩৫॥৩৷৷

প্রণবো ধনুঃ শরো হ্যাত্মা ব্রহ্ম তলক্ষ্যমুচ্যতে।

অপ্রমত্তেন বেদ্ধব্যং শরবত্তন্ময়ো ভবেৎ ॥৩৬॥৪॥

[ ইদানীং প্রাগুক্তং ধনুরাদিকমেব স্বরূপতো নিৰ্দ্দিশতি প্রণব ইত্যাদিনা]। প্রণবঃ(ওঙ্কারঃ) ধনুঃ(শরাধিষ্ঠানং), আত্মা(চিদাভাসঃ) হি(নিশ্চয়ে) শরঃ (বাণঃ), তৎ(প্রসিদ্ধং) ব্রহ্ম লক্ষ্যং(বেধ্যং), যদ্বা, তস্য(শরস্য) লক্ষ্যং— (তল্লক্ষ্যং ইত্যেকং পদং); উচ্যতে(কথ্যতে)।[তৎ চ] অপ্রমত্তেন(প্রমাদ- রহিতেন সতা) বেদ্ধব্যম্(অনুভবনীয়ং);[অতএব সাধকঃ] শরবৎ(শরইব) তন্ময়ঃ(তদেকাগ্রঃ) ভবেৎ(স্যাদিত্যর্থঃ) ॥

এখন পূর্ব্বোক্ত ধনুঃশরাদি শব্দার্থ স্পষ্ট করিয়া বলিতেছেন—প্রণব ধনু, স্বয়ং চিদাভাস আত্মা তাহার শর; আর পরব্রহ্ম তাহার লক্ষ্য(বেধ্য) বলিয়া কথিত হন; প্রমাদহীন বা মনোযোগী হইয়া সেই লক্ষ্য বেধ করিতে হইবে; এবং তজ্জন্য শরের ন্যায় তন্ময়(লক্ষ্য বিষয়ে একাগ্র) হইতে হইবে ॥ ৩৬ ॥ ৪ ॥]

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

যদুক্তং ধনুরাদি, তদুচ্যতে—প্রণব ওঙ্কারো ধনুঃ। যথা ইষাসনং লক্ষ্যে শরস্য প্রবেশকারণং, তথা আত্মশরস্যাক্ষরে লক্ষ্যে প্রবেশকারণমোস্কারঃ; প্রণবেন হত্যস্যমানেন সংস্ক্রিয়মাণস্তদালম্বনোহপ্রতিবন্ধেনাক্ষরেহবতিষ্ঠতে; যথা ধনুষা অস্ত ইষুলক্ষ্যে। অতঃ প্রণবো ধনুরিব ধনুঃ। শরো হ্যাত্মা উপাধিলক্ষণঃ পরএব জলে সূর্য্যাদিবৎ প্রবিষ্টো দেহে সর্ব্ববৌদ্ধপ্রত্যয়-সাক্ষিতয়া; স শর ইব স্বাত্মন্যেব অর্পিতোহক্ষরে ব্রহ্মণি; অতঃ ব্রহ্ম তৎ লক্ষ্যমুচ্যতে, লক্ষ্য ইব মনঃ সমাধিৎ-

৭০ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

সুতিঃ আত্মভাবেন লক্ষ্যমাণত্বাৎ। তত্রৈবং সতি অপ্রমত্তেন বাহ্যবিষয়োপলব্ধি- তৃষ্ণা-প্রমাদবর্জিতেন সর্ব্বতো বিরক্তেন জিতেন্দ্রিয়েণ একাগ্রচিত্তেন বেদ্ধব্যং ব্রহ্ম লক্ষ্যম্। ততস্তদ্বেধনাৎ উর্দ্ধং শরবৎ তন্ময়ো ভবেৎ। যথা শরস্য লক্ষ্যৈকাত্মত্বং ফলং ভবতি; তথা দেহাদ্যনাত্ম প্রত্যয়তিরস্করণেন অক্ষরৈকাত্মত্বং ফলমাপাদয়ে- দিত্যর্থঃ ॥ ৩৬ ॥ ৪ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

ধনুঃ প্রভৃতি বলিয়া যাহা উক্ত হইয়াছে, তাহাই নিৰ্দেশ করিতে- ছেন-প্রণব-ওঙ্কার ধনুঃস্বরূপ। ইম্বাসন(যাহা দ্বারা ইষু-বাণ নিক্ষিপ্ত হয়), যেমন শরের লক্ষ্য প্রবেশের কারণ হয়, তেমনি ওঙ্কারই অক্ষর রূপ লক্ষ্যে আত্মারূপী শরের প্রবেশ কারণ; কেন না, প্রণবকে অবলম্বন করিয়া পুনঃ পুনঃ প্রণব ধ্যান করিতে করিতে আত্মার সংস্কার বা দোষাপনয়ন হয়, তখন ধনুঃ দ্বারা নিক্ষিপ্ত শর যেরূপ লক্ষ্যে অবস্থান করে, তদ্রূপ[আত্মারূপ শরও] বিনা বাধায় অক্ষরে অবস্থিত হয়। অতএব প্রণবই ধনু অর্থাৎ ধনুঃসদৃশ। আত্মা শর স্বরূপ; জলে যেরূপ সূর্য্য-প্রতিবিম্ব পতিত হয়, তদ্রূপ বুদ্ধিরূপ উপাধি-প্রতিবিম্বিত এবং সমস্ত বুদ্ধি-বৃত্তির সাক্ষিরূপে দেহে প্রবিষ্ট পরমাত্মাই এখানে ‘আত্মা’ পদবাচ্য। সেই আত্মা শরের ন্যায় নিজেই আত্মস্বরূপ অক্ষর ব্রহ্মে সমর্পিত হয়; এই জন্যই ব্রহ্মকে তাহার লক্ষ্য বলা হইয়া থাকে, কারণ লক্ষ্যের ন্যায় তাহাতেও যাঁহারা মনঃ সমাধান করেন, তাঁহারা তাঁহাকে আত্মারূপেই উপলব্ধি করিয়া থাকেন। এইরূপ যখন স্থির হইল, তখন অপ্রমত্তভাবে-বাহ্যবিষয়ের উপলব্ধি বিষয়ে তৃষ্ণাবজ্জিত ভাবে অর্থাৎ জিতেন্দ্রিয়-একাগ্রচিত্ত হইয়া ব্রহ্ম লক্ষ্যকে বেধ করিতে হইবে। এই কারণেই লক্ষ্য-বেধের পূর্ব্বে শরের ন্যায় তন্ময় হইবে; অভিপ্রায় এই যে, লক্ষ্যের সহিত একাত্মভাব প্রাপ্ত হওয়া-তাহার সহিত মিলিত হইয়া যাওয়াই যেমন শরের উদ্দেশ্য বা ফল,-তেমনি

খণ্ডঃ।] দ্বিতীয় মুণ্ডকম্। ৫১

[এখানেও] দেহাদি অনাত্ম-পদার্থের চিন্তা পরিত্যাগপূর্ব্বক অক্ষর ব্রহ্মের সহিত একাত্মভাব প্রাপ্তি—তৎস্বরূপতা-লাভরূপ ফল সম্পাদন করিবে ॥৩৬৷৪৷৷

যস্মিন্ দ্যৌঃ পৃথিবী চান্তরিক্ষ- মোতং মনঃ সহ প্রাণৈশ্চ সর্ব্বৈঃ।

তমেবৈকং জানথ আজ্ঞান- মন্য বাচো বিমুগ্ধামৃতস্যৈব সেতুঃ ॥৩৭॥৫॥

কিঞ্চ, দ্যৌঃ(দ্যুলোকঃ), পৃথিবী, অন্তরিক্ষং(আকাশং), মনঃ(অন্তঃ- করণং) চ সর্ব্বৈঃ(অন্যৈঃ) প্রাণৈঃ(করণৈঃ) সহ যস্মিন্(অক্ষরে পুরুষে.) ওতং(সর্ব্বতঃ প্রতিষ্ঠিতং)।[হে শিষ্যাঃ, যূয়ং] তম্ এব একং(কেবলং) আত্মানং(অক্ষরং) জানথ(জানীত অবগচ্ছত); অন্যাঃ(অপরবিদ্যারূপাঃ) বাচঃ(বচনানি) বিমুঞ্চথ(ত্যজত);[যস্মাৎ] এষঃ(অক্ষরঃ পুরুষঃ) অমৃতস্য (মোক্ষস্য) সেতুঃ(প্রাপ্ত্যুপায়ঃ) ॥

দ্যুলোক, পৃথিবী, আকাশ এবং সমস্ত করণবর্গের সহিত মন যে অক্ষরে প্রোত(সম্বদ্ধ) রহিয়াছে;[হে শিষ্যগণ] কেবল সেই আত্মাকেই জানিবে, অপর সমস্ত বাক্য ত্যাগ কর; ইনিই অমৃত বা মোক্ষলাভের সেতু (প্রাপ্তির উপায়) ॥৩৭॥৫॥

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

অক্ষরস্যৈব দুর্লক্ষ্যত্বাৎ পুনঃ পুনর্ব্বচনং সুলক্ষণার্থম্। যস্মিন্ অক্ষরে পুরুষে ভৌঃ পৃথিবী চান্তরিক্ষঞ্চ ওতং সমর্পিতং মনশ্চ সহ প্রাণৈঃ করণৈঃ অন্যৈঃ সর্ব্বৈঃ, তমেব সর্ব্বাশ্রয়ম্ একম্ অদ্বিতীয়ং জানথ জানীত হে শিষ্যাঃ। আত্মানং প্রত্যক্- স্বরূপং যুগ্মাকং সর্ব্বপ্রাণিনাঞ্চ, জ্ঞাত্বা চান্যা বাচঃ অপরবিদ্যারূপা বিমুঞ্চথ বিমুঞ্চত পরিত্যজত। তৎপ্রকাশ্যঞ্চ সর্ব্বং কৰ্ম্ম সসাধনম্। যতঃ অমৃতস্য এষ সেতুঃ, এতদাত্মজ্ঞানম্ অমৃতস্য অমৃতত্বস্য মোক্ষস্য প্রাপ্তয়ে সেতুঃ, সংসারমহোদধেরুত্তরণ- হেতুত্বাৎ; তথা চ শ্রুত্যন্তরম্-“তমেব বিদিত্বাতি মৃত্যুমেতি নান্তঃ পন্থা বিদ্যতে২য়নায়” ইতি ॥ ৩৭॥৫ ॥

৩৪ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

ভাষ্যানুবাদ।

অক্ষর দুর্জ্জেয়, এই কারণে অনায়াসে বুঝাইবার জন্য পুনঃ পুনঃ সেই অক্ষরেরই নির্দেশ করিতেছেন—যে অক্ষর-পুরুষে দ্যুলোক, পৃথিবী এবং অন্তরিক্ষ(আকাশ) আর মনঃ অপর সমস্ত প্রাণ অর্থাৎ করণবর্গের সহিত ওত—সমর্পিত রহিয়াছে; হে শিষ্যগণ, সকলের আশ্রয়স্বরূপ এক অদ্বিতীয় সেই আত্মাকে—তোমাদের ও সমস্ত প্রাণির প্রত্যেক চৈতন্যকে(পরমাত্মাকে) জান,[এবং জানিয়া] অপর বিদ্যাসম্পর্কিত অপর বাক্য সমূহ পরিত্যাগ কর; এবং সেই অপর বিদ্যা প্রকাশ্য সমস্ত কৰ্ম্ম ও কৰ্ম্ম-সাধন[পরিত্যাগ কর]; যেহেতু ইনি অমৃতের সেতু, অর্থাৎ সংসার-সমুদ্র হইতে উত্তীর্ণ হইবার কারণ; এই হেতু সেই আত্মতত্ত্বই অমৃতত্বলাভের অর্থাৎ মোক্ষপ্রাপ্তির সেতু স্বরূপ। অপর শ্রুতিও সেইরূপ বলিয়াছেন—‘তাঁহাকেই জানিয়া মৃত্যু অতিক্রম করে, যাইবার আর পথ নাই ॥’ ৩৭৷৫৷৷

অরা ইব রথনাভৌ সংহতা যত্র নাড্যঃ স এষোহন্তশ্চরতে বহুধা জায়মানঃ। ওমিতেবং ধ্যায়থ আত্মানং স্বস্তি বঃ পারায় তমসঃ পরস্তাৎ ॥৩৮৷৷৬৷৷

রথনাভৌ(রথস্য নাভিচক্রে) অরাঃ শলাকাঃ) ইব নাড্যঃ(দেহবর্ত্তিন্যঃ নাড়িকাঃ) যত্র(যস্মিন্ হৃদয়ে) সংহতাঃ(সন্নিবিষ্টাঃ)। বহুধা(ক্রোধহর্ষা- দিভিঃ) জায়মানঃ(প্রতীতঃ) স এষঃ(প্রকৃতঃ) আত্মা অন্তঃ(তস্য হৃদয়স্য মধ্যে) চরতে(চরতি)।[তং] আত্মানং ‘ওম্’ ইত্যেবং(ওঙ্কারালম্বনত্বেন) ধ্যায়থ(চিন্তয়ত);[হে শিষ্যাঃ]; বঃ(যুষ্মাকং) তমসঃ পরস্তাৎ(অবিদ্যান্ধ- কাররহিতায়) পারায়(সংসার-সাগরস্য পরতীরায়, মোক্ষায় ইতি যাবৎ) স্বস্তি (বিঘ্নাভাবঃ)[অস্তু ইতি শেষঃ] ॥

রথনাভিতে শলাকা-সমূহের ন্যায় দৈহিক নাড়ী-সমূহ যেখানে(হৃদয়ে) সংহত বা সন্নিবিষ্ট আছে; শোকহর্ষাদি নানাবিধ ভাবে প্রকাশমান সেই এই

খণ্ডঃ] দ্বিতীয়-মুণ্ডকম্। ৭৩

আত্মাও সেই হৃদয় মধ্যে সঞ্চরণ করেন;[হে শিষ্যগণ, তোমরা] সেই আত্মাকে ‘ওম্’ ইত্যাকারে ধ্যান কর; অজ্ঞানের অতীত পরপারে গমনে তোমাদের কল্যাণ হউক,—বিঘ্ন নিবৃত্ত হউক ॥৩৮॥৬৷৷

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

কিঞ্চ, অরা ইব, যথা রথনাভৌ সমপিতা অরাঃ, এবং সংহতাঃ সম্প্রবিষ্টা যত্র যস্মিন্ হৃদয়ে সর্ব্বতো দেহব্যাপিন্যে। নাড্যঃ, তস্মিন্ হৃদয়ে বুদ্ধিপ্রত্যয়সাক্ষিভূতঃ স এব প্রকৃত আত্মা অন্তঃ মধ্যে চরতে চরতি * বহুধা অনেকবা ক্রোধহর্ষাদি- প্রত্যয়ৈর্জায়মান ইব জায়মানঃ অন্তঃকরণোপাধ্যনুবিধায়িত্বাং; বদন্তি হি লৌকিকাঃ ‘হৃষ্টোজাতঃ, ক্রুদ্ধো জাতঃ’ ইতি। তমাত্মানম্ ওমিত্যেবম্ ওঙ্কারালম্বনাঃ সন্তো যথোক্তকল্পনয়া ধ্যায়থ চিন্তয়ত। উক্তঞ্চ বক্তব্যং শিষ্যেভ্য আচার্য্যেণ জানতা। শিষ্যাশ্চ ব্রহ্মবিদ্যা-বিবিদিযুত্বাৎ নিবৃত্তকৰ্ম্মাণো মোক্ষপথে প্রবৃত্তাঃ। তেষাং নির্বিঘ্নতয়া ব্রহ্ম প্রাপ্তিমাশাস্ত্যাচার্য্যঃ-স্বস্তি নির্বিঘ্নমস্তু বো যুগ্মাকং পারায় পরকূলায়। পরস্তাৎ কস্মাৎ? অবিদ্যা-তমসঃ, অবিদ্যারহিতব্রহ্মাত্মস্বরূপ- গমনায়েত্যর্থঃ ॥ ৩৮—৬ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

আরও, অর-সমূহ(শলাকাসমূহ) যেমন রথনাভিতে সংহতভাবে সম্যরূপে প্রবিষ্ট রহিয়াছে, তেমনি দেহব্যাপী নাড়ীসমূহ যে হৃদয়ে সম্যক্ প্রবিষ্ট থাকে; বুদ্ধি বৃত্তির সাক্ষিস্বরূপ সেই এই প্রস্তাবিত আত্মা বহুধা অর্থাৎ অন্তঃকরণরূপ উপাধির অনুগত থাকায় অন্তঃকরণ- গত ক্রোধ হর্ষাদি প্রত্যয়যোগে যেন জায়মান বলিয়াই প্রতীত হইয়া সেই হৃদয় মধ্যে বিচরণ করে। এই জন্যই জনসাধারণ বলিয়া থাকে যে, [অমুক ব্যক্তি] হৃষ্ট হইয়াছে, ক্রুদ্ধ হইয়াছে, ইত্যাদি। সেই আত্মাকে ‘ওম্’ ইত্যাকারে অর্থাৎ ওঙ্কারকে আত্মার আলম্বন করিয়া কথিত কল্পনানুসারে ধ্যান কর—চিন্তা কর। অভিজ্ঞ আচার্য্য কথিত বিষয়টি শিষ্যগণকে অবশ্য বলিবেন, শিষ্যগণও যখন ব্রহ্মবিদ্যা-জিজ্ঞাসু, তখন কর্ম্ম হইতে নিবৃত্ত হইয়াই মোক্ষ-মার্গে প্রবৃত্ত হইয়া থাকেন। আচার্য্য

* * শ্লথং শ্লথং মথো। বিমথং ইত্যধিকঃ ক্বচিৎ পৃচ্ছতে।

১০

৭৪ মুণ্ডকোপনিষৎ। দ্বিতীয়ঃ

তাহাদের নির্বিঘ্নে ব্রহ্মবিদ্যা লাভের জন্য আশীর্বাদ করিতেছেন যে, তোমাদের পরপার গমনে স্বস্তি কল্যাণ অর্থাৎ বিঘ্নের অভাব হউক। কাহার পর?—অবিদ্যা-অন্ধকারের। অভিপ্রায় এই যে, অবিদ্যা- বিরহিত ব্রহ্মাত্মস্বরূপ লাভের জন্য[স্বস্তি হউক] ॥৩৮॥৬৷৷

যঃ সর্ব্বজ্ঞঃ সর্ব্ববিদ্ যস্যৈব মহিমা ভুবি।

দিব্যে ব্রহ্মপুরে হ্যেষ ব্যোমন্যাত্মা প্রতিষ্ঠিতঃ ॥৩৯॥৭॥

যঃ সর্ব্বজ্ঞঃ সর্ব্ববিৎ, ভুবি(জগতি) যস্য এষঃ(বুদ্ধিস্থঃ) মহিমা[অনু- ভূয়তে]। এষ আত্মা দিব্যে(প্রকাশময়ে) ব্রহ্মপুরে(ব্রহ্মণ: অভিব্যক্তি- স্থানে) ব্যোমনি(হৃদয়াকাশে) প্রতিষ্ঠিতঃ(অভিব্যক্তঃ) ॥

যিনি সর্ব্বজ্ঞ ও সর্ব্ববিৎ, এবং জগতে যাঁহার এই মহিমা(বিভূতি)[অনুভূত হইতেছে]। এই আত্মা দিব্য ব্রহ্মপুর আকাশে(হৃদয়াকাশে) অবস্থিত আছেন॥ ৩৯৷৷

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

যোহসৌ তমসঃ পরস্তাৎ সংসারমহোদধিং তীর্থা গন্তব্যঃ পরবিদ্যাবিষয়ঃ, স কস্মিন্ বর্ততে? ইত্যাহ-যঃ সর্ব্বজ্ঞ; সর্ব্ববিং ব্যাখ্যাতঃ তং পুনর্বিশিনষ্টি- যস্যৈষ প্রসিদ্ধো মহিমা বিভূতিঃ। কোহসৌ মহিমা? যস্যেমে দ্যাবাপৃথিব্যৌ শাসনে বিধুতে তিষ্ঠতঃ, সূর্য্যাচন্দ্রমসৌ যস্য শাসনে অলাতচক্রবদজস্রং ভ্রমতঃ; যস্য শাসনে সরিতঃ সাগরাশ্চ স্বগোচরং নাতিক্রামন্তি; তথা স্থাবরং জঙ্গমঞ্চ যস্য শাসনে নিয়তম্; তথা ঋতবঃ, অয়নে অব্দাশ্চ যস্য শাসনং নাতিক্রামন্তি; তথা কর্তারঃ কর্মাণি ফলঞ্চ যচ্ছাসনাৎ স্বং স্বং কালং নাতিবর্তন্তে, স এষ মহিমা, ভুবি লোকে যস্য; স এষ সর্ব্বজ্ঞ এবংমহিমা দেবঃ। দিব্যে দ্যোতনবতি সর্ব্ববৌদ্ধ প্রত্যয়কৃতদ্যোতনে ব্রহ্মপুরে মনসি। ব্রহ্মণো হ্যত্র চৈতন্যস্বরূপেণ নিত্যাভিব্যক্তত্বাৎ; ব্রহ্মণঃ পুরং হৃদয়পুণ্ডরীকং, তস্মিন্ যদ্ব্যাম, তস্মিন্ ব্যোমনি আকাশে হৃৎপুণ্ডরীকমধ্যস্থে প্রতিষ্ঠিত ইবোপলভ্যতে। নহাকাশবৎ সর্ব্বগতস্য গতিরাগতিঃ প্রতিষ্ঠা বা অন্যথা সম্ভবতি ॥ ৩৯॥৭॥

ভাষ্যানুবাদ।

সংসার-সাগর পার হইয়া অজ্ঞানাতীত ও পরবিদ্যার বিষয়ীভূত যাহাকে পাইতে হইবে, তিনি কোথায় থাকেন? এই আকাঙ্ক্ষায়

খণ্ডঃ] দ্বিতীয়-মুণ্ডকম্। ৭৫

বলিতেছেন-যিনি সর্বজ্ঞ ও সর্ববিৎ, ইহার অর্থ পূর্ব্বেই কথিত হই- য়াছে। পুনশ্চ তাহাকে বিশেষিত করিতেছেন-যাহার এই প্রসিদ্ধ মহিমা-বিভূতি(ঐশ্বর্য্য); এই মহিমা কি?-এই দ্যুলোক ও পৃথিবী যাঁহার শাসনে বিধৃত হইয়া আছে,(স্থানচ্যুত হইতেছে না); যাঁহার শাসনে সূর্য্য ও চন্দ্র অলাতচক্রের(জলৎ কাষ্ঠখণ্ডের) ন্যায় অনবরত ভ্রমণ করিতেছেন; যাঁহার শাসনে নদী ও সমুদ্র সমূহ স্ব স্ব স্থান অতিক্রম করিতেছে না; এবং যাঁহার শাসনে স্থাবর ও জঙ্গম পদার্থ নিচয় নিয়মিত হইয়া আছে। সেইরূপ ঋতুসকল, অয়নদ্বয় (দক্ষিণায়ন ও উত্তরায়ণ) যাঁহার শাসন অতিক্রম করিতেছে না, সেই রূপ কর্তা, কৰ্ম্ম ও কর্মফল যাঁহার শাসনে নিজনিজ কাল অতিক্রম করিতেছে না,-জগতে যাঁহার এইরূপ মহিমা, এবংবিধ মহিমান্বিত সেই দেবতাই এই সর্বজ্ঞ দিব্য-প্রকাশসম্পন্ন অর্থাৎ বুদ্ধিকৃত সর্ববিধ জ্ঞানাত্মক প্রকাশযুক্ত ব্রহ্মপুরে(হৃদয়ে), কেন না, ব্রহ্মই চৈতন্য স্বরূপে এখানে সর্বদা অভিব্যক্ত আছেন; এই কারণে ব্রহ্মপুর অর্থ হৃৎপদ্ম, তন্মধ্যে যে আকাশ, হৃদয়-পুণ্ডরীকস্থ সেই আকাশে প্রতিষ্ঠিতের ন্যায় উপলব্ধির বিষয় হন। নচেৎ আকাশের ন্যায় সর্বগত ব্রহ্মের অন্যপ্রকার গমন কিংবা আগমন সম্ভবপর হয় না ॥ ৩৯৷৭৷৷

মনোময়ঃ প্রাণশরীরনেতা প্রতিষ্ঠিতোহন্নে হৃদয়ং সন্নিধায়। তদ্বিজ্ঞানেন পরিপশ্যন্তি ধীরা আনন্দরূপমমৃতং যদ্বিভাতি ॥৪০॥৮॥

কিঞ্চ, মনোময়ঃ;(মনউপাধিকঃ) প্রাণ-শরীরনেতা(প্রাণং চ সূক্ষ্মং শরীরং চ অস্মাৎ শরীরাৎ শরীরান্তরং নয়তীত্যর্থঃ)।[সঃ পুরুষঃ] হৃদয়ং সন্নিধায়(হৃৎপদ্মে অবস্থায়) অন্নে(অন্নোপচিতে দেহে) প্রতিষ্ঠিতঃ(অবস্থিতঃ) [অস্তি]। ধীরাঃ(বিবেকিনঃ) তদ্বিজ্ঞানেন(তদাত্মভাবানুভবেন) যৎ আনন্দরূপম্

৭৬ মুণ্ডকোপনিষৎ। দ্বিতীয়ঃ

(সর্ব্বদুঃখসম্পর্করহিতম্) অমৃতং বিভাতি(প্রকাশতে),[তৎ] পরিপশ্যন্তি (সম্যক্ অনুভবন্তীত্যর্থঃ) ॥

মনোময় এবং প্রাণও শরীরের নেতা,[সেই পুরুষ] হৃদয় অবলম্বন করিয়া অন্নপরিপুষ্ট দেহে অবস্থান করেন। বিবেকিগণ তাঁহার অনুভূতিবলে আনন্দ স্বরূপ যে অমৃত(ব্রহ্ম) প্রতিভাত হন, তাঁহাকে সম্পূর্ণরূপে দর্শন করিয়া থাকেন ॥ ৪০ ॥ ৮ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।

স হ্যাত্মা তত্রস্থো মনোবৃত্তিভিরেব বিভাব্যত ইতি মনোময়ঃ, মন-উপাধিত্বাৎ প্রাণশরীরনেতা, প্রাণঞ্চ শরীরঞ্চ প্রাণশরীরং, তস্যায়ং নেতা। অস্মাৎ স্থূলাৎ শরীরাৎ শরীরান্তরং সূক্ষ্মং প্রতি প্রতিষ্ঠিতঃ অবস্থিতঃ অন্নে ভুজ্যমানান্ন- বিপরিণামে প্রতিদিনম্ উপচীয়মানে অপচীয়মানে চ পিণ্ডরূপেহন্নে হৃদয়ং বুদ্ধিং পুণ্ডরীকচ্ছিদ্রে সন্নিধায় সমবস্থাপ্য, হৃদয়াবস্থানমেব হ্যাত্মনঃ:স্থিতিঃ, ন হ্যাত্মনঃ স্থিতিরন্নে। তৎ আত্মতত্ত্বং বিজ্ঞানেন বিশিষ্টেন শাস্ত্রাচার্য্যোপদেশজনিতেন জ্ঞানেন শম-দম-ধ্যান-সর্ব্বত্যাগ-বৈরাগ্যোদ্ভুতেন পরিপশ্যন্তি সর্ব্বতঃ পূর্ণং পশ্যন্তি উপলভন্তে ধীরা বিবেকিনঃ। আনন্দরূপং সর্ব্বানর্থদুঃখায়াসপ্রহীণং সুখরূপম্ অমৃতং যদ্বিভাতি বিশেষেণ স্বাত্মন্যেব ভাতি সর্ব্বদা ॥ ৪০ ॥ ৮ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

সেখানে অবস্থিত আত্মা কেবল মনোবৃত্তি সমূহ দ্বারাই অনুভব- গোচর হন, এই জন্য মনোময়[পদবাচ্য]; কারণ মন তাহার উপাধি, (সুতরাং উপলব্ধি স্থান), প্রাণ-শরীরনেতা, অর্থাৎ প্রাণ ও শরীর, এতদুভয়ের এই স্থূল শরীর হইতে সূক্ষ্ম শরীরান্তরে লইয়া যাইবার কর্তা, হৃদয়কে অর্থাৎ বুদ্ধিকে পুণ্ডরীকরন্ধে, সন্নিবেশিত করিয়া; অন্নে অর্থাৎ উপভুক্ত অন্নের পরিণামাত্মক এবং প্রতিদিন বৃদ্ধি হ্রাসভাগী এই দেহপিণ্ডে প্রতিষ্ঠিত—অবস্থিত। আত্মার হৃদয়ে অবস্থানই যথার্থ স্থিতি, নচেৎ অন্ন মধ্যে কখনই আত্মার স্থিতি হইতে পারে না। বিজ্ঞান দ্বারা অর্থাৎ শাস্ত্র ও আচার্য্যোপদেশ-লব্ধ এবং শম, দম, ধ্যান, সর্বত্যাগ ও বৈরাগ্য সমুদ্ভূত বিশিষ্ট জ্ঞান দ্বারা বিবেকিগণ সর্বতো- ভাবে সম্পূর্ণরূপে সেই আত্মতত্ত্ব সন্দর্শন করিয়া থাকেন, যে আনন্দরূপ

খণ্ডঃ] দ্বিতীয়-মুণ্ডকম্। ৭৭

অর্থাৎ সর্বপ্রকার অনর্থ দুঃখ যন্ত্রণারহিত ও অমৃতস্বরূপ বিশেষরূপে প্রকাশ পাইতেছে, অর্থাৎ যাহা আত্মাতেই সর্বদা প্রতিভাত হইতেছে ॥৪০॥৮৷৷

ভিদ্যতে হৃদয়-গ্রন্থিশ্চিদ্যন্তে সর্ব্বসংশয়াঃ।

ক্ষীয়ন্তে চাস্য কর্ম্মাণি তস্মিন্ দৃষ্টে পরাবরে ॥৪১॥৯॥

তস্মিন্(প্রস্তাবিতে) পরাবরে(কারণরূপেণ পরং শ্রেষ্ঠং, কার্য্যরূপেণ অবরং হীনং চ)।(.যদ্বা, পরে ব্রহ্মাদয়ঃ অবরে নিকৃষ্টা যস্মাৎ, তৎ পরাবরং— সর্ব্বোত্তমং, তস্মিন্) দৃষ্টে(সাক্ষাৎকৃতে সতি) অন্য(সাক্ষাৎকর্ত্তুঃ) হৃদয়-গ্রন্থিঃ (হৃদয়গতা অবিদ্যাহঙ্কারবাসনা) ভিদ্যতে(বিনশ্যতি), সর্ব্বসংশয়াঃ(সর্ব্বে সংশয়াঃ আত্মা দেহাতিরিক্তঃ নবা, নিত্যোহনিত্যো বা? ইত্যাদিরূপাঃ) ছিদ্যন্তে(বিচ্ছেদ- মাপদ্যন্তে নশ্যন্তীত্যর্থঃ)। কর্মাণি চ(প্রারন্ধেতরাণি) ক্ষীয়ন্তে(দগ্ধবীজভাব- মাপদ্যন্তে) ॥

সেই পরাবর ব্রহ্ম দৃষ্ট হইলে পর এই দ্রষ্টার হৃদয়গ্রন্থি(অবিদ্যাদি সংস্কার) নষ্ট হইয়া যায়, সর্ব্বপ্রকার সংশয় ছিন্ন হইয়া যায় এবং প্রারব্ধ ভিন্ন কর্মরাশি ক্ষয় প্রাপ্ত হয় ॥ ৪১ ॥ ৯ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।

অস্য পরমাত্মজ্ঞানস্য ফলমিদমভিধীয়তে-হৃদয়গ্রন্থিঃ অবিদ্যা-বাসনাময়ঃ বুদ্ধ্যা- শ্রয়ঃ কামঃ, “কামা যেহস্য হৃদি শ্রিতাঃ” ইতি শ্রুত্যন্তরাৎ। হৃদয়াশ্রয়োহসৌ, নাত্মাশ্রয়ঃ; ভিদ্যতে ভেদং বিনাশমুপযাতি। ছিদ্যন্তে সর্ব্বে জ্ঞেয়-বিষয়াঃ সংশয়াঃ লৌকিকানাম্ আ-মরণাৎ গঙ্গাস্রোতোবং প্রবৃত্তা বিচ্ছেদমায়ান্তি। অন্য বিচ্ছিন্ন- সংশয়স্থ্য নিবৃত্তাবিদ্যস্য যানি বিজ্ঞানোৎপত্তেঃ প্রাক্ কৃতানি জন্মান্তরে চ অপ্রবৃত্ত- ফলানি জ্ঞানোৎপত্তিসহভাবীনি চ ক্ষীয়ন্তে কর্মাণি; ন ত্বেতজ্জন্মারম্ভকাণি প্রবৃত্ত- ফলত্বাৎ। তস্মিন্ সর্বজ্ঞেৎসংসারিণি দৃষ্টে পরাবরে পরঞ্চ কারণাত্মনা, অবরঞ্চ কার্য্যাত্মনা, তস্মিন্ পরাবরে সাক্ষাদহমম্মীতি দৃষ্টে সংসার-কারণোচ্ছেদানুচ্যত ইত্যর্থঃ ॥ ৪১ ॥ ৯ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

এই পরমাত্ম-জ্ঞানের এই ফল অভিহিত হইতেছে—হৃদয়গ্রন্থে

৭৮ মুণ্ডকোপনিষৎ। দ্বিতীয়ঃ

অর্থে-অবিদ্যা-বাসনা অর্থাৎ বুদ্ধিনিষ্ঠা কামনা; কারণ, অন্যত্র-‘ইহার হৃদয়াশ্রিত যে সমস্ত কামনা’ এই শ্রুতিতে[‘কাম’কে বুদ্ধিনিষ্ঠ বলা আছে]। এই কামনা বুদ্ধিগত-আত্মগত নহে(১৫)[সেই হৃদয়- গ্রন্থি] ভেদপ্রাপ্ত হয়, অর্থাৎ বিনষ্ট হয়। অতত্ত্বজ্ঞ লোকদিগের হৃদয়ে যে, মৃত্যু পর্যন্ত গঙ্গাস্রোতের ন্যায় অনবরত জ্ঞেয়-বিষয়ে সংশয় হইয়া থাকে, তাহা বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়। এই অবিদ্যা ও সংশয়শূন্য ব্যক্তির জ্ঞানোদয়ের পূর্ব্বে ও জন্মান্তরে সম্পাদিত-যে সমস্ত কৰ্ম্ম এখনও ফল প্রদানে প্রবৃত্ত হয় নাই, এবং জ্ঞানোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেও যে সমস্ত কৰ্ম্ম অনুষ্ঠিত হইয়াছে, সেই সমস্ত কৰ্ম্ম ক্ষয়প্রাপ্ত হয়; কিন্তু যে সমস্ত কৰ্ম্ম এই বর্তমান জন্মের আরম্ভক, সেই সমস্ত কৰ্ম্ম ক্ষয় প্রাপ্ত হয় না; কারণ, তাহারা ফল দিতে আরম্ভ করিয়াছে,[প্রারব্ধ- ফলক কর্ম্মের ভোগশেষ না হইলে ক্ষয় হয় না]। যাহা কারণরূপে পর শ্রেষ্ঠ, আর কার্য্যরূপে অবর-হীন, ‘সেই সর্ব্বজ্ঞ অসংসারী, পরাবর ব্রহ্ম দৃষ্ট হইলে-‘আমি তৎস্বরূপ’ ইত্যাকারে সাক্ষাৎ অনুভূত হইলে, সংসারের কারণভূত অবিদ্যা বিনষ্ট হওয়ায়[সেই দ্রষ্টা] মুক্তি লাভ করে ॥ ৪১॥৯ ॥

হিরণ্ময়ে পরে কোশে বিরজং ব্রহ্ম নিষ্কলম্। তচ্ছুভ্রং জ্যোতিষাং জ্যোতিস্তদ্যদাত্মবিদো বিদুঃ॥৪২॥১০॥

[ উক্ত মেবার্থং সংক্ষিপ্য বক্ত মুপক্রমতে ‘হিরণ্ময়ে’ ইত্যাদি মন্ত্রত্রয়েণ]।—হির- ণ্ময়ে(জ্যোতির্ম্ময়ে) পরে(শ্রেষ্ঠে) কোশে(কোশবৎ অবস্থিতিস্থানে) বিরজং (বিরজস্কং রজোমলরহিতং), নিষ্কলং(নিরংশং) ব্রহ্ম[বর্ত্ততে ইতি শেষঃ]। তৎ (ব্রহ্ম) শুভ্রং(শুদ্ধং); তৎ জ্যোতিষাং(অগ্ন্যাদীনামপি) জ্যোতিঃ(প্রকাশকং);

খণ্ডঃ] দ্বিতীয়-মুণ্ডকম্। ৭৯

আত্মবিদঃ(বিবেকিনঃ) যং(ব্রহ্ম) বিদুঃ(জানন্তি)[তদেব তদ্বস্তু ইতি ভাবঃ]॥

রজোদোষরহিত ও কলা বা অংশ শূন্য ব্রহ্ম হিরণ্ময়(জ্যোতির্ময়) পরম কোশে (স্থানে)[অবস্থিত আছেন]। তিনি শুদ্ধ; তিনি জ্যোতিরও জ্যোতিঃ- স্বরূপ; আত্মবিদ্গণ যাঁহাকে জানেন ॥ ৪২ ॥ ১০ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।

উক্তস্যৈব অর্থস্য সঙ্ক্ষেপাভিধায়কা উত্তরে মন্ত্রাস্ত্রয়োহপি-হিরণ্ময়ে জ্যোতি- ৰ্ম্ময়ে বুদ্ধিবিজ্ঞানপ্রকাশে পরে কোশে কোশ ইব অসেঃ; আত্মস্বরূপোপলব্ধি- স্থানত্বাৎ, পরং সর্ব্বাভ্যন্তরত্বাৎ, তস্মিন্ বিরজম্ অবিদ্যাদ্যশেষদোষ-রজোমলবর্জিতং, ব্রহ্ম সর্ব্বমহত্ত্বাৎ সর্ব্বাত্মত্বাচ্চ, নিষ্কলং-নির্গতাঃ কলা যস্মাৎ তন্নিষ্কলং নিরবয়ব- মিত্যর্থঃ। যস্মাৎ বিরজং নিষ্কলঞ্চ, অতঃ তৎ শুভ্রং শুদ্ধং জ্যোতিষাং সর্ব্বপ্রকাশা- ত্মনাম্ অগ্ন্যাদীনামপি তজ্জ্যোতিঃ অবভাসকম্। অগ্ন্যাদীনামপি জ্যোতিষ্টম্ অন্তর্গত- ব্রহ্মাত্মচৈতন্য-জ্যোতির্নিমিত্তমিত্যর্থঃ। তদ্ধি পরং জ্যোতিঃ যদন্যানবভাস্যম্ আত্ম- জ্যোতিঃ, তদ্যৎ আত্মবিদ আত্মানং শব্দাদিবিষয়বুদ্ধিপ্রত্যয়সাক্ষিণং যে বিবেকিনো বিদুঃ বিজানন্তি, তে আত্মবিদঃ তদ্বিদুঃ আত্মপ্রত্যয়ানুসারিণঃ। যস্মাৎ পরং জ্যোতিঃ, তস্মাৎ ত এব তদ্বিদুঃ, নেতরে বাহ্যার্থপ্রত্যয়ানুসারিণঃ ॥ ৪২ ॥ ১০ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

পরবর্তী তিনটি মন্ত্রেও পূর্ব্বোক্ত বিষয়ই সংক্ষেপে প্রকাশ করি- তেছে—হিরণ্ময়—জ্যোতির্ময় অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তির প্রকাশলক্ষণ শ্রেষ্ঠ কোশে, কোশ অর্থ কোশসদৃশ; যেমন অসির(তরোয়ালের) কোশ; কেননা, উহাই আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করিবার স্থান; অন্যান্য সর্বাপেক্ষা অভ্যন্তরস্থ বলিয়া ইহা ‘পর’; তাহার মধ্যে বিরজ—অবিদ্যাপ্রভৃতি রজোময় সমস্তদোষ-রহিত, সর্বাপেক্ষা মহত্ত্বহেতু এবং সর্বাত্মকত্বহেতু ব্রহ্ম, নিষ্ফল—যাহা হইতে সমস্ত কলা বা অংশ অপগত হইয়াছে, অর্থাৎ নিরবয়ব। যেহেতু বিরজ ও নিষ্ফল, অতএব তিনি শুভ্র অর্থাৎ শুদ্ধ; স্বভাবতঃ সর্বপ্রকাশক অগ্নিপ্রভৃতি জ্যোতিঃপদার্থেরও তিনি জ্যোতিঃ, অর্থাৎ প্রকাশক। অভিপ্রায় এই যে, অগ্নিপ্রভৃতির যে জ্যোতিঃ,

৮০। মুণ্ডকোপনিষৎ। দ্বিতীয়ঃ

তাহারও কারণ সেই অন্তঃস্থিত ব্রহ্মচৈতন্য। আর সেই জ্যোতিই শ্রেষ্ঠ জ্যোতিঃ, যাহা অন্যের প্রকাশ্য হয় না। যে সকল বিবেকী পুরুষ শব্দাদি-বিষয়ক বুদ্ধিবৃত্তির সাক্ষিস্বরূপ সেই আত্মাকে জানেন, তাঁহারাই আত্মবিৎ, আত্ম-জ্ঞানানুবর্ত্তী সেই আত্মবিদ্গণই তাঁহাকে জানেন। যেহেতু উহাই পর জ্যোতিঃ, অতএব তাঁহারাই তাঁহাকে জানিতে পারেন,—কিন্তু বাহ্যার্থ-বিষয়ক জ্ঞানানুবর্ত্তীরা নহে ॥৪২॥১০॥

ন তত্র সূর্য্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকং

নেমা বিদ্যুতো ভান্তি কুতোহয়মগ্নিঃ। তমেব ভান্তমনুভাতি সর্ব্বং

তস্য ভাসা সর্ব্বমিদং বিভাতি ॥৪৩॥১১॥

তত্র(জ্যোতিষি) সূর্য্যঃ ন ভাতি(ন তৎ প্রকাশয়তি ইত্যর্থঃ), চন্দ্র-তারকং (চন্দ্রশ্চ তারকা চ)[ন ভাতি]; ইমাঃ(প্রসিদ্ধাঃ) বিদ্যুতঃ ন ভান্তি (প্রকাশয়ন্তি), অয়ং(প্রসিদ্ধঃ) অগ্নিঃ কুতঃ?[তৎ প্রকাশয়েয়ুঃ ইতি শেষঃ।]।[কিং বহুনা] ভান্তং(স্বতঃপ্রকাশং) তং(পরমাত্মানং) এব অনু (অনুসৃত্য) সর্ব্বং(সূর্য্যাদিকং জগৎ) ভাতি(প্রকাশতে); তস্য(পরমাত্মনঃ) [এব] ভাসা(দীপ্ত্যা) ইদং সর্ব্বং(জগৎ) বিভাতি(প্রকাশতে, ন স্বতঃ) ॥

সেই পরম জ্যোতিতে সূর্য্য প্রকাশ পান না, চন্দ্র এবং তারকাগণও প্রকাশ পায় না, এই বিদ্যুৎসমূহ প্রকাশ পায় না, এই অগ্নির আর কথা কি?[অধিক কি,] স্বপ্রকাশ তাঁহারই অনুগত হইয়া সকলে প্রকাশ পায়; তাঁহারই দীপ্তিতে এই সমস্ত জগৎ প্রকাশ পাইতেছে ॥ ৪৩॥ ১১॥

শঙ্করভাষ্যম্।

কথং তৎ জ্যোতিষাং জ্যোতিঃ, ইত্যুচ্যতে-ন তত্র তস্মিন্ স্বাত্মভূতে ব্রহ্মণি সর্ব্বাবভাসকোহপি সূর্য্যো ভাতি; তৎ ব্রহ্ম ন প্রকাশয়তীত্যর্থঃ। স হি তস্যৈব ভাসা সর্ব্বম্ অন্যৎ অনাত্মজাতং প্রকাশয়তীত্যর্থঃ; ন তু তস্য স্বতঃ প্রকাশনসামর্থ্যম্। তথা ন চন্দ্রতারকং, ন ইমা বিদ্যুতো ভান্তি, কুতোহয়মগ্নিঃ অস্মদেগোচরঃ। কিং বহুনা; যদিদং জগদ্ভাতি, তৎ তমেব পরমেশ্বরং স্বতো ভারূপত্বাৎ ভান্তং

খণ্ডঃ] দ্বিতীয়-মুণ্ডকম্। ৮১

দীপ্যমানম্ অনুভাতি অনুদীপ্যতে। যথা জলমুল্মুফাদি বা অগ্নিসংযোগাদগ্নি দহন্তম্ অনু দহতি, ন স্বতঃ, তদ্বৎ তস্যৈব ভাসা দীপ্ত্যা সর্ব্বমিদং সূর্য্যাদিমজ্জগৎ বিভাতি। যত এবং তদেব ব্রহ্ম ভাতি চ বিভাতি চ কার্য্যগতেন বিবিধেন ভাসা; অতস্তস্য ব্রহ্মণো ভারূপত্বং স্বতোহবগম্যতে। ন হি স্বতো, বিদ্যমানং ভাসনমন্যস্য কর্ত্তুং শক্লোতি; ঘটাদীনাম্ অন্যাবভাসকত্বাদর্শনাৎ, ভারূপাণাঞ্চ আদিত্যাদীনাং তদ্দর্শনাৎ ॥ ৪৩॥ ১১ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

তিনি জ্যোতিঃসমূহের জ্যোতিঃ কি প্রকারে? তদুত্তরে বলিতে- ছেন-সূর্য্য সর্ববস্তুর প্রকাশক হইয়াও স্বস্বরূপ সেই ব্রহ্মেতে প্রকাশ পান না, অর্থাৎ সূর্য্য সেই ব্রহ্মকে প্রকাশিত করিতে পারেন না। কারণ, সূর্য্য তাঁহার দীপ্তিতেই অপর অনাত্ম-বস্তুসমূহকে প্রকাশ করিয়া থাকেন, কিন্তু তাঁহার নিজের স্বভাবসিদ্ধ প্রকাশন শক্তি নাই। সেইরূপ চন্দ্র তারাও[প্রকাশ পায়] না; এই বিদ্যুৎসমূহ প্রকাশ পায় না; আমাদের প্রত্যক্ষীভূত অগ্নি আর কিরূপে[প্রকাশ পাইবে]? অধিক আর কি বলিব’; এই যে, জগৎ প্রতিভাত হইতেছে, তাহা কেবল স্বভাবতঃ প্রকাশরূপ বলিয়া স্বয়ং প্রকাশমান সেই পরমেশ্বরের প্রভার অনুগত হইয়াই দীপ্তি পাইতেছে। জল ও দগ্ধকাষ্ঠ যেরূপ দাহকারী অগ্নির সংযোগে তদনুগতভাবেই দাহ করিয়া থাকে, কিন্তু আপনা হইতে নহে, তদ্রূপ। সেই যে, এই সূর্যাদিসংযুক্ত সমস্ত জগৎ, ইহা একমাত্র তাঁহারই দীপ্তিতে দীপ্তিমান্ হইয়া থাকে। যেহেতু সেই ব্রহ্মই সূর্য্যাদি জন্য-পদার্থ গত বিবিধ দীপ্তি দ্বারা এইরূপে সামান্য ও বিশেষাকারে প্রকাশ পান; এই কারণে তাঁহার স্বভাবসিদ্ধ প্রকাশরূপতা পরিজ্ঞাত হয়; কেননা, যাহার স্বভাবসিদ্ধ দীপ্তি নাই, সে কখনই অপরের দীপ্তি সম্পাদন করিতে পারে না। স্বতঃ প্রকাশ- হীন ঘটাদির অন্যাবভাসকতা দেখা যায় না, অথচ প্রকাশমান আদিত্যা- দির অন্যাবভাসকতা দেখা যায় ॥ ৪৩ ॥ ১১ ॥

১১

৮২ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

ব্রহ্মৈবেদমমৃতং পুরস্তাদ্ব্রহ্ম পশ্চাদ্ধহ্ম দক্ষিণতশ্চোত্তরেণ। অধশ্চোদ্ধঞ্চ প্রসূতং ব্রহ্মৈবেদং বিশ্বমিদং বরিষ্ঠম্ ॥৪৪॥১২৷৷ ইত্যথর্ব্ববেদীয়-মুণ্ডকোপনিষদি দ্বিতীয়মুণ্ডকে

দ্বিতীয়ঃ খণ্ডঃ ॥২॥

ইদম্(প্রাগুক্তলক্ষণম্) অমৃতং(নিত্যস্বরূপং) ব্রহ্ম এব পুরস্তাৎ(অগ্রে), ব্রহ্ম পশ্চাৎ,[তথা] ব্রহ্ম দক্ষিণতঃ(দক্ষিণে ভাগে), উত্তরেণ[উত্তরস্মিন্ ভাগে] চ, অধঃ(অধস্তাৎ) উর্দ্ধং(উপরি ভাগে) চ প্রসূতং(ব্যাপ্তং)[কিং বহুনা,] ইদং বরিষ্ঠং(মহৎ) বিশ্বং(জগৎ) ব্রহ্ম এব,(ন ব্রহ্মান্যৎ কিঞ্চিৎ অস্তীত্যাশয়ঃ)।

অমৃতস্বরূপ এই ব্রহ্মই অগ্রে, ব্রহ্মই পশ্চাদ্ভাগে, ব্রহ্ম দক্ষিণে ও উত্তরে, অধোভাগে এবং ঊর্দ্ধভাগে ব্যাপ্ত রহিয়াছেন। অধিক কি, এই বিশাল বিশ্বও ব্রহ্মস্বরূপই বটে॥ ৪৪ ॥ ১২ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।

যত্তজ্যোতিষাং জ্যোতিব্রহ্ম, তদেব সত্যং, সর্ব্বং তদ্বিকারং বাচারম্ভণং বিকারো নামধেয়মাত্রম্ অনৃতম্ ইতরদিত্যেতমর্থং বিস্তরেণ হেতুতঃ প্রতিপাদিতং নিগমস্থানীয়েন মন্ত্রেণ পুনরুপসংহরতি। ব্রহ্মৈব উক্তলক্ষণম্ ইদং যৎ পুরস্তাৎ অগ্রে হব্রহ্মেবাবিদ্যাদৃষ্টীনাং প্রত্যবভাসমানং, তথা পশ্চাদ্ব্রহ্ম, তথা দক্ষিণতশ্চ, তথা উত্তরেণ, তথৈব অধস্তাৎ উর্দ্ধঞ্চ সর্ব্বতোহন্যদিব কার্য্যাকারেণ প্রসূতং প্রগতং নামরূপবৎ অবভাসমানম্। কিং বহুনা, ব্রহ্মৈবেদং বিশ্বং সমস্তমিদং জগৎ বরিষ্ঠং বরতমম্। অব্রহ্মপ্রত্যয়ঃ সর্ব্বোহবিদ্যামাত্রো রজ্জামিব সর্পপ্রত্যয়ঃ। ব্রহ্মৈবৈকং পরমার্থসত্যমিতি বেদানুশাসনম্ ॥ ৪৪ ॥ ১২ ॥ ইতি শ্রীমৎপরমহংস পরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীগোবিন্দ-ভগবৎ-পূজ্যপাদ শিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্করভগবতঃ কৃতৌ মুণ্ডকোপনিষদ্ভাষ্যে দ্বিতীয়মুণ্ডকে দ্বিতীয়খণ্ডঃ ॥ ২ ॥ ভাষ্যানুবাদ। সেই যে জ্যোতিরও জ্যোতিঃস্বরূপ ব্রহ্ম, তিনিই সত্য; তদ্বিকার আর যাহা কিছু, তৎসমস্ত বিকারই বাক্যারব্ধ নাম মাত্র—মিথ্যাভূত;

খণ্ডঃ] দ্বিতীয়মুণ্ডকম্। ৮৩

এই বিষয়টি কারণ প্রদর্শনপূর্ব্বক বিস্তৃতভাবে প্রতিপাদিত হইয়াছে। এখন নিগমন বা উপসংহারস্থানীয় এই মন্ত্রে পুনশ্চ তাহার উপসংহার করিতেছেন—এই যে সম্মুখে অব্রহ্মদর্শিদিগের নিকট অব্রহ্মবৎ প্রতি- ভাসমান হইতেছে, ইহা পূর্ব্বোক্তলক্ষণ ব্রহ্মস্বরূপই; সেইরূপ পশ্চাদ্ ভাগস্থিত পদার্থও ব্রহ্মস্বরূপ; সেইরূপ দক্ষিণে, সেইরূপ উত্তরে, সেই- রূপ অধঃ এবং ঊর্দ্ধভাগে ব্রহ্মই নাম রূপবিশিষ্টবৎ প্রতিভাসমান হইয়া জন্যপদার্থাকারে প্রসূত অর্থাৎ ব্যাপ্ত হইয়া রহিয়াছেন। অধিক কি, এই মহত্তর সমস্ত জগৎ ব্রহ্মস্বরূপই বটে; রজ্জুতে যেরূপ অজ্ঞানাত্মক সর্প-প্রতীতি হইয়া থাকে, জাগতিক সর্ববিধ অব্রহ্মবুদ্ধিও ঠিক তদ্রূপ। একমাত্র ব্রহ্মই সত্যপদার্থ; ইহাই বেদের উপদেশ ॥ ৪৪৷১২ ॥

ইতি দ্বিতীয় মুণ্ডকে দ্বিতীয় খণ্ড-ভাষ্যানুবাদ সমাপ্ত। ১॥

তৃতীয়মুণ্ডকে প্রথমঃ খণ্ডঃ।

শাঙ্কর-ভাব্যম্।

পরা বিদ্যোক্তা—যয়া তদক্ষরং পুরুষাখ্যং সত্যম্ অধিগম্যতে; যদধিগমে হৃদয়- গ্রন্থ্যাদি-সংসারকারণস্য আত্যন্তিকো বিনাশঃ স্যাৎ। তদ্দর্শনোপায়শ্চ যোগো ধনুরা- দ্যুপাদানকল্পনয়োক্তঃ। অথেদানীং তৎসহকারীণি সত্যাদিসাধনানি বক্তব্যনীতি তদর্থ উত্তরগ্রন্থারম্ভঃ। প্রাধান্যেন তত্ত্বনিদ্ধারণঞ্চ প্রকারান্তরেণ ক্রিয়তে; অত্যন্ত দুরবগাহ্যত্বাৎ কৃতমপি তত্র সূত্রভূতো মন্ত্রঃ পরমার্থ-বস্তুবধারণার্থমুপন্যস্যতে—

যাহাকে জানিলে হৃদয়-গ্রন্থিপ্রভৃতি সংসার-কারণের আত্যন্তিক বিধ্বংস হয়, সেই পুরুষসংজ্ঞক সত্যস্বরূপ অক্ষর যাহা দ্বারা জানা যায়, সেই পরা বিদ্যা উক্ত হইয়াছে। আর সেই পুরুষ দর্শনের উপায়ভূত যে যোগ, তাহাও ধনুঃপ্রভৃতি-কল্পনা দ্বারা কথিত হইয়াছে। ইতঃপর সেই যোগের সহকারী সত্যাদি সাধন বলা আবশ্যক; তদুদ্দেশেই পরবর্তী গ্রন্থ আরব্ধ হইতেছে এবং প্রধানতঃ প্রকৃত তত্ত্বেরও নিরূপণ করা হইতেছে; কারণ, এই বিষয়টি অত্যন্ত কঠিন,-সহজে বুদ্ধি-গম্য হয় না; এইজন্য পূর্বাবধারিত পরমার্থ বস্তুর অবধারণার্থ সূত্র স্থানীয় (সংক্ষিপ্তার্থ-প্রকাশক) মন্ত্রটির উল্লেখ করা হইতেছে—

দ্বা সুপর্ণা সযূজা সখায়া সমানং বৃক্ষং পরিষস্বজাতে। তয়োরন্যঃ পিপ্পলং স্বাদ্বত্যনশ্নন্নন্যোহভিচাকশীতি ॥৪৫॥১॥

সযুজা(সযুজৌ সর্ব্বদা সংযুক্তৌ), সখায়া(সখায়ৌ সমানস্বভাবৌ তুল্যাভিব্যক্তি স্থানৌ ইতি যাবৎ) দ্বা(দ্বৌ) সুপর্ণা(সুপর্ণৌ, পক্ষিসাধর্ম্ম্যাৎ পক্ষিণৌ জীবেশ্বরো) সমানং(অবিশেষম্ একং) বৃক্ষং(বৃক্ষবৎ ক্ষয়শীলং শরীরং) পরিষস্বজাতে(পরিষক্তবস্তৌ)। তয়োঃ(পক্ষিণোঃ মধ্যে) অন্যঃ(একঃ—

১মঃ খণ্ডঃ] তৃতীয়মুণ্ডকম্। ৮৫

জীবঃ) স্বাদু(প্রিয়ং) পিপ্পলম্(কৰ্ম্মফলম্) অত্তি(ভুক্তে), অন্যঃ(অপরঃ— ঈশ্বরঃ) তু(পুনঃ) অনশ্নন্(ফলম্ অভুঞ্জানঃ সন্) অভিচাকশীতি(সাক্ষিরূপেণ জীবভোগং পশ্যতি)।[ঈশ্বরস্ত সাক্ষিতয়া পণ্যত্যেব কেবলং নাশ্নাতীতি ভাবঃ] ॥

সহবর্তী ও সমানস্বভাব দুইটি সুপর্ণ অর্থাৎ পক্ষি-সদৃশ জীবাত্মা ও পরমাত্মা একই বৃক্ষে সংসক্ত রহিয়াছেন; তদুভয়ের মধ্যে একটি(জীব) স্বাদু কর্ম্মফল ভোগ করে, আর অপরটি(পরমাত্মা) ভোগ না করিয়া দর্শন করেন মাত্র ॥ ৪৫ ॥ ১ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।

দ্বা দ্বৌ, সুপর্ণা সুপর্ণো শোভনপতনৌ সুপর্ণো, পক্ষিসামান্যাদ্বা সুপর্ণো, সযুজা সযুজৌ সহৈব সর্ব্বদা যুক্তৌ, সখায়া সখায়ৌ সমানাখ্যানৌ সমানাবি- ব্যক্তিকারণৌ, এবস্তৃতৌ সন্তৌ সমানম্ অবিশেষম্ উপলব্ধ্যধিষ্ঠানতয়া, একং বৃক্ষং বৃক্ষমিবোচ্ছেদনসামান্যাৎ শরীরং বৃক্ষং পরিষস্বজাতে পরিষক্তবন্তৌ; সুপর্ণাবিব একং বৃক্ষং ফলোপভোগার্থম্।

অয়ং হি বৃক্ষ উর্দ্ধমুলোহবাক্শাখোহশ্বত্থোহব্যক্তমূল প্রভবঃ ক্ষেত্রসংজ্ঞকঃ সৎপ্রাণিকৰ্ম্মফলাশ্রয়ঃ, তং পরিঘক্তবন্তৌ সুপর্ণাবিব অবদ্যাকাম-কর্মবাসনাশ্রয়- লিঙ্গোপাধ্যাত্মেশ্বরো। তয়োঃ পরিষক্তয়োঃ অন্য একঃ ক্ষেত্রজ্ঞো লিঙ্গোপাধি- বৃক্ষমাশ্রিতঃ পিপ্পলং কৰ্ম্মনিষ্পন্নং সুখ-দুঃখলক্ষণং ফলং স্বাদু অনেকবিচিত্র- বেদনাস্বাদরূপং স্বাদু অত্তি ভক্ষয়তি উপভূঙক্তে অবিবেকতঃ। অনশ্নন্ অন্য ইতর ঈশ্বরো নিত্য শুদ্ধবুদ্ধমুক্তস্বভাবঃ সর্ব্বজ্ঞ: সত্ত্বোপাধিরীশ্বরো নাশ্নাতি। প্রেরয়িতা হ্সাবুভয়োর্ভোজ্য ভোক্ত্রোনিত্যসাক্ষিত্বসত্তামাত্রেণ। স তু অনশ্নন্ অন্যঃ অভি- চাকশীতি পশ্যত্যেব কেবলম্। দর্শনমাত্রং হি তস্য প্রেরয়িতৃত্বং রাজবৎ ॥৪৫৷১৷

ভাষ্যানুবাদ।

দ্বা অর্থ দুই, সুপর্ণা অর্থ নিয়ম্যনিয়ামক ভাব-প্রাপ্তিরূপ উত্তম পতনসম্পন্ন—সুপর্ণদ্বয়, অথবা পক্ষীর সাদৃশ্য থাকায় পক্ষী বলা হইয়াছে;[ইহারা] সযুজা অর্থাৎ সর্বদা একসঙ্গে সম্মিলিত, এবং সখা অর্থাৎ সমান নামধারী—উভয়েরই অভিব্যক্তির কারণ সমান; ইহারা এবংভূত হইয়া,তুল্য অভিব্যক্তি-স্থান বলিয়া, সমান—অবি- শেষিত অর্থাৎ এক, বৃক্ষের ন্যায় বিনাশশীল, এই কারণে শরীরই

৮৬ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

বৃক্ষপদবাচ্য; দুইটি পক্ষী যেরূপ ফলোপভোগের জন্য একটি বৃক্ষে অধিষ্ঠান করে, তদ্রূপ সেই শরীর-বৃক্ষে আলিঙ্গন বা অধিষ্ঠান করে।

ক্ষেত্রসংজ্ঞক এই অশ্বত্থ বৃক্ষটির মূল ঊর্দ্ধদিকে, শাখাসমূহ অধো- দিকে, অব্যক্ত প্রকৃতিরূপ মূল হইতে ইহার উৎপত্তি এবং সমস্ত প্রাণীর কর্মফল ইহাতে আশ্রিত। অবিদ্যা ও কামকৰ্ম্ম-বাসনার আশ্রয়ীভূত এবং লিঙ্গশরীরোপাহিত জীবাত্মা ও ঈশ্বর পক্ষীর ন্যায় উক্ত বৃক্ষে পরিষক্ত আছেন। তদুভয়ের মধ্যে অন্য—একটি ক্ষেত্রজ্ঞ(জীব) লিঙ্গদেহরূপ উপাধিবৃক্ষ আশ্রয় করিয়া স্বাদু অর্থাৎ—অনেকপ্রকার বৈচিত্র্যবিশিষ্ট অনুভবাত্মক স্বাদু পিপ্পল অর্থাৎ কৰ্ম্ম-সম্পাদিত সুখ- দুঃখাত্মক ফল অবিবেকবশে ভক্ষণ করে—উপভোগ করিয়া থাকে। অপর—অর্থাৎ নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ ও মুক্তস্বভাব-সম্পন্ন সত্ত্বোপাধি (প্রকৃতির সত্ত্বাংশসংবলিত) সর্বজ্ঞ ঈশ্বর ভোগ করেন না। কারণ, এই ঈশ্বর নিত্য সাক্ষিরূপে ভোগ্য ও ভোক্তা জীব, এতদুভয়ের প্রেরক। সেই অভোক্তা অন্যটি(ঈশ্বরটি)[ভোগ করেন না,] কেবল দর্শন করেন মাত্র, রাজার ন্যায় কেবল দর্শন করাই তাঁহার প্রেরকত্ব [তস্তিন্ন অপর কোনও কার্য্য করিতে হয় না।]

সমানে বৃক্ষে পুরুষো নিমগ্নো অনীশয়া শোচতি মুহ্যমানঃ। জুষ্টং যদা পশ্যত্যন্যমীশ- মস্য মহিমানমিতি বীতশোকঃ ॥৪৬৷২॥

পুরুষঃ(জীবঃ) সমানে(একস্মিন্) বৃক্ষে(দেহে) নিমগ্নঃ(অধিষ্ঠাতা সন্) অনীশয়া(অনৈশ্বর্য্যেণ অবিদ্যা ঈশ্বরত্বতিরোধানেন) মুহ্যমানঃ(অহমস্মি কর্তা ভোক্তা ইত্যাদিপ্রকারৈঃ অনর্থৈঃ মোহং প্রাপ্তঃ সন্) শোচতি(শোকং করোতি দুঃখীয়তি ইত্যর্থঃ)।[সঃ] যদা ধ্যায়মানঃ(ধ্যানপরায়ণ: সন্) জুষ্টম্ (যোগিজন-সেবিতম্) অন্যম্(ক্ষেত্রজ্ঞাৎ বিলক্ষণম্) ঈশম্(ঈশ্বরম্’, অন্য(ঈশ্বরস্য)

খণ্ডঃ] তৃতীয়মুণ্ডকম্। ৮৭

ইতি(ইত্থং বিশ্বব্যাপিনং) মহিমানং(বিভূতিং)[চ] পশুতি(সাক্ষাৎ করোতি),[তদা] বীতশোকঃ(সংসার-ক্লেশাৎ বিমুক্তঃ)[ভবতি]। অথবা,[তদা] বীতশোকঃ(সন্) অস্য(পরমেশ্বরস্য) মহিমানম্ ইতি(এতি— প্রাপ্নোতি, তদ্রূপো ভবতীত্যাশয়ঃ)।॥

জীব(ঈশ্বরের সহিত) একই দেহ-বৃক্ষে অবস্থিত হইয়াও অনৈশ্বর্য্য বশতঃ মোহগ্রস্ত হইয়া শোক করিয়া থাকে। সেই জীবই যখন ধ্যানপরায়ণ হইয়া যোগিজনসেবিত জীব-বিলক্ষণ ঈশ্বরকে দর্শন করে, এবং তাহার এই বিশ্বব্যাপী মহিমাও উপলব্ধি করে, তখন সংসার-ক্লেশ হইতে বিনির্ম্মুক্ত হয় ॥ ৪৬॥ ২॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

তত্রৈবং সতি সমানে বৃক্ষে যথোক্তে শরীরে পুরুষো ভোক্তা জীবোহবিদ্যা- কামকৰ্ম্ম-ফলরাগাদি-গুরুভারাক্রান্তোহলাবুরিব সামুদ্রে জলে নিমগ্নঃ-নিশ্চয়েন দেহাহভাবমাপন্নঃ, ‘অয়মেবাহম্, অমুষ্য পুত্রোহস্য নপ্তা, কৃশঃ স্থূলো গুণবান্নিগুণ্ণ: সুখী দুঃখী‘ইত্যেবংপ্রত্যয়ঃ-নাস্তন্যোহস্মাদিতি জায়তে ম্রিয়তে সংযুজ্যতে বিযুজ্যতে চ সম্বন্ধিবান্ধবৈঃ; অতোহনীশয়া, ন কস্যচিৎ সমর্থোহহং-পুত্রো মম বিনষ্টঃ, মৃতা মে ভার্য্যা, কিং মে জীবিতেন, ইত্যেবং দীনভাবোহনীশা, তয়া শোচতি সন্তপ্যতে, মুহ্যমানঃ অনেকৈরনর্থপ্রকারৈঃ অবিবেকিতয়া। অন্তশ্চিন্তামাপদ্য- মানঃ। স এবং প্রেততির্য্যঙ মনুষ্যাদিযোনিস্বাজবংজবীভাবমাপন্নঃ কদাচিদনেক- জন্মসু শুদ্ধধৰ্ম্মসঞ্চিতনিমিত্ততঃ কেনচিৎ পরমকারুণিকেন দর্শিতযোগমার্গঃ অহিংসা- সত্য-ব্রহ্মচর্য্য সর্ব্বত্যাগ-শম-দমাদিসম্পন্নঃ সমাহিতাত্মা সন্ জুষ্টং সেবিতমনেকৈ- যোগমার্গৈঃ কর্মিভিশ্চ যদা যস্মিন্ কালে পশ্যতি ধ্যায়মানঃ অন্যং বৃক্ষোপাধি- লক্ষণাদবিলক্ষণম্ ঈশম্ অসংসারিণম্ অশনায়া-পিপাসা-শোক-মোহ-জরা-মৃত্যতীতম্ ঈশং সর্ব্বস্য জগতঃ অয়মহমস্ম্যাত্মা, সর্ব্বশ্য সমঃ সর্বভূতস্থো নেতরোহবিদ্যাজনিতো- পাধিপরিচ্ছিন্নো মায়াত্মা, ইতি মহিমানং বিভৃতিং চ জগদ্রূপমস্যৈব মম পরমেশ্বরস্য ইতি যদৈবং দ্রষ্টা, তদা বীতশোকো ভবতি -সর্বস্মাৎ শোকসাগরাৎ বিপ্রমুচ্যতে, কৃতকৃত্যো ভবর্তীত্যর্থঃ ॥ ৪৬॥ ২॥

ভাষ্যানুবাদ।

এই অবস্থায় পূর্ব্বোক্তপ্রকার বৃক্ষে অর্থাৎ দেহে অবিদ্যা, কাম, কর্ম্ম ও তৎফলস্বরূপ বিষয়ে অনুরাগাদিরূপ গুরুভারে আক্রান্ত পুরুষ—

৮৮ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

জীব সমুদ্রজলে নিমগ্ন অলাবুর ন্যায়(লাউর ন্যায়) নিমগ্ন হইয়া নিঃসংশয় রূপে দেহাত্মভাব প্রাপ্ত হইয়া ‘এই দেহই আমি, আমি ইহার পুত্র, ইহার পৌত্র, কৃশ, স্থূল, গুণবান, নির্গুণ, সুখী, দুঃখী, ইত্যাকার প্রতীতিসম্পন্ন এবং ‘এই দৃশ্যমান বিষয় হইতে আর অতিরিক্ত কিছু নাই, এইরূপ ধারণার বশবর্তী হইয়া জন্মে, মরে এবং আত্মীয় স্বজ- নের সহিত সংযুক্ত ও বিযুক্ত হইয়া থাকে। অতএব, অনীশা বশতঃ অর্থাৎ কোন বিষয়েই আমার শক্তি নাই,-‘আমার পুত্র নষ্ট হইয়াছে, ভার্য্যা মারা গিয়াছে; আমার জীবনে আর প্রয়োজন কি?’ এই প্রকার দীনভাবের নাম ‘অনীশা’; এই অনীশা বশতঃ মুহ্যমান হইয়া -অবিবেক নিবন্ধন বহুবিধ অনর্থ রাশি দ্বারা হৃদয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হইয়া, শোক করিয়া থাকে, অর্থাৎ সন্তাপিত হইয়া থাকে। সেই পুরুষ এই প্রকারে প্রেত, তির্য্যক্ ও মনুষ্যাদি যোনিতে অবিরত হীনভাব প্রাপ্ত হইয়া, বহু জন্মে কখনও বিশুদ্ধ ধর্ম সঞ্চয়ের ফলে কোনও পরম দয়ালু পুরুষ হইতে যোগপথের উপদেশ লাভ করিয়া এবং অহিংসা, সত্যনিষ্ঠা, ব্রহ্মচর্য্য(বীর্য্য ধারণ), সর্ববিধ বিষয় পরিত্যাগ ও শম- দমাদি সাধন-সম্পন্ন(১৫) এবং সমাহিতচিত্ত হইয়া ধ্যানবলে যখন অনেকানেক যোগী ও কর্মিগণ-সেবিত, অন্য-উক্ত বৃক্ষোপাধি জীব হইতে বিভিন্নরূপ ঈশকে-ক্ষুধা, পিপাসা, শোক, মোহ, জরা মৃত্যুর অতীত অসংসারী ঈশ্বরকে ‘এই আমিই এই সমস্ত জগতের আত্মা, সকলের পক্ষে সমান, এবং সর্বভূতে অবস্থিত, কিন্তু অবিদ্যা-কৃত উপাধি দ্বারা পরিচ্ছিন্ন পৃথক্ পৃথক্ বস্তু মায়াত্মক নহে’; এইরূপে [দর্শন করে,] এবং ‘এই জগৎ এই পরমেশ্বরেরই মহিমা’ এইরূপে

খণ্ডঃ।] তৃতীয়-মুণ্ডকম্। ৮৯

যখন[তাঁহার] মহিমা—ঐশ্বর্য্যও দর্শন করে, তখন বীতশোক হয়, অর্থাৎ সমস্ত শোক-সাগর হইতে বিমুক্ত হয়—ফল কথা সে কৃতকৃত্য হয় ॥৪৬৷৷২৷৷

যদা পশ্যঃ পশ্যতে রুক্মবর্ণং কর্তারমীশং পুরুষং ব্রহ্মযোনিম্। তদা বিদ্বান্ পুণ্যপাপে বিধূয় নিরঞ্জনঃ পরমং সাম্যমুপৈতি ॥৪৭॥৩৷৷

[কিঞ্চ], যদা পশ্যঃ(পশ্যতীতি পশ্যঃ দ্রষ্টা—বিদ্বান্)[সাধকঃ] রুক্সবর্ণং (জ্যোতিৰ্ম্ময়ং) কর্তারং(জগৎস্রষ্টারং) ব্রহ্মযোনিম্(ব্রহ্মণঃ—হিরণ্যগর্ভস্য অপি কারণম্) ঈশং(প্রভুং) পুরুষং(পরমেশ্বরং) পশ্যতে(পশ্যতি), তদা (তস্মিন্ কালে)। সঃ] বিদ্বান্(জ্ঞানী সাধকঃ) পুণ্য-পাপে বিধূয়(নিরাকৃত্য) নিরঞ্জনঃ(নির্লেপঃ সন্) পরমং(নিরতিশয়ং) সাম্যম্(অভেদরূপম্) উপৈতি (প্রাপ্নোতি)।[সাম্যস্য পরমত্বং তৎস্বারূপ্যমে, অন্যথা ‘সাম্যম্’ ইত্যেৰ ক্রয়াদিতি ভাবঃ]॥

দ্রষ্টা সাধক যখন সুবর্ণাভ কর্ত্তা ও ব্রহ্ম-যোনি(ব্রহ্মারও উৎপাদক) ঈশ্বর পুরুষকে দর্শন করেন, তখন সেই বিদ্বান্ পুণ্য ও পাপ পরিত্যাগপূর্ব্বক নির্লেপ হইয়া[ব্রহ্মের সহিত] নিরতিশয় সাম্য(অভেদভাব) প্রাপ্ত হন ॥৪৭॥৩॥

শঙ্কর-ভাষ্যম্।

অন্যোহপি মন্ত্র ইমমেবার্থমাহ সবিস্তরম্-যদা যস্মিন্ কালে পশ্যঃ পশ্যতীতি বিদ্বান্ সাধক ইত্যর্থঃ। পশ্যতে পশুতি পূর্ব্ববং, রুক্সবর্ণং স্বয়ংজ্যোতিঃস্বভাবং, রুক্সস্যেব বা জ্যোতিরস্যাবিনাশি; কর্তারং সর্ব্বস্য জগতঃ, ঈশং পুরুষং ব্রহ্ম- যোনিং ব্রহ্ম চ তদ্ যোনিশ্চ অসৌ ব্রহ্মযোনিঃ, তং ব্রহ্মযে নিং, ব্রহ্মণো বা অপরস্য যোনিং; স যদা চৈবং পশ্যতি, তদা স বিদ্বান্ পশ্যঃ পুণ্যপাপে বন্ধনভূতে কৰ্ম্মণী সমূলে বিধূয় নিরস্য দগ্ধা নিরঞ্জনো নির্লেপো বিগতক্লেশঃ পরমং প্রকৃষ্টং নিরতি- শয়ং সাম্যং সমতামদ্বয়লক্ষণং; দ্বৈতবিষয়াণি সামান্যতঃ অর্বাঞ্চ্যেব, অতোহদ্বয়- লক্ষণমেতৎ পরমং সাম্যমুপৈতি প্রতিপদ্যতে ॥৪৭৷৩৷৷

১২

৯০ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

ভাষ্যানুবাদ।

অপর মন্ত্রও উক্ত অর্থই প্রকাশ করিতেছে-যে সময় পশ্য অর্থাৎ দর্শনকারী বিদ্বান্ সাধক, রুক্সবর্ণ-স্বয়ং জ্যোতিঃস্বভাব, অথবা রুক্সের(সুবর্ণের) ন্যায় ইহার জ্যোতিও অবিনাশী,[অতএব রুক্সবর্ণ], সমস্ত জগতের কর্তা ব্রহ্মযোনি ঈশ্বর পুরুষকে দর্শন করেন; [ যিনি কারণভূত ব্রহ্ম, তিনি ব্রহ্মযোনি]; অথবা অ-পর ব্রহ্মের যোনি(কার্য্য ব্রহ্ম হিরণ্যগর্ভের কারণ)। সেই সাধক যখন এইরূপ দর্শন করেন, তখন সেই ঈশ্বরদর্শী বিদ্বান্ বন্ধনস্বরূপ পুণ্যপাপময় কর্ম্ম, সমূলে বিদূরিত করিয়া, অর্থাৎ দগ্ধ করিয়া নিরঞ্জন-নির্লেপ অর্থাৎ ক্লেশবিরহিত হইয়া, পরম প্রকৃষ্ট অর্থাৎ যদপেক্ষা আর অধিক নাই, এমন অদ্বয়াত্মক,-সাধারণতঃ দ্বৈত বিষয়মাত্রই পরবর্তী বা অপকৃষ্ট, অতএব, এই পরম সাম্য অদ্বয়াত্মক[বুঝিতে হইবে], সেই সাম্য প্রাপ্ত হন ॥৪৭॥৩॥

প্রাণো হ্যেষ যঃ সর্ব্বভূতৈর্বিভাতি বিজানন্ বিদ্বান্ ভবতে নাতিবাদী। আত্ম-ক্রীড় আত্ম-রতিঃ ক্রিয়াবান্ এষ ব্রহ্মবিদাং বরিষ্ঠঃ ॥৪৮॥৪॥

যঃ(ঈশ্বরঃ) সর্ব্বভূতৈঃ(সর্ব্বভূতোপলক্ষিতঃ সর্ব্বভূতস্থঃ) বিভাতি; এষঃ হি(নিশ্চয়ে) প্রাণঃ(প্রাণস্য প্রাণ ইত্যর্থঃ)।[এবংভূতং তং] বিদ্বান্(জানন্ পুরুষঃ) অতিবাদী(অন্যান্ সর্ব্বান্ অতীত্য বদতীতি অতিবাদী) ন ভবতে (ভবতি),[সর্ব্বত্র ব্রহ্মৈকত্বদর্শিত্বাদিতি ভাবঃ]। এষঃ(বিদ্বান্) আত্মক্রীড়ঃ (আত্মনি ক্রীড়া যস্য, সঃ), আত্মরতিঃ(আত্মনি রতিঃ প্রীতিঃ যস্য, সঃ), এষঃ ব্রহ্মবিদাং(বরিষ্ঠঃ শ্রেষ্ঠঃ)[চ]॥

যিনি সর্ব্বভূতস্থ, নিশ্চয় তিনিই প্রাণের প্রাণস্বরূপ। এবস্তৃত হইয়া প্রকাশ পাইতেছেন; সেই ঈশ্বরবিৎ পুরুষ অতিবাদী হন না। পরন্তু, তিনি আত্মাতেই

খণ্ডঃ।] তৃতীয়-মুণ্ডকম্। ৯১

ক্রীড়া করেন, আত্মাতেই রমণ করেন; তিনিই জ্ঞানধ্যানাদি ক্রিয়াবান্ এবং ব্রহ্মবিদ্গণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ॥ ৪৮ ॥ ৪ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।

কিঞ্চ যোহয়ং প্রাণস্য প্রাণঃ পর ঈশ্বরঃ, হি এষঃ প্রকৃত: সর্বভূতৈঃ ব্রহ্মাদি- স্তম্বপর্য্যন্তৈঃ; ইথভূতলক্ষণা তৃতীয়া। সর্ব্বভূতস্থঃ সর্ব্বাত্মা সন্নিত্যর্থঃ। বিভাতি বিবিধং দীপ্যতে। এবং সর্বভূতস্থং সঃ সাক্ষাদাত্মভাবেন ‘অয়মহমস্মি’ ইতি বিজানন্ বিদ্বান্ বাক্যার্থজ্ঞানমাত্রেণ ন ভবতে ন ভবতীত্যেতৎ। কিম্? অতিবাদী অতীত্য সর্ব্বানন্যান্ বদিতুং শীলমস্যেতি অতিবাদী। যত্ত্বেবং সাক্ষাদাত্মানং প্রাণস্য প্রাণং বিদ্বান,সঃ অতিবাদী ন ভবতীত্যর্থঃ. সর্ব্বং যদা আত্মৈব নান্যদস্তীতি দৃষ্টং, তদা কিং হ্যাসাবতীত্য বদেৎ। যস্য ত্বপরমন্যদ্দৃষ্টমস্তি, স তদতীত্য বদতি; অয়ন্তু বিদ্বান্ আত্মনোহনৃৎ ন পশ্যতি; নানৃৎ শৃণোতি, নান্যৎ বিজানাতি; অতো নাতিবদতি।

কিঞ্চ আত্মক্রীড়ঃ আত্মন্যেব ক্রীডা ক্রীড়নং যস্য নান্যত্র পুত্রদারাদিষু, স আত্মক্রীড়ঃ। তথা আত্মরতিঃ আত্মন্যেব চ রতিঃ রমণং প্রীতির্যস্য, স আত্মরতিঃ। ক্রীড়া বাহ্যসাধনসাপেক্ষা; রতিস্তু সাধননিরপেক্ষা বাহ্যবিষয়প্রীতিমাত্রমিতি বিশেষঃ। তথা ক্রিয়াবান্ জ্ঞান-ধ্যান-বৈরাগ্যাদিক্রিয়া যস্য, সোহয়ং ক্রিয়া- বান্। সমাসপাঠে আত্মরতিরেব ক্রিয়া অস্য বিদ্যত ইতি বহুব্রীহি-মতুবর্থয়োরন্য- তরোহতিরিচ্যতে।

কেচিত্ত অগ্নিহোত্রাদি কৰ্ম্ম-ব্রহ্মবিদ্যয়োঃ সমুচ্চয়ার্থমিচ্ছন্তি তচ্চ, ‘এষ ব্রহ্মবিদাং বরিষ্টঃ; ইত্যনেন মুখ্যার্থবচনেন বিরুধ্যতে। ন হি বাহ্যক্রিয়াবান্ আত্মক্রীড় অ’স্মরতিশ্চ ভবিতুং শক্তঃ। কশ্চিৎ কচিদ্বাহ্যক্রিয়াবিনিবৃত্তো হ্যাথক্রীড়ো ভবতি, বাহ্যক্রিয়াত্মক্রীড়য়োর্বিরোধাৎ। ন হি তমঃ-প্রকাশয়োযুগপদেকত্র স্থিতিঃ সম্ভবতি। তস্মাদসৎপ্রলপিতমেবৈতৎ ‘অনেন জ্ঞান-কর্মসমুচ্চয় প্রতিপাদনম্’। “অন্যা বাচো বিমুঞ্চথ”, “সন্ন্যাসযোগাৎ” ইত্যাদি শ্রুতিভ্যশ্চ। তস্মাদয়মেবেহ ক্রিয়াবান্ যো জ্ঞান-ধ্যানাদিক্রিয়াবান্ অসন্তিন্নার্থমর্য্যাদঃ সন্ন্যাসী। য এবংলক্ষণো নাতিবাদী আত্মক্রীড় আত্মরতিঃ ক্রিয়াবান্ ব্রহ্মনিষ্ঠঃ, স ব্রহ্মবিদাং সর্ব্বেষাং বরিষ্ঠঃ প্রধানঃ ॥ ৪৮ ॥ ৪ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

আরও, এই যে প্রাণের প্রাণ পরমেশ্বর, প্রস্তাবিত এই পরমেশ্বরই

৯২ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

ব্রহ্মাদি তৃণ পর্য্যন্ত সমস্ত ভূতে উপলক্ষিত; সর্বভূতস্থ- সর্বাত্ম- স্বরূপ হইয়া বিবিধাকারে দীপ্তি পাইতেছেন। “সর্বভূতৈঃ” এই স্থলে ইত্থংভূতে(উপলক্ষণ-বিশেষণে) তৃতীয়া হইয়াছে।[যে লোক] এইরূপে সর্বভূতস্থ ঈশ্বরকে ‘আমি এতৎস্বরূপ’ এই প্রকারে সাক্ষাৎ আত্মস্বরূপে জানেন, কেবল তদ্বিষয়ক বাক্যার্থ জ্ঞানসম্পন্নও হয়, সে কখনই হয় না;-কি? অতিবাদী(হয় না)। অপর সকলকে অতিক্রম করিয়া কথা বলা যাহার স্বভাব, সে লোক অতিবাদী; কিন্তু যে লোক প্রাণের প্রাণস্বরূপ এই আত্মাকে সাক্ষাৎ সম্বন্ধে জানে, সে লোক অতিবাদী হইতে পারে না। সমস্তই আত্মস্বরূপ, তদতিরিক্ত কিছুই নাই; ইহা যিনি পরিজ্ঞাত আছেন, তিনি কাহাকে অতিক্রম করিয়া বলিবেন? পরন্তু, অপর বস্তু যাহার দৃষ্টিগোচর হয়, সেই লোকই সেই বস্তুনিচয় অতিক্রম করিয়া বলিয়া থাকে। কিন্তু, এই বিদ্বান্ পুরুষ আত্মা ভিন্ন আর কিছুই দর্শন করে না, আর কিছুই শ্রবণ করে না এবং আর কিছুই জানে না; অতএব অতিবাদীও হয় না।

অপিচ, তিনি আত্মক্রীড়—আত্মাতে যাঁহার ক্রীড়া—পুত্র-দারাদি অপর বস্তুতে নহে, তিনি আত্মক্রীড়; সেইরূপ আত্মরতি— আত্মাতেই যাঁহার রতি অর্থাৎ রমণ—প্রীতি, তিনি আত্মরতি। ক্রীড়া হয় বাহিরের বস্তু দ্বারা; রতিতে কিন্তু কোনই বাহ্য-সাধনের অপেক্ষা থাকে না, উহা কেবল বাহ্য বিষয়ে প্রীতিমাত্র,(ক্রীড়া ও রতির মধ্যে) এইমাত্র বিশেষ। সেইরূপ তিনি ক্রিয়াবান্, যাঁহার জ্ঞান, ধ্যান ও বৈরাগ্যাদি ক্রিয়া বিদ্যমান আছে, তিনি ক্রিয়াবান্। সমাসযুক্ত পাঠে অর্থাৎ ‘আত্মরতি-ক্রিয়াবান্’ এইরূপ সমাসযুক্ত একপদ-ঘটিত পাঠ থাকিলে[ অর্থ এইরূপ যে,] যাঁহার একমাত্র আত্মরতি স্বরূপ ক্রিয়া বিদ্যমান আছে; অতএব এ পক্ষে বহুব্রীহি ও মতুপ্ প্রত্যয়, এই দুইটির মধ্যে একটির অর্থ অধিক হইয়া পড়ে।(১৬)

(১০) তৎপর্য্য—বহুব্রীহি সমাসে যে অর্থ বুঝায়, মতুপ, প্রত্যয়েও সেই অর্থই বুঝায়; এই

খঃ।] তৃতীয়-মুণ্ডকম্। ৯৩

কেহ কেহ অগ্নিহোত্রাদি ক্রিয়া ও ব্রহ্মবিদ্যার সমুচ্চয় বা সহানুষ্ঠান জ্ঞাপনার্থ “আত্মরতি-ক্রিয়াবান্” এইরূপ পাঠ স্বীকার করিয়া থাকেন। তিনি ব্রহ্মবিদ্গণের মধ্যে বরিষ্ঠ, এই মুখ্যার্থপর বাক্যের সহিত তাহাদের মতটি বিরুদ্ধ হয়; কেননা, যে লোক বাহ্য-সাধনসাধ্য ক্রিয়াবান্, সে লোক কখনই আত্মক্রীড় বা আত্মরতি হইতে সমর্থ হয় না। বাহ্য-ক্রিয়া ও আত্ম-ক্রীড়ায় পরস্পর বিরোধ থাকায় যে লোক বাহ্যক্রিয়া হইতে বিশেষভাবে নিবৃত্ত হইয়াছে; সেইরূপ কোন কোন লোকই আত্মক্রীড় হইয়া থাকে। কেন না, অন্ধকার ও আলোকের একত্র অবস্থিতি কখনই সম্ভবপর হয় না। অতএব, ‘ইহা দ্বারা জ্ঞান ও কর্ম্মের সমুচ্চয় প্রতিপাদিত হইল,’ এইরূপ কথা অসঙ্গত প্রলাপোক্তিমাত্র। ‘অপর সমস্ত কথা পরিত্যাগ কর,’ ‘সংন্যাস- যোগ হইতে’ ইত্যাদি শ্রুতিও ইহার অপর হেতু। প্রসিদ্ধ নিয়ম- লঙ্ঘনকারী না হইয়া যে সন্ন্যাসী জ্ঞান-ধ্যানাদি ক্রিয়ানুষ্ঠান করেন, জগতে তিনিই প্রকৃত ক্রিয়াবান্। যিনি উক্তপ্রকার অনতিবাদী, আত্মক্রীড়, আত্মরতি, ক্রিয়াবান্ ও ব্রহ্মনিষ্ঠ, তিনিই সমস্ত ব্রহ্মবিদ্‌- গণের মধ্যে বরিষ্ঠ—প্রধান ॥৪৮৷৷৪॥

সত্যেন লভ্যস্তপসা। হোষ আজ্ঞা।

সম্যগ্‌জ্ঞানেন ব্রহ্মচর্য্যেণ নিত্যম্। অন্তঃশরীরে জ্যোতির্ম্ময়ো হি শুভ্রো

যং পশ্যন্তি যতয়ঃ ক্ষীণদোষাঃ ॥৪॥৫॥

[তত্ত্বজ্ঞানসহকারিণী সাধনান্যাহ]—সত্যেনেতি। এষঃ(প্রকৃতঃ) হি জ্যোতি- ৰ্ম্ময়ঃ(হিরণ্ময়ঃ) শুভ্রঃ(শুদ্ধঃ) আত্মা হি(নিশ্চয়ে) অন্তঃশরীরে(শরীরমধ্যে— হৃদয়-পুণ্ডরীকে) নিত্যং(সর্ব্বদা) সত্যেন(অনৃত-ত্যাগেন) তপসা(মনসঃ ইন্দ্রিয়াণাং চ একাগ্রতয়া) ব্রহ্মচর্য্যেণ(বীর্য্যধারণেন) সম্যক্ জ্ঞানেন(আত্ম-তত্ত্ব-

৯৪ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

দর্শনেন)[চ] লভ্যঃ(প্রাপ্তব্যঃ),[ন অন্যথা।] যং(আত্মানং) ক্ষীণদোষাঃ (বিধূতরাগাদিচিত্তমলাঃ) যতয়ঃ(সংযমিনঃ সংন্যাসিনঃ) পশ্যন্তি(উপলভন্তে) ॥

এখন তত্ত্বজ্ঞানের সহকারী সাধন সমূহ কথিত হইতেছে—এই শুদ্ধ জ্যোতি- র্ম্ময় আত্মাকে শরীরমধ্যেই হৃদয়-পুণ্ডরীকে সর্ব্বদা সত্য, তপস্যা(মনপ্রভৃতির একাগ্রতা), যথার্থ আত্মদর্শন ও ব্রহ্মচর্য্য দ্বারা লাভ করিতে হয়; ক্ষীণদোষ (নিৰ্ম্মলহৃদয়) যতিগণ যাহাকে দর্শন করিয়া থাকেন ॥ ৫। ॥ ৫ ॥

শঙ্করভাষ্যম্।

অধুনা সত্যাদীনি ভিক্ষোঃ সম্যজ্ঞানসহকারীণি সাধনানি বিধীয়ন্তে নিবৃত্তিপ্রধানানি-সত্যেন অনৃতত্যাগেন মৃষাবদনত্যাগেন লভ্যঃ প্রাপ্ত্যঃ কিঞ্চ, তপসা হি ইন্দ্রিয়মনএকাগ্রতয়া। ‘মনসশ্চেন্দ্রিয়াণাঞ্চ হৈ কাগ্র্যং পরমং তপঃ” ইতি স্মরণাৎ। তদ্ধি অনুকূলমাত্মদর্শনাভিমুখীভাবাৎ পরমং সাধনং তপঃ, নেতর- চ্চান্দ্রায়ণাদি। এষ আত্মা লভ্য ইত্যনুষঙ্গঃ সর্ব্বত্র। সম্যগ্‌জ্ঞানেন যথাভূতাত্ম- দর্শনেন, ব্রহ্মচর্য্যেণ মৈথুনাসমাচারেণ নিত্যং সর্বদা; নিত্যং সত্যেন, নিত্যং তপসা, নিত্যং সম্যগ্‌জ্ঞানেনেতি সর্বত্র নিত্যশব্দোহন্তদীপিকান্যায়েনানুষক্তব্যঃ। বক্ষ্যতি চ “ন যেষু জিহ্মমনৃতং ন মায়া চ” ইতি। কাসাবাত্মা, য এতৈঃ সাধনৈ- লভ্যঃ? ইতি উচ্যতে অন্তঃশরীরে অন্তৰ্ম্মধ্যে শরীরস্য পুণ্ডরীকাকাশে জ্যোতির্ময়ো হি রুক্মবর্ণঃ শুভ্রঃ শুদ্ধঃ, যমাত্মানং পশ্যন্তি উপলভন্তে যতয়ো যতন- শীলাঃ সন্ন্যাসিনঃ ক্ষীণদোষাঃ ক্ষীণক্রোধাদিচিত্তমলাঃ, স আত্মা নিত্যং সত্যাদি- সাধনৈঃ সন্ন্যাসিভির্লভ্যত ইত্যর্থঃ। ন কাদাচিৎবৈঃ সত্যাদিভির্লভ্যতে, সত্যাদিসাধনস্তত্যর্থোহয়মর্থবাদঃ ॥ ৪৯ ৫ ॥

ভাষানুবাদ।

এখন ভিক্ষুর(সন্ন্যাসীর) তত্ত্বজ্ঞান-সহকারী নিবৃত্তিপ্রধান সত্যাদি সাধন-সমূহ বিহিত হইতেছে—সত্য দ্বারা—অনৃত ত্যাগ দ্বারা অর্থাৎ মিথ্যাকথন পরিত্যাগ দ্বারা[ আত্মাকে] লাভ করিতে হয়—পাইতে হয়। অপিচ, ইন্দ্রিয় ও মনের একাগ্রতারূপ তপস্যা দ্বারা; কারণ, স্মৃতিতে আছে—‘মন ও ইন্দ্রিয়সমূহের যে, একাগ্রতা, তাহাই পরম_তপস্যা।’ অনুকূলভাবে আত্মদর্শনে আভিমুখ্য সম্পাদন

খণ্ডঃ। তৃতীয় মুণ্ডকম্। ৯৫

করে বলিয়া উহাই উৎকৃষ্ট সাধনরূপ তপস্যা; কিন্তু, তদ্ভিন্ন চান্দ্রায়ণাদি[এখানে তপস্যা] নহে। ‘এই আত্মাকে লাভ করিতে হইবে,’ সর্ববত্রই এই কথার সম্বন্ধ আছে। সম্যক্ জ্ঞান দ্বারা-যথাযথরূপে আত্মদর্শন দ্বারা, ব্রহ্মচর্য্য দ্বারা অর্থাৎ মৈথুন- পরিত্যাগ দ্বারা, নিত্য অর্থ-সর্বদা; নিত্য সত্য দ্বারা, নিত্য তপস্যা দ্বারা, নিত্য সম্যক্ জ্ঞান দ্বারা; এইরূপে মধ্যবর্তী দীপের ন্যায় একই ‘নিত্য’ শব্দের সর্বত্র সম্বন্ধ করিতে হইবে। পরেও বলিবেন যে, ‘যে সকল ব্যক্তিতে কৌটিল্য, অসত্য ব্যবহার নাই এবং মায়া(ছল) নাই’ ইতি। যাহাকে এই সাধনসমূহ দ্বারা লাভ করিতে হইবে, সেই আত্মা কোথায় আছেন? এতদুত্তরে বলিতেছেন-অন্তঃশরীরে অর্থাৎ শরীরের মধ্যে হৃৎ-পদ্মাকাশে; জ্যোতির্ময়-সুবর্ণবর্ণ ও শুভ্র অর্থাৎ শুদ্ধ(নির্দোষ); ক্ষীণদোষ অর্থাৎ যাহাদের চিত্তগত ক্রোধাদি মল- দোষ ক্ষয় প্রাপ্ত হইয়াছে; সেই সকল যতি অর্থাৎ যত্নপরায়ণ সন্ন্যাসি- গণ যে আত্মাকে উপলব্ধি করিয়া থাকেন; সেই আত্মাকে সন্ন্যাসিগণ সর্বকালীন সত্যাদি সাধনের দ্বারা লাভ করিয়া থাকেন, কিন্তু সাময়িক সত্যাদি সাধন সমূহ দ্বারা লাভ করেন না। উক্ত সত্যাদি সাধনের প্রশংসার্থ এই ‘অর্থবাদ’ উক্ত হইল(১৭) ॥৫০॥৫৷৷

সত্যমেব জয়তে নানৃতং সত্যেন পন্থা বিততো দেবযানঃ। যেনাক্রমন্ত্যূষয়ো হ্যাপ্টকামা

যত্র তৎ সত্যস্য পরমং নিধানম্ ॥৫০॥৬॥

সত্যম্(অনৃতত্যাগঃ, অর্থাৎ সত্যবাদী) এব(নিশ্চয়ে) জয়তে(জয়তি সর্ব্বোৎকর্ষেণ বর্ত্ততে), অনৃতং(অসত্যং, অর্থাৎ অনৃতবাদী) ন জয়তি, অর্থাৎ

৯৬ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

পরাজয়তে]।[যতঃ] বিততঃ(বিস্তীর্ণঃ) দেবযানীখ্যঃ(দেবযানসংজ্ঞক উত্ত- রায়ণঃ) পন্থাঃ সত্যেন[লভ্য ইতি শেষঃ]; হি(নিশ্চয়ে) আপ্তকামাঃ(বীত- স্পৃহাঃ) ঋষয়ঃ যেন(দেবযানাখ্যেন পথা) যত্র(যস্মিন্ স্থানে) সত্যস্য(সাধন- ভূতস্য) পরমং(প্রকৃষ্টং) নিধানং(পুরুষার্থলক্ষণ-ফলং)[অস্তি], তত্র আক্রমন্তি(আক্রমন্তে, গচ্ছন্তি);[স সত্যেন বিততঃ পন্থা ইতি সম্বন্ধঃ]॥

সত্যেরই জয়, অসত্যের নহে, কারণ, দেবযান নামক বিস্তীর্ণ পথ এই সত্য দ্বারাই লাভ করা যায়, আপ্তকাম(বাসনাবিহীন) ঋষিগণ যে পথ দ্বারা সত্যের পরম উৎকৃষ্ট নিধান বা ফল যেখানে আছে, সেখানে গমন করেন ॥ ৫০ ॥ ৬ ॥

শাঙ্করভাষ্যম্।

সত্যমেব সত্যবানেব জয়তে জয়তি, নানৃতং নানৃতবাদীত্যর্থঃ। ন হি সত্যানৃতয়োঃ কেবলয়োঃ পুরুষানাশ্রিতয়োঃ জয়ঃ পরাজয়ো বা সম্ভবতি। প্রসিদ্ধং লোকে সত্যবাদিনা অনৃতবাদ্যভিভূয়তে, ‘ন বিপর্যয়ঃ; অতঃসিদ্ধ: সত্যস্য বলবৎ- সাধনত্বম। কিঞ্চ, শাস্ত্রতোহপি অবগম্যতে সত্যস্য সাধনাতিশয়ত্বম্। কথম্? সত্যেন যথাভূতবাদব্যবস্থয়া পন্থা দেবযানীখ্যো বিততো বিস্তীর্ণঃ সাতত্যেন প্রবৃত্তঃ, যেন পথা হি অক্রমন্তি আক্রমন্তে ঋষয়ো দর্শনবস্তুঃ কুহকমায়াশাঠ্যাহঙ্কার- দম্ভানৃতবজ্জিতা হ্যাপ্টকামা বিগততৃষ্ণাঃ সর্ব্বতো যত্র যস্মিন্, তৎ পরমার্থতত্ত্বং সত্যস্য উত্তমসাধনস্য সম্বন্ধি সাধ্যং পরমং প্রকৃষ্টং নিধানং-পুরুষার্থরূপেণ নিধীয়তে ইতি নিধানং বর্ত্ততে। তত্র চ যেন পথা আক্রমন্তি, স সত্যেন বিতত ইতি পূর্ব্বেণ সম্বন্ধঃ ॥ ৫১ ॥ ৬॥

ভাষ্যানুবাদ।

সত্যই অর্থাৎ সত্যবান্‌ই জয় লাভ করে, অনৃত অর্থাৎ মিথ্যাবলম্বী নহে। কেন না, পুরুষে অনাশ্রিত কেবলই সত্য ও মিথ্যার জয় কিংবা পরাজয় কখনই সম্ভব হয় না; লোক ব্যবহারেও প্রসিদ্ধ আছে যে, সত্যবাদিকর্তৃক মিথ্যাবাদী পরাজিত হয়, ইহার বৈপরীত্য হয় না; অতএব, সত্যের প্রবল সাধনত্ব প্রমাণিত হয়। বিশেষতঃ, সাধনমধ্যে সত্যের যে, সর্বোৎকৃষ্টতা, তাহা শাস্ত্র হইতেও জানা যায়। কি

খণ্ডঃ] তৃতীয়মুণ্ডকম্। ৯৭

প্রকারে?—সত্য অর্থাৎ যথার্থ-কথনে নিষ্ঠা দ্বারা দেবযান-নামক পথটি বিতত অর্থাৎ অবিচ্ছিন্নভাবে প্রবৃত্ত রহিয়াছে। আপ্তকাম অর্থাৎ সর্বতোভাবে ভোগ-তৃষ্ণারহিত ঋষিগণ অর্থাৎ কুহক, মায়া, শঠতা, অহঙ্কার, দম্ভ ও(১৮) অসত্য-বর্জ্জিত দ্রষ্টৃগণ, যেখানে উৎকৃষ্ট সাধন সত্যের সাধ্য বা ফলস্বরূপ, সেই পরমার্থ সত্য সর্বোৎকৃষ্ট—যাহা পুরুষার্থ রূপে(পুরুষের-প্রার্থনীয় ফল-স্বরূপে) নিহিত(রক্ষিত) হয়, তাহার নাম নিধান; সেই নিধান বর্তমান আছে; তাহাতে যে পথ দ্বারা আক্রমণ করেন; তাহাই সেই সত্য-লভ্য বিস্তীর্ণ পথ ॥৫১॥৬৷৷

বৃহচ্চ তদ্দিব্যমচিন্ত্যরূপং সূক্ষ্মাচ্চ তৎ সূক্ষ্মতরং বিভাতি। দূরাৎ সুদূরে তদিহান্তিকে চ পশ্যৎস্বিহৈব নিহিতং গুহায়াম্ ॥ ৫৩৷৭॥

[ইদানীং তস্য ধৰ্ম্মং স্বরূপঞ্চ বক্ত মুপক্রমতে] ‘বৃহৎ’ ইত্যাদিনা। -তৎ(ব্রহ্ম) বৃহৎ(মহৎ) দিব্যম্(অলৌকিকম্, ইন্দ্রিয়াদ্যগোচরম্) অচিন্ত্যরূপং(চিন্ত- য়িতুমশক্যং) চ,[কিঞ্চ] তৎ(ব্রহ্ম) সূক্ষ্মাৎ চ(অপি) সূক্ষ্মতরং(অতিশয়- সূক্ষ্মং) বিভাতি(প্রকাশতে)।[তথা অজ্ঞানাং পক্ষে] তৎ(ব্রহ্ম) দূরাৎ সুদূরে(অতিশয়বিপ্রকৃষ্টদেশে,)[বর্ত্ততে];[জ্ঞানিনাং পুনঃ] ইহ(দেহে) অন্তিকে চ(সমীপে চ)[বর্ত্ততে]। পশ্যৎসু(তদ্শিশু চেতনেষু জনেষু) ইহ (দেহে) এব গুহায়াং(হৃৎপদ্মে) নিহিতং(নিশ্চয়েন স্থিতমস্তি ইত্যর্থঃ) ॥

সেই ব্রহ্ম মহৎ, অলৌকিক ও অচিন্ত্য-স্বরূপ; তিনি সূক্ষ্ম হইতেও সূক্ষ্মতর এবং তিনি দূর হইতেও দূরবর্তী, অথচ সমীপেও প্রকাশ পান। বিশেষতঃ

(১৮) তাৎপর্য্য-কুহকং-পরবঞ্চনম্। অন্তরন্যথ গৃহীত্বা বহিরন্যথাপ্রকাশনং-মায়া। শাঠ্যং-বিভবানুসারেণ অপ্রদানম্। অহঙ্কারঃ-মিথ্যাভিমানঃ। দন্তঃ-ধর্মধ্বজিত্বম্। অনৃতম্- অযথাদৃষ্টভাষণম্।[আনন্দগিরিঃ]। কুহক অর্থ—পরকে বঞ্চনা করা। মায়া অর্থ—মনে একরকম ভাব রাখিয়া বাহিরে তাহার অন্যরকম প্রকাশ করা। শাঠ্য—সম্পদের অনুরূপ দান না করা। অহঙ্কার— মিথ্যা অভিমান। দম্ভ—ধর্ম্মের চিহ্ন ধারণমাত্রে ধার্ম্মিক বলিয়া পরিচয় দেওয়া। অনৃত—অনুভবের বিপরীত—মিথ্যা কথা বলা।

১৩

৯৮ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

দর্শনক্ষম চেতন পদার্থে তিনি এই শরীরেই—গুহাতে—হৃৎপদ্মে নিহিত আছেন ॥ ৫৩॥ ৭॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

কিংতৎ কিংধৰ্ম্মকং তৎ? ইত্যুচ্যতে-বৃহচ্চ তন্মহচ্চ তৎ প্রকৃতং ব্রহ্ম সত্যাদি- সাধনেন সর্ব্বতো ব্যাপ্তত্বাৎ। দিব্যং স্বয়ম্প্রভমনিন্দ্রিয়গোচরম্, অতএব ন চিন্তয়িতুং শক্যতেহস্য রূপমিত্যচিন্ত্যরূপম্। সূক্ষ্মাদাকাশাদেরপি তৎ সূক্ষ্মতরং, নিরতিশয়ং হি সৌক্ষমস্য সর্ব্বকারণত্বাৎ, বিভাতি বিবিধমাদিত্য-চন্দ্রাদ্যাকারেণ ভাতি দীপ্যতে। কিঞ্চ, দূরাৎ বিপ্রকৃষ্টদেশাৎ সুদূরে বিপ্রকৃষ্টতরে দেশে বর্ত্ততে অবিদুষামত্যন্তা- গম্যত্বাৎ তদ্ব্রহ্ম। ইহ দেহেহন্তিকে সমীপে চ, বিদুষামাত্মত্বাৎ। সর্ব্বান্তরত্বাচ্চাকাশ- স্যাপ্যন্তরশ্রুতেঃ। ইহ পশ্যৎসু চেতনাবৎস্বিত্যেতৎ, নিহিতং স্থিতং দর্শনাদিক্রিয়া- বত্ত্বেন যোগিভিলক্ষ্যমাণম্। ক? গুহায়াং বুদ্ধিলক্ষণায়াম্। তত্র হি নিগূঢ়ং লক্ষ্যতে বিদ্বত্তিঃ, তথাপ্যবিদ্যয়া সংবৃতং সৎ ন লক্ষ্যতে তত্রস্থমেবাবিদ্বদ্ভিঃ ॥ ৫৩ ॥ ৭ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

তিনি কে এবং তাঁহার ধর্ম্ম কি? তাহা এখন কথিত হইতেছে— প্রস্তাবিত ব্রহ্ম বস্তুটি সত্য প্রভৃতি ধর্ম্মে পরিব্যাপ্ত; এই কারণে তিনি বৃহৎ—মহৎ, দিব্য—স্বপ্রকাশ—ইন্দ্রিয়ের অগোচর, এই জন্যই তাঁহার রূপ চিন্তা করিতে পারা যায় না; তজ্জন্য তিনি অচিন্ত্যরূপ, সূক্ষ্ম আকাশাদি অপেক্ষাও তিনি সূক্ষ্মতর, অর্থাৎ স্থূলসূক্ষ্ম সর্ববস্তুরই কারণ; এই নিমিত্ত তাঁহার সূক্ষ্মতা সর্বাপেক্ষা অধিক। এইরূপে তিনি প্রকাশ পাইতেছেন—আদিত্য-চন্দ্রাদির আকারে নানাভাবে দীপ্তি পাইতেছেন। আরও, সেই ব্রহ্ম বিদ্যাহীনদিগের পক্ষে সর্বতোভাবে অগম্য; এই জন্য দূর হইতেও অর্থাৎ ব্যবহিত দেশ হইতেও দূরে ব্যব- হিত দেশে বর্তমান। অথচ সমীপে—এই দেহেও বর্তমান; কেন না, তিনি জ্ঞানিগণের আত্মস্বরূপ;[আত্মা অপেক্ষা নিকটে আর কেহ নাই] এবং সর্ববস্তুর অন্তরস্থ কারণ; শ্রুতিতে তাঁহাকে আকাশের ও অন্তরস্থ বলা আছে। ইহ লোকে পশ্যৎ অর্থাৎ চৈতন্যসম্পন্ন বস্তুতে নিহিত—স্থিত; অর্থাৎ যোগিজন কর্তৃক দর্শনাদি ক্রিয়া-বিশিষ্টরূপে

খণ্ডঃ।] তৃতীয়-মুণ্ডকম্। ৯৯

লক্ষিত হন; কোথায়? না--গুহায়—বুদ্ধিতে। কারণ, জ্ঞানিগণ সেখানেই নিগূঢ় বলিয়া অনুভব করিয়া থাকেন; কিন্তু, তথাপি অবিদ্যায় আবৃত থাকায়, তিনি সেখানে থাকিলেও অজ্ঞ লোকেরা তাঁহাকে দেখিতে পায় না ॥৫৩॥৭৷৷

ন চক্ষুষা গৃহ্যতে নাপি বাচা নান্যৈর্দ্দেবস্তপসা কর্ম্মণা বা। জ্ঞানপ্রসাদেন বিশুদ্ধসত্ত্ব-

স্ততস্তু তং পশ্যতে নিষ্কলং ধ্যায়মানঃ ॥৫৪॥৮॥

[তৎ আত্মতত্ত্বং][রূপাদ্যভাবাং] চক্ষুষা ন গৃহ্যতে;[অনির্বাচ্যত্বাৎ। বাচা বচনেন ন(গৃহ্যতে); অন্যৈঃ দেবৈঃ(ইন্দ্রিয়ৈঃ) ন[গৃহ্যতে],; তপসা (তপশ্চরণেন) কৰ্ম্মণা(অগ্নিহোত্রাদিনা) বা(অপি)[ন গৃহ্যতে];[তর্হি কেন গৃহ্যতে? ইত্যাহ]-[আদৌ] জ্ঞান-প্রসাদেন(রাগাদি-মলাপনয়নাৎ জ্ঞানস্য বুদ্ধি- বৃত্তেঃ যঃ প্রসাদঃ নৈর্মল্যং, তেন) বিশুদ্ধসত্ত্বঃ(নিৰ্ম্মলান্তঃকরণঃ)[ভবতি]; ততঃ(তস্মাৎ অনন্তরং) ধ্যায়মানঃ(চিন্তয়ন্ সন্) তং(প্রকৃতং) নিষ্কলং(নিরবয়বম্ আত্মানং) পশ্যতে(পশ্যতি সাক্ষাৎকরোতি ইত্যর্থঃ)।

রূপ না থাকায় সেই আত্মাকে চক্ষু দ্বারা গ্রহণ করা যায় না, অনির্বচনীয় বলিয়া বাক্য দ্বারা গ্রহণ করা যায় না; অপর ইন্দ্রিয়সমূহ দ্বারাও গ্রহণ করা যায়:না; এবং তপস্যা কিংবা অগ্নিহোত্রাদি কৰ্ম্ম দ্বারাও গ্রহণ করিতে পারা যায় না। পরন্তু জ্ঞানের প্রসন্নতা দ্বারা বিশুদ্ধচিত্ত হয়, তাহার পর ধ্যান করিতে করিতে সেই নিষ্কল আত্মাকে দর্শন করিয়া থাকে ॥ ৫৪॥৮৷৷

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

পুনরপি অসাধারণেহপি অসাধারণং তদুপলব্ধিসাধনমুচ্যতে যস্মাৎ ন চক্ষুষা গৃহ্যতে কেনচিদপি অরূপত্বাৎ নাপি গৃহ্যতে বাচা অনভিধেয়ত্বাৎ, ন চান্যৈৰ্দ্দেবৈঃ ইতরৈঃ ইন্দ্রিয়ৈঃ। তপসঃ সর্ব্বপ্রাপ্তিসাধনত্বেইপি ন তপসা গৃহ্যতে। তথা বৈদিকেন অগ্নিহোত্রাদি কৰ্ম্মণা প্রসিদ্ধমহত্ত্বেনাপি ন গৃহ্যতে। কিং পুনস্তস্য গ্রহণসাধন- মিত্যাহ;--জ্ঞান প্রসাদেন আত্মাববোধনসমর্থমপি স্বভাবেন সর্ব্বপ্রাণিনাং জ্ঞানং

১০০ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

বাহ্যবিষয়রাগাদিদোষ-কলুষিতম্ অপ্রসন্নম্ অশুদ্ধং সৎঃনাববোধয়তি নিত্যসন্নিহিত- মপি আত্মতত্ত্বং, মলাবনদ্ধমিবাদর্শং, বিলুলিতমিব সলিলম্। তদ্যদা ইন্দ্রিয়বিষয়- সংসর্গজনিতরাগাদিমলকালুষ্যাপনয়নাৎ আদর্শসলিলাদিবৎ প্রসাদিতং স্বচ্ছং শান্তম্ অবতিষ্ঠতে, তদা জ্ঞানস্য প্রসাদঃ স্যাৎ। তেন জ্ঞানপ্রসাদেন বিশুদ্ধসত্ত্বঃ বিশুদ্ধান্তঃকরণো যোগ্যো ব্রহ্ম দ্রষ্টং যস্মাৎ, ততঃ তস্মাত্তু তমাত্মানং পশ্যতে পশ্যতি উপলভতে নিষ্কলং সর্ব্বাবয়বভেদবজ্জিতং ধ্যায়মানঃ সত্যাদিসাধনবান্ উপসংহৃতকরণ একাগ্রেণ মনসা ধ্যায়মানঃ চিন্তয়ন্। ৫৮৷৷৮

ভাষ্যানুবাদ।

পুনর্ব্বার তাঁহার উপলব্ধির অসাধারণ সাধনের মধ্যেও আবার অসাধারণ:(বিশেষ) সাধন বলিতেছেন। যে হেতু রূপ নাথাকায় কেহই তাঁহাকে চক্ষু দ্বারা গ্রহণ করিতে পারে না; অনির্বচনীয়তা হেতু বাক্য দ্বারাও গ্রহণ করিতে পারে না; অপর ইন্দ্রিয়সমূহ দ্বারাও নহে। তপস্যা সর্ব-প্রাপ্তির সাধন হইলেও সেই তপস্যা দ্বারা গ্রহণ করা যায় না। সেইরূপ প্রসিদ্ধ মহিমান্বিত বেদোক্ত অগ্নিহোত্রাদি কৰ্ম্ম দ্বারাও গ্রহণ করা যায় না। ভাল, তাহাকে গ্রহণ করার উপায় কি? এই আকাঙ্ক্ষায় বলিতেছেন-জ্ঞানপ্রসাদ দ্বারা, অভিপ্রায় এই যে, সমস্ত প্রাণীর জ্ঞানই স্বভাবতঃ আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করিতে সমর্থ; কিন্তু, তাহা হইলেও জাগতিক বিষয়ে আসক্তি-প্রভৃতি দোষ বশতঃ মলিন দর্পণের ন্যায় এবং কলুষিত জলের ন্যায় অপ্রসন্ন হইয়া পড়ে; তাহার ফলে নিত্যসন্নিহিত আত্মাকেও উপলব্ধি করিতে সমর্থ হয় না। আদর্শ ও সলিলের ন্যায় সেই জ্ঞান আবার যখন বিষয়েন্দ্রিয় সম্বন্ধ-জনিত রাগাদি মলোৎপন্ন কলুষতা শূন্য হইয়া প্রসন্ন, নির্মূল ও শান্ত ভাবে অবস্থান করে, তখনই জ্ঞানের প্রসন্নতা হয়। যেহেতু সেই জ্ঞান-প্রসাদ দ্বারা বিশুদ্ধচিত্ত পুরুষই ব্রহ্ম দর্শন করিতে উপযুক্ত, সেই হেতু ধ্যায়মান হইয়া অর্থাৎ[পূর্ব্বোক্ত] সত্যাদি সাধন-সম্পন্ন, সংযতেন্দ্রিয় হইয়া একাগ্র মনে ধ্যান-চিন্তা করতঃ

খণ্ডঃ।] তৃতীয়-মুণ্ডকম্। ১০১

নিষ্কাম অর্থাৎ সর্বপ্রকার অবয়ব-ভেদ-রহিত সেই আত্মাকে দর্শন করে, অর্থাৎ উপলব্ধি করিয়া থাকে ॥৫৪॥৮৷৷

এষোহণুরাত্মা চেতসা বেদিতব্যো যস্মিন্ প্রাণঃ পঞ্চধা সংবিবেশ। প্রাণৈশ্চিত্তং সর্বমোতং প্রজানাং যস্মিন্ বিশুদ্ধে বিভবত্যেষ আত্মা ॥৫৫॥৯৷৷

প্রাণঃ(বায়ুঃ) যস্মিন্(শরীরে) পঞ্চধা(প্রাণাপানাদিরূপেণ) সংবিবেশ (সম্যক্ প্রবিষ্টঃ)[অস্তি][তস্মিন্ শরীরে] এষঃ অণুঃ(সূক্ষ্মঃ দুজ্ঞেয়ঃ) আত্মা চেতসা(বিশুদ্ধেন জ্ঞানেন) বেদিতব্যঃ(জ্ঞাতব্যঃ)। প্রজানাং(জনানাং) সর্ব্বং চিত্তং(অন্তঃকরণং) প্রাণৈঃ(ইন্দ্রিয়ৈঃ সহ)[তেন চেতসা] ততং(ব্যাপ্তং) [অস্তি]। যস্মিন্ চ(চিত্তে) বিশুদ্ধে(নিৰ্ম্মলে সতি) এষঃ(প্রকৃতঃ আত্মা) বিভবতি(আত্মানং প্রকাশয়তি) ॥

প্রাণবায়ু প্রাণাপানাদি পঞ্চপ্রকারে বিভক্ত হইয়া যে শরীরে সম্যরূপে প্রবিষ্ট আছে, সেই শরীরেই উক্ত সূক্ষ্ম আত্মাকে জ্ঞানের দ্বারা জানিতে হইবে। প্রাণিগণের সমস্ত অন্তঃকরণ ইন্দ্রিয়বর্গের সহিত সেই চেতনা দ্বারা পরিব্যাপ্ত রহিয়াছে; সেই অন্তঃকরণ বিশুদ্ধ হইলেই উক্ত আত্মা আপনার স্বরূপ প্রকাশ করেন ॥৫৫৷৯৷৷

শঙ্কর-ভাষাম্।

যমাত্মানম্ এবং পশ্যতি এষোহণুঃ সূক্ষ্মঃ আত্মা চেতসা বিশুদ্ধজ্ঞানেন কেবলেন বেদিতব্যঃ। কাসৌ? যস্মিন্ শরীরে প্রাণো বায়ুঃ পঞ্চধা প্রাণাপানাদিভেদেন সংবিবেশ সম্যক্ প্রবিষ্টঃ, তস্মিন্নেব শরীরে হৃদয়ে চেতসা জ্ঞেয় ইত্যর্থঃ। কীদৃশেন চেতসা বেদিতব্যঃ? ইত্যাহ-প্রাণৈঃ সহেন্দ্রিয়ৈঃ চিত্তং সর্ব্বমন্তঃকরণং প্রজা- নাম্ ওতং ব্যাপ্তং যেন ক্ষীরমিব স্নেহেন, কাষ্ঠমিব চাগ্নিনা। সর্ব্বং হি প্রজানামন্তঃ- করণং চেতনাবৎ প্রসিদ্ধং লোকে। যস্মিংশ্চ চিত্তে ক্লেশাদিমলবিযুক্তে শুদ্ধে বিভবতি এষ উক্ত আত্মা বিশেষেণ স্বেনাত্মনা বিভবতি আত্মানং প্রকাশয়- তীত্যর্থঃ ॥৫৫৷৷৯৷৷

১০২ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ প্রথমঃ

ভাষ্যানুবাদ।

পূর্বকথিত প্রণালীতে যিনি আত্মাকে দর্শন করিয়া থাকেন, তিনি অণু-সূক্ষম; চেতস্ অর্থাৎ কেবলই বিশুদ্ধ জ্ঞানের দ্বারা তাঁহাকে জানিতে হয়। প্রাণবায়ু পঞ্চধা অর্থাৎ প্রাণ অপানাদি বিভিন্নাকারে যে শরীরে সম্যরূপে প্রবিষ্ট আছে, সেই শরীরেই, হৃদয়মধ্যে জ্ঞানের দ্বারা জানিতে হইবে। কিরূপ জ্ঞানের দ্বারা জানিতে হইবে, তাহা বলিতেছেন-স্নেহ-নবনীত দ্বারা ক্ষীর যেরূপ, এবং অগ্নি দ্বারা কাষ্ঠ যেরূপ, সেইরূপ প্রজাগণের সমস্ত চিত্ত অর্থাৎ অন্তঃকরণ ইন্দ্রিয়- নিচয়ের সহিত যাহা দ্বারা ওত(ব্যাপ্ত) রহিয়াছে; কারণ, সংসারে প্রাণি- গণের সমস্ত অন্তঃকরণই সচেতন বলিয়া প্রসিদ্ধ। যে চিত্ত শুদ্ধ হইলে-ক্লেশাদি দোষ রহিত হইলে পর এই পূর্বকথিত আত্মা বিশেষ- রূপে স্বস্বরূপে আপনাকে প্রকাশ করেন ॥৫৫৷৯৷৷

যং যং লোকং মনসা সংবিভাতি বিশুদ্ধসত্ত্বঃ কাময়তে যাংশ কামান্। তং তং লোকং জয়তে তাংশ কামাং- স্তস্মাদাত্মজ্ঞং হ্যর্চ্চয়েদ্ভূতিকামঃ ॥৫৬৷১০॥ ইত্যথর্ববেদীয়-মুণ্ডকোপনিষদি তৃতীয় মুণ্ডকে প্রথমঃ খণ্ডঃ ॥১৷৷

[ইদানীং বিদ্যাফলমাহ]—যংযমিত্যাদিনা। বিশুসত্ত্বঃ(শুদ্ধান্তঃকরণঃ আত্মজ্ঞঃ) মনসা যং যং লোকং(স্বর্গাদিকং) সংবিভাতি(সংকল্পয়তি, স্বস্মৈ পরস্মৈ বা চিন্তয়তি), যান্ কামান্(ভোগান্) চ(অপি) কাময়তে(প্রার্থয়তে);[সঃ] তং তং(স্বসংকল্পিতং) লোকং, তান্(প্রার্থিতান্) কামান্(ভোগান্) চ জয়তে (লভতে)। তস্মাৎ[হেতোঃ] ভূতিকামঃ(আত্মনঃ কল্যাণম্ ইচ্ছুঃ জনঃ) আত্মজ্ঞং(পুরুষং) অর্চ্চয়েৎ হি(পূজয়েৎ এব) ॥

বিশুদ্ধচিত্ত পুরুষ যে যে লোক(স্বর্গাদি স্থান) মনে মনে কামনা করেন,

খণ্ডঃ।] তৃতীয়-মুণ্ডকম্। ১০৩

এবং যে সমস্ত কাম্যবিষয় প্রার্থনা করেন; তিনি সেই সমস্ত লোক ও সেই সমস্ত কাম্য বিষয় জয় করেন অর্থাৎ লাভ করেন; অতএব, নিজের কল্যাণেচ্ছু ব্যক্তি আত্মজ্ঞ পুরুষকে অর্চ্চনা করিবেন ॥ ॥৫৬৷৷১০॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

য এবমুক্তলক্ষণং সর্বাত্মানমাত্মত্বেন প্রতিপন্নস্তস্য সর্ব্বাত্মত্বাদেব সর্ব্বাবাপ্তি- লক্ষণং ফলমাহ—যং যং লোকং পিত্রাদিলক্ষণং মনসা সংবিভাতি সঙ্কল্পয়তি মহ্যমন্যস্মৈ বা ভবেৎ ইতি, বিশুদ্ধসত্ত্বঃ ক্ষীণক্লেশ আত্মবিং নির্ম্মলান্তঃকরণঃ, কাময়তে যাংশ্ কামান্ প্রার্থয়তে ভোগান্, তং তং লোকং জয়তে প্রাপ্নোতি তাংশ্ কামান্ সঙ্কল্পিতান্ ভোগান্। তস্মাৎ বিদুষঃ সত্যসঙ্কল্পত্বাৎ আত্মজ্ঞম্ আত্মজ্ঞানেন বিশুদ্ধান্তঃকরণং হ্যর্চ্চয়েৎ পূজয়েৎ পাদপ্রক্ষালন-শুশ্রূষা-নমস্কারাদিভিঃ ভূতিকামো বিভূতিমিচ্ছুঃ। ততঃ পূজার্হ এবাসৌ ॥ ৫৬॥

ইতি তৃতীয়মুণ্ডকে প্রথমখণ্ডভাষ্যম্ ॥ ১ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

যিনি পূর্ব্বোক্ত প্রকারে উক্তলক্ষণ সর্বাত্মাকে আত্মস্বরূপে জানেন; তাঁহার সর্বাত্মকতা-নিবন্ধনই সর্বফলপ্রাপ্তি হয়, তাহা বলিতেছেন—বিশুদ্ধসত্ত্ব অর্থাৎ ক্ষীণক্লেশ—নির্ম্মলান্তঃকরণ আত্মজ্ঞ ব্যক্তি মনে মনে পিতৃলোক প্রভৃতি যে যে লোক সংকল্প করেন— ‘আমার(নিজের) কিংবা অপরের হউক,’ এইরূপ কামনা করেন এবং যে সমস্ত কাম—ভোগ্য বিষয় কামনা করেন—প্রার্থনা করেন; [তিনি] সেই সেই লোক জয় করেন—প্রাপ্ত হন এবং সেই সমস্ত সংকল্পিত ভোগও[প্রাপ্ত হন]। সেই হেতু—বিদ্বানের সত্য- সংকল্পত্ব হেতুই ভূতিকাম অর্থাৎ ঐশ্বর্য্য লাভেচ্ছু ব্যক্তি আত্মজ্ঞকে— আত্মজ্ঞানের দ্বারা বিশুদ্ধচিত্ত পুরুষকে—অর্চ্চনা করিবেন অর্থাৎ পাদপ্রক্ষালন, শুশ্রূষা ও নমস্কারাদি দ্বারা পূজা করিবেন ॥৪৫॥১০॥ ইতি তৃতীয় মুণ্ডকে প্রথম খণ্ড ভাষ্যানুবাদ সমাপ্ত।

তৃতীয় মুণ্ডকে

দ্বিতীয়ঃ খণ্ডঃ।

স বেদৈতৎপরমং ব্রহ্ম ধাম যত্র বিশ্বং নিহিতং ভাতি শুভ্রম্। উপাসতে পুরুষং যে হ্যকামা- স্তে শুক্রমেতদতিবর্তন্তি ধীরাঃ ॥৫৭॥১॥

সঃ(আত্মজ্ঞঃ পুরুষঃ) এতৎ(প্রসিদ্ধং) পরমং(সর্ব্বোৎকৃষ্টং) ব্রহ্ম(ব্রহ্মরূপং) ধাম(সর্ব্বজগদাশ্রয়ং). বেদ(জানাতি), যত্র(যস্মিন্ ব্রহ্মধায়ি) বিশ্বং (জগৎ) নিহিতম্(স্থাপিতম্)[অস্তি][যচ্চ] শুভ্রং(শুদ্ধং) ভাতি (স্বীয়জ্যোতিষা প্রকাশতে) অথবা, বিশ্বং যত্র নিহিতং[সৎ] ভাতি (সদ্রূপেণ) প্রকাশতে[শুভ্রম্ ইতি পদং পুরুষমিত্যস্য বিশেষণং] যে(জনাঃ) অকামাঃ(ভোগতৃষ্ণারহিতাঃ সন্তঃ)[তং] পুরুষম্(আত্মজ্ঞম্) উপাসতে (সেবন্তে) তে ধীরাঃ(ধীমন্তঃ) এতৎ(প্রসিদ্ধং) শুক্রং(শুক্র-পরিণাম-ভূতং শরীরম্) অতিবর্তন্তি(অতীত্য গচ্ছন্তি)[ন স ভূয়োহপি জায়তে ইত্যাশয়ঃ] ॥

সেই আত্মজ্ঞ পুরুষ এই সর্ব্বোৎকৃষ্ট জগদাশ্রয়ীভূত ব্রহ্মকে জানেন, যে ব্রহ্মে অবস্থিত হইয়া এই জগৎ প্রকাশ পাইতেছে, যাঁহারা নিষ্কাম হইয়া এই আত্মজ্ঞ পুরুষের উপাসনা করেন; নিশ্চয়, তাঁহারা এই শুক্রসম্ভূত শরীর অতিক্রম করিয়া থাকেন ॥ ৫৭ ॥ ১ ॥

শঙ্কর ভাষ্যম্।

যস্মাৎ স বেদ জানাতি এতৎ যথোক্তলক্ষণং ব্রহ্ম পরমং প্রকৃষ্টং ধাম সর্ব্ব- কামানাম্ আশ্রয়মাস্পদং, যত্র যস্মিন্ ব্রহ্মণি ধাম্নি বিশ্বং সমস্তং জগৎ নিহিতমর্পিতং; যচ্চ স্বেন জ্যোতিষা ভাতি শুভ্রং শুদ্ধম্। তমপি এবংবিধমাত্মজ্ঞং পুরুষং যে হি অকামা বিভূতিতৃষ্ণাবজ্জিতা মুমুক্ষরঃ সন্ত উপাসতে পরমিব দেবং, তে

খণ্ডঃ] তৃতীয়-মুণ্ডকম্। ১০৫

শুক্রং নৃবীজং যদেতৎ প্রসিদ্ধং শরীরোপাদানকারণম্ অতিবর্তন্তি অতিগচ্ছন্তি ধীরা বুদ্ধিমন্তঃ, ন পুনর্যোনিং প্রসর্পত্তি। “ন পুনঃ ক রতিং করোতি” ইতি শ্রুতেঃ। অতস্তং পূজয়েদিত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ৫৭৷১৷৷

ভাষ্যানুবাদ।

যেহেতু তিনি(আত্মজ্ঞ) পরম—উৎকৃষ্ট ধাম—সমস্ত কামনার আশ্রয় বা আস্পদ-স্বরূপ পূর্ব্বোক্ত ব্রহ্মকে জানেন, যে ব্রহ্মরূপ- আশ্রয়ে বিশ্ব অর্থাৎ এই সমস্ত জগৎ নিহিত অর্থাৎ অর্পিত[আছে], এবং শুভ্র অর্থাৎ শুদ্ধস্বরূপ যিনি স্বীয় জ্যোতিতে প্রকাশ পান। যাঁহারা অকাম অর্থাৎ ঐশ্বর্য্যস্পৃহাবর্জিত—মুমুক্ষু হইয়া এবংবিধ আত্মজ্ঞ পুরুষকেও পরম দেবতারই ন্যায় উপাসনা করেন, সেই ধীর বুদ্ধিমান্ ব্যক্তিগণ এই যে, শুক্র অর্থাৎ মনুষ্যত্বলাভের বীজভূত এই যে প্রসিদ্ধ শরীরোপাদান[শুক্র, তাহা] অতিক্রম করিয়া যান; অর্থাৎ পুন- র্ব্বার আর যোনি প্রাপ্ত হন না; কারণ, শ্রুতি বলিয়াছেন সে আর কোথাও পুনর্ব্বার রতি করে না; অতএব, সেই আত্মজ্ঞকে পূজা করিবে ৫৭॥১॥

কামান্ যঃ কাময়তে মন্যমানঃ স কামভির্জায়তে তত্র তত্র।

পর্য্যাপ্তকামস্য কৃতাত্মনস্তু

ইহৈব সর্ব্বে প্রবিলীয়ন্তি কামাঃ ॥৫৮॥২॥

যঃ(জনঃ) মন্যমানঃ(বিষয়গুণান্ চিন্তয়ন্ সন্) কামান্(দৃষ্টাদৃষ্টভোগ্যবিষয়ান্) কাময়তে(প্রার্থয়তে); সঃ(জনঃ)[তৈঃ] কামভিঃ(কামৈঃ) তত্র তত্র(যত্র যত্র কামনা ভবতি) জায়তে(উৎপদ্যতে)। পর্য্যাপ্তকামস্য(পূর্ণকামস্য) কৃতাত্মনঃ(অবিদ্যাদোষাপনয়াৎ প্রাপ্তাত্মযাথার্থ্যস্য) তু(পুনঃ) সর্ব্বে কামাঃ (প্রবৃত্তিহেতবঃ ভোগচ্ছাঃ) ইহ(অস্মিন্ জন্মনি) এব(নিশ্চয়ে) প্রবিলীয়ন্তি (প্রবিলীয়ন্তে, নশ্যন্তীত্যর্থঃ)। যে ব্যক্তি বিষয়ের গুণাবলী চিন্তা করতঃ কাম্য বিষয়সমূহ প্রার্থনা করে;

১৪

১০৬ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

সে কামনা দ্বারা[আকৃষ্ট হইয়াই যেন] সেই সকল প্রার্থিত স্থানে জন্ম লাভ করিয়া থাকে। পক্ষান্তরে, যাঁহার কামনারাশি পূর্ণ হইয়াছে, এবং আত্মায় যথার্থ রূপ প্রকটীকৃত হইয়াছে, তাঁহার সমস্ত কামনা এখানেই বিলীন হইয়া যায় ॥৫৮৷৷২৷৷

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

মুমুক্ষোঃ কামত্যাগ এব প্রধানং সাধনমিত্যেতদ্দর্শয়তি। -কামান্ যো দৃষ্টাদৃষ্টেষ্টবিষয়ান্ কাময়তে মন্যমান: তদ্‌গুণাংশ্চিন্তয়ানঃ প্রার্থয়তে, স তৈঃ কামভিঃ কামৈঃ ধৰ্মাধৰ্ম্মপ্রবৃত্তিহেতুভিঃ বিষয়েচ্ছারূপৈঃ সহ জায়তে তত্র তত্র; যত্র যত্র বিষয়প্রাপ্তিনিমিত্তং কামাঃ কৰ্ম্মসু পুরুষং নিয়োজয়ন্তি, তত্র তত্র তেষু তেষু বিষয়েষু তৈরেব কামৈর্ব্বেষ্টিতো জায়তে। যস্ত পরমার্থতত্ত্ববিজ্ঞানাৎ পর্যাপ্তকাম আত্মকামত্বেন পরি সমন্ততঃ আপ্তাঃ কামা যস্য, তস্য পর্য্যাপ্তকামস্য কৃতাত্মনঃ অবিদ্যালক্ষণাৎ অপররূপাৎ অপনীয় স্বেন পরেণ রূপেণ কৃত আত্মা বিদ্যয়া যস্য তস্য কৃতাত্মনস্ত ইহৈব তিষ্ঠত্যেব শরীরে সর্ব্বে ধর্মাধৰ্ম্মপ্রবৃত্তিহেতবঃ প্রবিলীয়স্তি প্রবিলীয়ন্তে বিলয়মুপযান্তি নশ্যন্তীত্যর্থঃ। কামাঃ তজ্জন্ম-হেতুবিনাশাৎ ন জায়ন্ত ইত্যভিপ্রায়ঃ ॥ ৫৮৷২

ভাষ্যানুবাদ।

মুমুক্ষু পক্ষে কামনা ত্যাগই যে প্রধান সাধন, এখন তাহা প্রদর্শন করিতেছেন-যে ব্যক্তি কামসমূহ-ঐহিক ও পারত্রিক অভীষ্ট বিষয় সমূহ মনে করিয়া অর্থাৎ সেই সকল বিষয়ের গুণ স্মরণ করিয়া কামনা করে-পাইতে প্রার্থনা করে, সেই ব্যক্তি, সেই সকল কামনার সহিত ধৰ্ম্ম ও অধর্ম্মে প্রবৃত্তির হেতুভূত বিষয়-বাসনার সহিত সেই সেই স্থানে জন্মলাভ করে; বিষয়প্রাপ্তির নিমিত্তভূত কামনাসমূহ পুরুষকে যে সকল কর্ম্মে নিয়োজিত করে, সেই সকল কামনায় পরিবেষ্টিত হইয়াই যেন সেই সমস্ত বিষয়ে জন্ম লাভ করিয়া থাকে। কিন্তু, যে ব্যক্তি প্রকৃত সত্য পদার্থ পরিজ্ঞাত হওয়ায় পর্যাপ্তকাম, অর্থাৎ একমাত্র আত্মবিষয়েই কামনা থাকায় যাহার সর্বদিকে (সর্ববিষয়ক) কামনাসমূহের প্রাপ্তি হইয়াছে, তিনিই পর্যাপ্তকাম

খণ্ডঃ] তৃতীয়-মুণ্ডকম্। ১০৭

সেই পর্যাপ্তকাম কৃতাত্মার অর্থাৎ অবিদ্যাবশে আত্মা যেন অন্য রকমই হইয়া গিয়াছে যে, এখন বিদ্যা দ্বারা সেই রূপান্তরীভাব হইতে অপসারিত করিয়া, আত্মাকে যিনি স্বরূপাবস্থাপন্ন করিয়াছেন, তিনিই কৃতাত্মা; তাঁহার ধর্ম্মাধর্ম-প্রবৃত্তির হেতুভূত সমস্ত কামনা এই শরীর সত্তেই বিলয় প্রাপ্ত হয়—বিনষ্ট হইয়া যায়। অভিপ্রায় এই যে, জীবের জন্মহেতু সমস্ত বিনষ্ট হইয়া যাওয়ায়, কামনাসমূহ পুনর্ব্বার আর জন্মে না ॥৫৮৷৷২॥

নায়মাত্মা প্রবচনেন লভ্যো ন মেধয়া ন বহুনা শ্রুতেন। ন মেধয়া ন বহুনা শ্রুতেন। যমেবৈষ বৃণুতে তেন লভ্য-

তস্যৈব আজ্ঞা। বিবৃণুতে তনুং স্বাম্ ॥৫৯॥৩

অয়ং(প্রকৃতঃ আত্মা) প্রবচনেন শাস্ত্রব্যাখ্যানবাহুল্যেন) লভ্যঃ(প্রাপ্তি- যোগ্যঃ) ন[ভবতি]। মেধয়া(শাস্ত্রার্থধারণ শক্ত্যা) ন[লভ্যঃ ভবতি]; বহুনা (ভূয়সা) শ্রুতেন(গুরুমুখাৎ শ্রবণেন)[চ] ন[লভ্যঃ ভবতি]।[তর্হি কথং লভ্যঃ? ইত্যাহ]-এষঃ(উপাসকঃ) যম্ এব(পরমাত্মানং) বৃণুতে(প্রাপ্তমিচ্ছতি) তেন(বরণেন) লভ্যঃ[পরমাত্মা ইতি শেষঃ]। অথবা, এষঃ(উপাসকঃ) (যদেব) বৃণুতে(পরমাত্মানং প্রাপ্তু মিচ্ছতি),[‘যম্’ ইতি ক্রিয়াবিশেষণত্বেহপি পুংস্বং ছান্দসম্]। তেন(বরণেন)[অন্যৎ সমানম্]। আত্মা তস্মৈ(সাধকায়) স্বাং(স্বীয়াং) তনুং(স্বরূপং) বিবৃণুতে(প্রকাশয়তীত্যর্থঃ) ॥

এই আত্মাকে কেবল প্রবচন বা শাস্ত্রব্যাখ্যা দ্বারা লাভ করা যায় না; মেধা দ্বারা নহে; এবং বহুবিধ শাস্ত্রাধ্যয়ন দ্বারাও লাভ করা যায় না; পরন্তু এই উপাসক যে পরমাত্মাকে বরণ করেন, সেই বরণ দ্বারাই তাঁহাকে লাভ করা যায়। অথবা, এই উপাসক যে, তাঁহাকে বরণ করেন, সেই বরণদ্বারা অর্থাৎ তাঁহাকে পাইবার জন্য যে, তীব্র বাসনা, তাহা দ্বারাই লাভ করা যায়। এই আত্মা তাহার উদ্দেশে আপনার স্বরূপ প্রকাশ করিয়া থাকেন ॥৫৯৷৷৩৷৷

১০৮ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

যদ্যেবং সর্ব্বলাভাৎ পরম আত্মলাভঃ,তল্লাভায় প্রবচনাদয় উপায়া বাহু- ল্যেন কর্তব্যি ইতি প্রাপ্তে ইদমুচ্যতে—যোহয়মাত্মা ব্যাখ্যাতঃ, যস্য লাভঃ পরঃ পুরুষার্থঃ, নাসৌ বেদ-শাস্ত্রাধ্যয়নবাহুল্যেনা প্রবচনেন লভ্যঃ। তথা ন মেধয়া গ্রন্থার্থধারণশক্ত্যা ন বহুনা শ্রুতেন—নাপি ভূয়সা শ্রবণেনেত্যর্থঃ। কেন তহি লভ্য ইতি? উচ্যতে,—যমেব পরমাত্ম নম্ এষঃ বিদ্বান্ বৃণুতে প্রাপ্ত- মিচ্ছতি, তেন বরণেন এষঃ পরমাত্মা লভ্যঃ, নান্যেন সাধনান্তরেণ,—নিত্য- লব্ধস্বভাবত্বাৎ। কীদৃশোহসৌ বিদুষ আত্মলাভ ইতি উচ্যতে,—তস্যৈষ আত্মা অবিদ্যাসংচ্ছন্নাং স্বাং পরাং তনুং স্বাত্মতত্ত্বং স্বরূপং বিবৃণুতে প্রকাশয়তি, প্রকাশ ইব ঘটাদিব্বিদ্যায়াং সত্যামাবির্ভবতীত্যর্থঃ। তস্মাদন্যত্যাগেন আত্ম-প্রার্থনৈব আত্ম-লাভ-সাধনমিত্যর্থঃ ॥ ৫৯৷৷৩৷৷

ভাষ্যানুবাদ।

ভাল, এইরূপে সর্বলাভ যদি সর্বোত্তম আত্মলাভ হয়,[তাহা হইলে] তাহার লাভের জন্য প্রভূত-পরিমাণে প্রবন্ধনাদি উপায় অবলম্বন করা আবশ্যক, এইরূপ সিদ্ধান্ত-সম্ভাবনায় বলিতেছেন;- যে আত্মা বর্ণিত হইল, এবং যাহার লাভই পরম পুরুষার্থ, এই আত্মা বহুপরিমাণে বেদশাস্ত্রের অধ্যয়নাত্মক প্রবচন দ্বারা লাভ-যোগ্য নহে; সেইরূপ[কেবল] মেধা দ্বারা অর্থাৎ গ্রন্থার্থের ধারণাশক্তি দ্বারাও নহে; এবং বহু শ্রুত দ্বারা অর্থাৎ প্রভূত পরিমাণে শাস্ত্র শ্রবণ দ্বারাও নহে[লাভযোগ্য হয় না]। তাহা হইলে, কিসের দ্বারা লভ্য? তাহা কথিত হইতেছে-এই বিদ্বান্ পুরুষ নিশ্চয়রূপে যাহাকে বরণ করেন-পাইতে ইচ্ছা করেন, এই পরমাত্মা সেই বরণ দ্বারাই লাভযোগ্য হন;-অপর সাধন দ্বারা নহে; কারণ তাঁহার স্বরূপ সর্বদাই লব্ধ আছে। বিদ্বানের এই আত্ম-লাভটি কি প্রকার? তাহা কথিত হইতেছে-এই আত্মা অবিদ্যা-সমাচ্ছন্ন স্বীয় উৎকৃষ্ট তনকে অর্থাৎ স্বীয় আত্মতত্ত্ব-স্বরূপটিকে তাহার নিকট বিবৃত করেন-প্রকাশ করেন, অর্থাৎ আলোকে ঘটাদি পদার্থের

খণ্ডঃ] তৃতীয়মুণ্ডকম্। ১০৯

ন্যায় বিদ্যা(জ্ঞান) উপস্থিত হইলেও[আত্মস্বরূপ] আবির্ভূত হয়[অনুভব-গোচর হয়]। অতএব, অপর সাধন ত্যাগ পূর্ব্বক আত্ম-প্রার্থনাই আত্ম-লাভের সাধন, ইহাই ইহার তাৎপর্য্য ॥৫৯৷৩৷৷

নায়মাত্মা বলহীনেন লভ্যো ন চ প্রমাদাৎ তপসো বাপ্যলিঙ্গাৎ। এতৈরুপায়ৈর্যততে যস্ত বিদ্বাং- স্তস্যৈস আত্মা বিশতে ব্রহ্মধাম ॥৬০॥৪॥

[ইদানীম্ অন্যান্যপি তৎসহকৃতানি সাধনানি বক্ত মুপক্রমতে]-নায়মিত্যাদিনা। অয়ং(বর্ণিতঃ) আত্মা বলহীনেন(আত্ম-নিষ্ঠাজনিত-বলরহিতেন) ন লভ্যঃ; প্রমাদাৎ(আত্মনিষ্ঠায়ামপ্রণিধানাৎ) অলিঙ্গাৎ(সন্ন্যাসরহিতাৎ কেবলাৎ) তপসঃ(জ্ঞানাৎ)[যদ্বা,] অলিঙ্গাৎ(বৈরাগ্যাৎ) তপসঃ(কায়ক্লেশমাত্রাৎ) চ(অপি) ন[লভ্যঃ]; যঃ বিদ্বান্(বিবেকী) তু(পুনঃ) এতৈঃ(উক্তৈঃ বল-প্রমাদরাহিত্য-সসন্ন্যাস-জ্ঞানৈঃ) উপায়ৈঃ(সাধনৈঃ) যততে(তৎপরঃ সন্ প্রার্থয়তে); তস্য(বিদুষঃ) এষঃ আত্মা ব্রহ্মধাম(সর্ব্বাশ্রয়ভূতং ব্রহ্ম) বিশতে(প্রবিশতি) ॥

এই আত্মা বলহীন কর্তৃক লভ্য হয় না, এবং আত্মনিষ্ঠায় অমনোযোগ কিংবা সংন্যাস-রহিত তপস্যা(জ্ঞান বা কায়ক্লেশ) হইতেও[ইহার লাভ হয়] না। পরন্তু, যে বিদ্বান্ এই সকল উপায়ে(বল, অপ্রমাদ ও সংন্যাস-সহকৃত তপস্যা দ্বারা) যত্নপর হন, তাঁহার আত্মাই এই ব্রহ্মরূপ আশ্রয়ে প্রবেশ করিয়া থাকে ॥৬০॥৪॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

আত্মপ্রার্থনাসহায়ভূতান্যেতানি চ সাধনানি বলা-প্রমাদ-তপাংসি লিঙ্গযুক্তানি সন্ন্যাস-সহিতানি। যস্মাৎ ন অয়মাত্মা বলহীনেন বলপ্রহীণেন, আত্মনিষ্ঠাজনিত-বীর্য্য- হীনেন লভ্যঃ; নাপি লৌকিকপুত্রপশ্বাদিবিষয়াসঙ্গনিমিত্তাৎ প্রমাদাৎ, তথা তপসো বাপি অলিঙ্গাৎ লিঙ্গরহিতাৎ। তপোহত্র জ্ঞানম্; লিঙ্গং সন্ন্যাসঃ; সন্ন্যাস- রহিতাৎ জ্ঞানাৎ ন লভ্যত ইত্যর্থঃ। এতৈঃ উপায়ৈঃ বলা প্রমাদ-সন্ন্যাসজ্ঞানৈর্যততে

১১০ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

তৎপরঃ সন্, প্রযততে। যস্ত বিদ্বান্ বিবেকী আত্মবিৎ, তস্য বিদুষঃ এষ আত্মা বিশতে সম্প্রবিশতি ব্রহ্মধাম ॥৬০॥৪ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

বল, অপ্রমাদ ও লিঙ্গযুক্ত অর্থাৎ সন্ন্যাস-সহিত তপস্যা, এ সমস্তও আত্মপ্রার্থনার সহায়ভূত সাধন। যে হেতু, এই আত্মা বলহীন কর্তৃক অর্থাৎ আত্ম-নিষ্ঠাসমুৎপাদিত শক্তিহীন কর্তৃক লভ্য নহে; আর ঐহিক পুত্র, পশু প্রভৃতি বিষয়ে আসক্তিজনিত প্রমাদ (অনবধানতা) দ্বারাও লভ্য নহে; সেই অলিঙ্গ—তপস্যা চিহ্ন-রহিত তপস্যা হইতেও[লভ্য] নহে। এখানে তপঃঅর্থ—জ্ঞান; ‘লিঙ্গ’ অর্থ—সন্ন্যাস; অর্থাৎ সন্ন্যাস-রহিত জ্ঞান হইতে লভ্য করা যায় না। কিন্তু যে বিদ্বান্—বিবেকজ্ঞানসম্পন্ন আত্মবিৎ ব্যক্তি তৎপর হইয়া এই সকল বল, অপ্রমাদ ও সন্ন্যাস-সহিত জ্ঞানরূপ উপায় দ্বারা[লাভ করিতে] যত্ন করেন; সেই বিদ্বানের আত্মা ব্রহ্মরূপ আশ্রয়ে সম্যক্ প্রবেশ লাভ করেন ॥৬০॥৪॥

সংপ্রাপ্যৈনমৃষয়ো জ্ঞানতৃপ্তাঃ

কৃতাত্মানো বীতরাগাঃ প্রশান্তাঃ।

তে সর্ব্বগং সর্ব্বতঃ প্রাপ্য ধীরা যুক্তাত্মানঃ সর্ব্বমেবাবিশন্তি ॥৬১॥৫॥

[ব্রহ্মপ্রবেশস্বরূপমাহ]—সংপ্রাপ্যেতি। ঋষয়ঃ(দর্শনবন্তঃ) এনং (পরমাত্মানং) সংপ্রাপ্য(সম্যক্ জ্ঞাত্বা) জ্ঞানতৃপ্তাঃ(তেনৈব জ্ঞানেন তৃপ্তি- মাপন্নাঃ) কৃতাত্মানঃ(লব্ধাত্মস্বরূপাঃ সন্তঃ) বীতরাগাঃ(বিষয়স্পৃহাশূন্যাঃ) প্রশান্তাঃ(সংযতেন্দ্রিয়বৃত্তয়ঃ)[চ ভবন্তি]। তে ধীরাঃ(বিবেকিনঃ) সর্ব্বগং (সর্ব্বব্যাপিনম্ আত্মানং) সর্ব্বতঃ প্রাপ্য(লব্ধা, আত্মনঃ সংসারিত্ব-দেহিত্বাদি- পরিচ্ছেদম্ অপনীয়) যুক্তাত্মানঃ(নিত্যসমাহিতাঃ সন্তঃ) সর্ব্বং(সর্ব্বাত্মকং ব্রহ্ম) আবিশন্তি(প্রবিশন্তি)।

দর্শন-শক্তিসম্পন্ন ঋষিগণ এই পরমাত্মাকে অবগত হইয়া, সেই আত্মদর্শনে

[অঃ] তৃতীয়মুণ্ডকম্। ১১১

পরিতৃপ্ত হইয়া, বিষয়স্পৃহাহীন শান্তস্বভাব হইয়া থাকেন। সেই ধীরগণ সর্ব্বতো- ভাবে সর্ব্বগতকে(ব্রহ্মত্বভাবকে) প্রাপ্ত হইয়া সর্ব্বদা সমাহিত-ভাবে থাকিয়া সর্ব্বেতেই প্রবিষ্ট হন ॥৬১৷৷৫৷৷

শঙ্করভাষ্যম্।

কথং ব্রহ্ম বিশত ইতি উচ্যতে-সম্প্রাপ্য সমবগম্য এনম্ আত্মানম্ ঋষয়ো দর্শনবন্তঃ তেনৈব জ্ঞানেন তৃপ্তাঃ, ন বাহ্যেন তৃপ্তিসাধনেন শরীরোপচয়কারণেন। কৃতাত্মানঃ পরমাত্মস্বরূপেণৈব নিষ্পন্নাত্মানঃ সন্তঃ। বীতরাগা বিগতরাগাদিদোষাঃ। প্রশান্তা উপরতেন্দ্রিয়াঃ। তে এবস্তৃতাঃ সর্ব্বগং সর্বব্যাপিনম আকাশবৎ সর্ব্বতঃ সর্ব্বত্র প্রাপ্য, নোপাধিপরিচ্ছিন্নেন একদেশেন; কিং তর্হি তত্ত্বহ্মৈব অদ্বয়ম্ আত্মত্বেন প্রতিপদ্য ধীরা অত্যন্তবিবেকিনো যুক্তাত্মানো নিত্যসমাহিতস্বভাবাঃ সর্বমেব সমস্তং শরীরপাতকালেহপি আবিশন্তি ভিন্নঘটাকাশবৎ অবিদ্যাকৃতোপাধি- পরিচ্ছেদং জহতি। এবং ব্রহ্মবিদো ব্রহ্মধাম প্রবিশন্তি ॥ ৬১ ॥৫৷৷

ভাষ্যানুবাদ।

কিরূপে সর্বভাবে প্রবেশ করেন; তাহা কথিত হইতেছে- ঋষিগণ অর্থাৎ প্রকৃতদর্শনশক্তি-সম্পন্ন ব্যক্তিরা এই আত্মাকে প্রাপ্ত হইয়া-সম্যরূপে অবগত হইয়া, সেই জ্ঞানেই পরিতৃপ্ত; কিন্তু শরীরের পুষ্টিসাধক তৃপ্তিকর কোনও বাহ্য বস্তু দ্বারা তৃপ্ত নহেন এবং কৃতাত্মা অর্থাৎ আপনাকে পরমাত্মভাবে নিষ্পাদিত করিয়া বীতরাগ অর্থাৎ বিষয়ানুরাগাদি দোষ-বিনির্ম্মুক্ত ও প্রশান্ত অর্থাৎ বিষয় হইতে ইন্দ্রিয়গণকে নিবৃত্ত করেন। এবস্তৃত ধীর অত্যন্তবিবেক- সম্পন্ন তাঁহারা আকাশের ন্যায় সর্ব্বগ-সর্বব্যাপী আত্মাকে সর্বত্র প্রাপ্ত হইয়া-অর্থাৎ উপাধিপরিচ্ছিন্ন দেশবিশেষে প্রাপ্ত না হইয়া; তবে কিনা-সেই অদ্বিতীয় ব্রহ্মকেই আত্মরূপে প্রাপ্ত হইয়া, সর্ব্বেই-সমস্ত(ব্রহ্মেই)[এমন কি,] শরীরপাত সময়েও প্রবেশ করিয়া থাকেন; অর্থাৎ ঘট ভগ্ন হইলে, তদ্গত আকাশের ন্যায় অবিদ্যাকৃত উপাধি-পরিচ্ছেদ(ঔপাধিক পরিচ্ছিন্নভাব) পরিত্যাগ করেন; ব্রহ্মবিদগণ এইরূপে ব্রহ্মধামে প্রবেশ করেন ॥৬১॥৫৷৷

১১১ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

বেদান্তবিজ্ঞানসুনিশ্চিতার্থাঃ সন্ন্যাসযোগাদ্ যতয়ঃ শুদ্ধসত্ত্বাঃ। তে ব্রহ্মলোকেষু পরান্তকালে পরামৃতাঃ পরিমুচ্যন্তি সর্ব্বে ॥৬২॥৬৷৷

অপিচ[যে] যতয়ঃ(যত্নপরাঃ সাধকাঃ) বেদান্ত-বিজ্ঞান-সুনিশ্চিতার্থাঃ (বেদান্তস্য বিশেষজ্ঞানেন সুষ্ঠু নিশ্চিতঃ অবধারিতঃ অর্থঃ পরমাত্মা যৈঃ, তে তথোক্তাঃ), সংন্যাসযোগাৎ(সর্ব্বকৰ্ম্মত্যাগলক্ষণ-সংন্যাসাশ্রয়ণাৎ) শুদ্ধসত্ত্বাঃ(শুদ্ধং সর্ব্বদোষবিনির্ম্মুক্তং সত্ত্বম্ অন্তঃকরণং যেষাং তে তথোক্তাঃ) [ভবন্তি]। তে সর্ব্বে(যতয়ঃ) পরামৃতাঃ(জীবদবস্থায়ামের পরমাত্মভূতাঃ সন্তঃ) পরান্তকালে(উৎকৃষ্টদেহত্যাগকালে) ব্রহ্মলোকেষু(বহুবচনমবি- বক্ষিতং ব্রহ্মণি ইত্যর্থঃ) পরিমুচ্য্যন্তি(যত্রতত্রৈব মুচ্যন্তে, ন দেশান্তরাদিকম্ অপেক্ষন্তে ইতি ভাবঃ) ॥

যে সমস্ত যতি বেদান্তশাস্ত্র-লব্ধ জ্ঞান দ্বারা তাহার অর্থ উত্তম রূপে নিশ্চয় করিয়াছেন, এবং সব্বকর্ম্ম-পরিত্যাগরূপ সংন্যাস-যোগ দ্বারা অন্তঃকরণের বিশুদ্ধি সম্পাদন করিয়াছেন, তাঁহারা সকলে জীবদবস্থায়ই ব্রহ্মভাবাপন্ন হইয়া দেহাবসানে ব্রহ্মে বিমুক্তি লাভ করেন ॥ ৬২ ॥ ৬ ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

কিঞ্চ বেদাস্তজনিতং বিজ্ঞানং বেদান্তবিজ্ঞানং তস্যার্থঃ পরমাত্মা বিজ্ঞেয়ঃ, সোহর্থঃ সুনিশ্চিতঃ যেষাং তে বেদান্তবিজ্ঞানসুনিশ্চিতার্থাঃ। তে চ সন্ন্যাসযোগাৎ সর্ব্বকৰ্ম্ম- পরিত্যাগলক্ষণযোগাৎ কেবলব্রহ্মনিষ্ঠা-স্বরূপাৎ যোগাৎ যতয়ো যতনশীলাঃ শুদ্ধসত্ত্বাঃ শুদ্ধং সত্ত্বং যেষাং সন্ন্যাসযোগাৎ, তে শুদ্ধসত্ত্বাঃ। তে ব্রহ্মলোকেষু; সংসারিণাং যে মরণকালাস্তে অপরান্তকালাঃ; তানপেক্ষ্য মুমুক্ষূণাং সংসারাবসানে দেহপরিত্যাগকালঃ পরান্তকালঃ তস্মিন্, পরান্তকালে সাধকানাং বহুত্বাৎ ব্রহ্মৈব লোকো ব্রহ্মলোকঃ একোহপ্যনেকবৎ দৃশ্যতে প্রাপ্যতে চ। অতো বহুবচনং ব্রহ্মলোকেঘিতি, ব্রহ্মণীত্যর্থঃ। পরামৃতাঃ পরম, অমৃতম, অমরণধৰ্ম্মকং ব্রহ্ম আত্ম- ভূতং যেষাং তে পরামৃতাঃ জীবন্ত এব ব্রহ্মভূতাঃ, পরামৃতাঃ সন্তঃ পরিমুচ্যন্তি পরি সমন্তাৎ প্রদীপনির্ব্বাণবৎ ভিন্নঘটাকাশবচ্চ নিবৃত্তিমুপযান্তি পরিমুচ্যন্তি পরি সমন্তাৎ মুচ্যন্তে সর্ব্বে, ন দেশান্তরং গন্তব্যমপেক্ষন্তে।

খণ্ডঃ।] তৃতীয়-মুণ্ডকম্। ১১৩

“শকুনিনামিবাকাশে জলে বারিচরস্য চ। পদং যথা ন দৃশ্যেত তথা জ্ঞানবতাং গতিঃ।

“অনধবগা অধবসু পারয়িষ্ণবঃ”

ইতি শ্রুতিস্মৃতিভ্যাং দেশপরিচ্ছিন্না তি গতিঃ সংসারবিষয়ৈব, পরিচ্ছিন্নসাধন- সাধ্যত্বাৎ। ব্রহ্ম তু সমস্তত্বান্ন দেশপরিচ্ছেদেন গন্তব্যম্। যদি হি দেশপরিচ্ছিন্নং ব্রহ্ম স্যাৎ মূর্ত্তদ্রব্যবৎ আদ্যন্তবৎ অন্যাশ্রিতং সাবয়বম্ অনিত্যং কৃতকঞ্চ স্যাৎ। নতু এবংবিধং ব্রহ্ম ভবিতুমর্হতি; অতস্তৎপ্রাপ্তিশ্চ নৈব দেশপরিচ্ছিন্না ভবিতুং যুক্তা ॥ ৬২ ॥৬৷৷

ভাষ্যানুবাদ।

আরও, বেদান্ত হইতে যে বিশিষ্ট জ্ঞান সমুৎপন্ন হয়, তাহাই বেদান্ত-বিজ্ঞান; তাহার অর্থ-পরমাত্মার জ্ঞাতব্যতা, সেই অর্থ যাহাদের উত্তমরূপে নিশ্চিত(স্থিরীকৃত) হইয়াছে, তাঁহারাই বেদান্ত- বিজ্ঞান-সুনিশ্চিতার্থ, তাঁহারা আবার সংন্যাসযোগ হইতে-সর্ব কৰ্ম্ম-পরিত্যাগরূপ যোগ হইতে, অর্থাৎ কেবলই ব্রহ্মনিষ্ঠারূপ যোগ হইতে শুদ্ধ সত্ত্ব, অর্থাৎ সন্ন্যাস-যোগবলে যাঁহাদের অন্তঃকরণ শুদ্ধ হইয়াছে, সেই যতিগণ-যত্নশীল ব্যক্তিগণই শুদ্ধসত্ত্ব; সংসারি- গণের যে মৃত্যুকাল, তাহা অপর(নিকৃষ্ট) অন্তকাল; মুমুক্ষুগণের সংসার-সমাপ্তিতে যে, দেহাবসানকাল, তাহা[সংসারিগণের] অপরান্তকাল অপেক্ষা পর(উৎকৃষ্ট) অন্তকাল;[কারণ, ইহার পর তাঁহাদিগকে আর সংসারে আসিতে হইবে না]। সেই পরান্তকালে তাঁহারা ব্রহ্মলোকে-ব্রহ্মস্বরূপ লোক ব্রহ্মলোক; ব্রহ্মলোক এক হইলেও সাধকগণের বহুত্বনিবন্ধন বহুর মত দেখায় এবং প্রাপ্তি হয়; এই কারণে “ব্রহ্মলোক” শব্দে বহুবচন প্রদত্ত হইয়াছে। ফলতঃ উহার অর্থ-ব্রহ্মেতে; পরামৃত অর্থ-পরম অথচ মরণ-ধৰ্ম্ম-রহিত ব্রহ্ম যাঁহাদের আত্মস্বরূপ, তাঁহারাই পরামৃত অর্থাৎ জীবদবস্থায়ই ব্রহ্মভূত; তাঁহারা সকলে পরামৃত হইয়া পরিমুক্ত হন; পরি-সর্ব-

১৫

১১৪ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

স্থানে, প্রদীপের নির্ব্বাণের ন্যায় এবং ভগ্নঘটের আকাশের ন্যায় সমাপ্তি প্রাপ্ত হন—[মুক্তির জন্য আর] অপর স্থানবিশেষে গমনের অপেক্ষা করেন না। ‘আকাশে পক্ষিগণের এবং জলে জলচর প্রাণীর যেরূপ পদন্যাস দেখা যায় না, জ্ঞানবানগণের গতিও সেইরূপ।’ “[মুমুক্ষুগণ] সংসার-পথের পার পাইতে ইচ্ছুক হইয়া,—অনধ্বগ হন অর্থাৎ আর সংসার-পথে বিচরণ করেন না।” ইত্যাদি শ্রুতি ও স্মৃতি-শাস্ত্রানুসারে জানা যায় যে, কোন স্থানবিশেষে যে, সীমাবিশিষ্ট গতি, তাহা নিশ্চয়ই সংসারসম্বন্ধী; কারণ, ঐ কাল পরিচ্ছিন্ন-সাধন-সাধ্য; পরন্তু, ব্রহ্ম নিজে সববাত্মক(অপরিচ্ছিন্ন); সুতরাং কোনও নির্দিষ্ট দেশ- বিশেষ দ্বারা তাঁহাকে পাইতে পারা যায় না। আর ব্রহ্ম যদি দেশ বিশেষ দ্বারা পরিচ্ছিন্নই হইতেন, তাহা হইলে নিশ্চয়ই ব্রহ্মও অন্যান্য মূর্ত্ত(পরিচ্ছিন্ন) দ্রব্যের ন্যায়, আদি-অন্তবান্(উৎপত্তি বিনাশশীল) অপরের আশ্রিত, সাবয়ব, অনিত্য এবং কৃতক ও (ক্রিয়ানিপ্পন্ন ও) হইতেন; কিন্তু, কখনই এবস্তৃত হইতে পারেন না; সুতরাং তাঁহার প্রাপ্তিও কখনই দেশ-পরিচ্ছিন্ন হওয়া যুক্তিযুক্ত হয় না ॥৬২॥৬৷৷

গতাঃ কলাঃ পঞ্চদশ প্রতিষ্ঠা দেবাশ্চ সর্ব্বে প্রতিদেবতাসু। কর্ম্মাণি বিজ্ঞানময়শ্চ আত্মা পরেহব্যয়ে সর্ব্ব একীভবন্তি ॥৬৩॥৭॥

অপিচ,[তদানীং] পথদশ বলাঃ(দেহারম্ভকাঃ প্রাণাদ্যা অবয়বাঃ) প্রতিষ্ঠাঃ(স্বস্বকারণানি গতাঃ(পবিষ্টাঃ)। সর্ব্বে দেবাঃ(চক্ষুরাদীন্দ্রিয়া- ধিষ্ঠাতারঃ) চ(অপি) প্রতিদেবতাসু(আদিতাদিষু)[প্রবিষ্টাঃ ভবন্তি]। কর্মাণি(অনারব্ধফলানি) বিজ্ঞানময়ঃ(বুদ্ধ্যুপহিতত্বাৎ বিজ্ঞানপ্রায়ঃ) আত্মা

খণ্ডঃ।] তৃতীয়-মুণ্ডকম্। ১১৫

(জীবঃ) চ(অপি)[এতে] সর্বে পরে(সর্বোত্তমে) অব্যয়ে(ক্ষয়াদি- দোষ-রহিতে ব্রহ্মণি) একাভবন্তি(তদ্রূপতাং গচ্ছন্তি) ॥

তখন দেহারম্ভক পঞ্চদশ অংশ স্ব স্ব কারণে প্রবিষ্ট হয়, ইন্দ্রিয়াধিষ্ঠাতা দেবতা সকলও মূল দেবতা—স্থ্যপ্রভৃতিতে প্রবেশ করে।[যে সকল কর্ম্মের ফল আরব্ধ হয় নাই, সেই সকল সঞ্চিত] কর্ম্ম এবং বিজ্ঞানময় আত্মা(জীব); ইহারা সকলেও পরম অদ্যয়ে(ব্রহ্মে) এক, ভাব প্রাপ্ত হয় ॥৬৩॥ ৭॥

শাঙ্করভাষ্যম্।

অপিচ অবিদ্যাদিসংসারবন্ধাপনয়মমেব মোক্ষমিচ্ছন্তি ব্রহ্মবিদঃ নতু কার্য্যভূতম্। কিঞ্চ, মোক্ষকালে যা দেহ’রন্তিকাঃ কলাঃ প্রাণাদ্যাঃ, তাঃ স্বাঃ প্রতিষ্ঠাঃ গতাঃ স্বং স্বং কারণং গতা ভবন্তীত্যর্থঃ। প্রতিষ্ঠা ইতি দ্বিতীয়াবহুবচনম্। পঞ্চদশ পঞ্চ- দশসঙ্খ্যাকা যা অন্ত্য প্রশ্নপরিপঠিতাঃ প্রসিদ্ধাঃ দেবাশ্চ দেহাশ্রয়াঃ চক্ষুরাদিকরণস্থাঃ সর্ব্বে প্রতিদেবতাসু আদিত্যাদিষু গতা ভবন্তীত্যর্থঃ। যানি চ মুমুক্ষুণা কৃতানি কৰ্ম্মাণি অপ্রবৃত্তফলানি, প্রবৃত্তফলানামুপভোগেনৈব ক্ষীণত্বাৎ; বিজ্ঞানময়শ্চাত্মা অবিদ্যাকৃতবুদ্ধ্যাদ্যপাধিমাত্মত্বেন গত্বা জলাদিযু সূর্যাদিপ্রতিবিম্ববদিহ প্রবিষ্টো দেহভেদেষু কৰ্ম্মণাং তৎফলার্থত্বাং সহ তেনৈ। বিজ্ঞানময়েনাত্মনা; অতো বিজ্ঞানময়ো বিজ্ঞানপ্রায়ঃ। তে এতে কর্মাণি বিজ্ঞানময়শ্চাত্মা উপাধ্যপনয়ে সতি পরে অব্যয়ে অনন্তে অক্ষয়ে ব্রহ্মণি আকাশক্লে অজে অজরে অমৃতে অভয়ে অপূর্ব্বে অনপরে অনন্তের অবাহ্যে অদ্বয়ে শিবে শান্তে সর্বে একীভবন্তি অবি- শেষতাং গচ্ছন্তি একত্বমাপদ্যন্তে জলাদ্যাধারাপনয় ইব সূর্য্যাদি প্রতিবিম্বাঃ সূর্য্যে, ঘটাদ্যপনয় ইবাকাশে ঘটাদ্যাকাশাঃ ॥৬৩৷৭॥

ভাষ্যানুবাদ।

অপিচ, ব্রহ্মবিদ্গণ অবিদ্যা প্রভৃতি সংসার-বন্ধনের অপনয়নকেই মোক্ষ বলিয়া ইচ্ছা করেন; কিন্তু মোক্ষকে কার্য্য বা জন্য পদার্থ মনে করেন না। আরও এক কথা, দেহের উৎপাদক যে, প্রাণাদি কলাসমূহ(অংশ-নিচয়), মোক্ষকালে তাহারা স্বীয় প্রতিষ্ঠাসমূহকে প্রাপ্ত হয়:অর্থাৎ নিজ নিজ কারণকে প্রাপ্ত হয়। ‘প্রতিষ্ঠা’শব্দে দ্বিতীয়ার বহুবচন প্রযুক্ত হইয়াছে। পঞ্চদশ অর্থ—পঞ্চদশ(পনের)

১১৬ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

সংখ্যাযুক্ত-প্রশ্নোপনিষদের শেষ প্রশ্নে(৬ষ্ঠ প্রশ্ন, ৪র্থ শ্রুতিতে) যে গুলি পঠিত হইয়াছে। আর চক্ষু প্রভৃতি করণস্থিত দেহবর্তী সকল দেবতাও প্রতিদেবতায়-আদিত্যাদি দেবতায় গত হন। আর মুমুক্ষুকর্তৃক যে সমস্ত কৰ্ম্ম কৃত হইয়াছে, যাহারা ফল দিতে প্রবৃত্ত হয় নাই, কেননা, ফল প্রদানে প্রবৃত্ত কর্মসমূহ ত ভোগ দ্বারাই ক্ষয় প্রাপ্ত হইয়া গিয়াছে,[অতএব, অপ্রবৃত্তফল কৰ্ম্ম গ্রহণ করিতে হইবে]। আর যে বিজ্ঞানময় আত্মা, যিনি অবিদ্যা- প্রসূত বুদ্ধি প্রভৃতি উপাধিকেই ‘আত্মা’ রূপে প্রাপ্ত হইয়া, জলাদিমধ্যে সূর্যাদির প্রতিবিম্বের ন্যায় বিভিন্ন দেহে প্রবিষ্ট হয়, কৰ্ম্মসমূহ বিজ্ঞান- ময়ের সহযোগেই তাহার ফল দিয়া থাকে; এই কারণে বিজ্ঞানময় অর্থ-বিজ্ঞানপ্রচুর,(উহাতে বুদ্ধিবিজ্ঞানেরই প্রাবল্য থাকে)। অবিদ্যাকৃত উপাধি অপনীত হইলে পর সেই এই কৰ্ম্মরাশি ও বিজ্ঞানময় আত্মা, সকলেই পর, অব্যয়, অনন্ত, অক্ষয়-জন্ম, জরা, মরণ ও ভয়রহিত,-পূর্ব, পর, অন্তর ও বাহ্যবিহীন, অদ্বয়, শিব, শান্ত আকাশতুল্য ব্রহ্মে একীভূত হয়-অবিভক্তভাব একত্বভাব প্রাপ্ত হয়। অর্থাৎ জলাদির অপসারণে সূর্য্যাদির প্রতিবিম্ব যেমন সূর্য্যে এবং ঘটাদির অপনয়নে ঘটাদি ‘আকাশে আকাশ যেমন একত্ব প্রাপ্ত হয়, তেমনি[ব্রহ্মে] একতা প্রাপ্ত হয় ॥৬৩৷৭॥

যথা নদ্যঃ স্যন্দমানাঃ সমুদ্রে হস্তং গচ্ছন্তি নামরূপে বিহায়। তথা বিদ্বান্নামরূপাদ্বিমুক্তঃ পরাৎপরং পুরুষমুপৈতি দিব্যম্ ॥৬৪৷৷৮৷৷

[উক্তমেবার্থং দৃষ্টান্তেন বিশদয়তি]—যথেত্যাদিনা। স্যন্দমানাঃ(প্রবহন্ত্যঃ) নদ্যঃ(গঙ্গাদ্যাঃ) যথা(যদ্বৎ) নামরূপে(নাম—গঙ্গাদি, রূপঞ্চ অপরবৈলক্ষণ্যং) বিহায় (ত্যক্ত্বা) সমুদ্রে(জল-রাশৌ) অস্তং(অদর্শনং) গচ্ছন্তি(তন্ময়তাং লভন্তে), তথা

খণ্ডঃ।] তৃতীয়-মুণ্ডকম্। ১১৭

(তদ্বৎ) বিদ্বান্(ব্রহ্মবিৎ) নাম-রূপাৎ(ঔপাধিকাৎ অসত্যাৎ) বিমুক্তঃ(নামরূপ- পরিচ্ছেদরহিতঃ সন্) পরাৎ(হিরণ্যগর্ভাদেঃ) পরং(শ্রেষ্ঠং) দিব্যং(জ্যোতির্ময়ং) পুরুষম্(পূর্ণং—পরমাত্মানম্) উপৈতি(প্রাপ্নোতি) ॥

চলৎস্বভাব নদীসমূহ যেরূপ[নিজ নিজ] নাম ও রূপ পরিত্যাগ করিয়া সমুদ্রে অস্তমিত হয়, ঠিক সেইরূপ বিদ্বান্ পুরুষও নাম-রূপ বিমুক্ত হইয়া পরাৎপর দিব্য পুরুষকে প্রাপ্ত হন ॥ ৬৪ ॥ ৮ ॥

শঙ্কর ভাষ্যম্।

কিঞ্চ, যথা নদ্যঃ গঙ্গাদ্যাঃ স্যন্দমানাঃ গচ্ছন্ত্যঃ সমুদ্রে সমুদ্রং প্রাপ্য অস্তম্ অদর্শনম্ অবিশেষাত্মভাবং গচ্ছন্তি প্রাপ্নুবন্তি নাম চ রূপঞ্চ নামরূপে বিহার হিত্বা, তথা অবিদ্যাকৃত-নামরূপাৎ বিমুক্তঃ সন্ ‘বদ্বান পরাৎ অক্ষরাৎ পূর্ব্বোক্তাৎ পরং দিব্যং পুরুষং যথোক্তলক্ষণম্ উপৈতি উপগচ্ছতি। ৬৪ ॥৮॥

ভাষ্যানুবাদ।

আরও, স্যন্দমান—গম-স্বভাব গঙ্গাদি নদীসমূহ যেরূপ সমুদ্রকে প্রাপ্ত হইয়া, নাম-রূপ অর্থাৎ নাম(গঙ্গাদি) ও রূপ(আকৃতি) পরিত্যাগপূর্ব্বক অস্ত—অদর্শন অর্থাৎ অবিশেষ ভাব প্রাপ্ত হয়, সেইরূপ বিদ্বান্ পুরুষ অবিদ্যাকৃত নাম ও রূপ হইতে বিমুক্ত হইয়া, পর হইতে অর্থাৎ পূর্ব্বোক্ত অপর হইতেও শ্রেষ্ঠ দিব্য পুরুষকে-যাহার লক্ষণ বা পরিচয় উক্ত হইয়াছে, সেই পুরুষকে উপগত হয় ৬৪৷৷৮৷৷

স যো হ বৈ তৎ পরমং ব্রহ্ম বেদ ব্রহ্মৈব ভবতি নাস্যাব্রহ্মবিৎ কুলে ভবতি। তরতি শোকং তরতি পাপ্যানং গুহাগ্রন্থিভ্যো বিমুক্তোহমৃতো ভবতি ॥৬৫॥৯৷৷

[ব্রহ্মবিদঃ চরমফলাবাপ্তিং কথয়ন্ তল্লাভে বিঘ্নাভাবং চ ‘সমর্থয়তে]—স য ইত্যাদিনা। যঃ(পুরুষঃ) হ(অবধারণে) বৈ(প্রসিদ্ধং) তৎ(উক্তলক্ষণং) পরমং(নিরতিশয়ং) ব্রহ্ম বেদ(বেত্তি, জানাতি), সঃ(বিদ্বান্) ব্রহ্ম এব ভবতি(?)(ব্রহ্মরূপঃ সম্পদ্যতে) অন্য(ব্রহ্মবিদঃ) কূলে(বংশে) অব্রহ্মবিৎ

১১৮ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

(ব্রহ্মজ্ঞানরহিতঃ) ন ভবতি(জায়তে)।[সচ] শোকং(সংসারক্লেশং) তরতি(অতিক্রামতি), পাপ্মানং(পাপং, পুণ্যমপি) তরতি। গুহাগ্রন্থিভ্যঃ (বুদ্ধিনিষ্ঠাবিদ্যা-বন্ধনেভ্যঃ) বিমুক্তঃ[সন্] অমৃতঃ(মরণধর্মবর্জিতঃ) ভবতি ॥ যিনি সেই পরমব্রহ্মকে জানেন, তিনি ব্রহ্মস্বরূপই হন, তাঁহার বংশে অব্রহ্মজ্ঞ জন্মে না। সে জন শোক হইতে উত্তীর্ণ হন, পাপ হইতেও উত্তীর্ণ হন। হৃদয়গত অবিদ্যা-বন্ধন হইতে বিমুক্ত অমৃত হন, অর্থাৎ মৃত্যু অতিক্রম করিয়া ব্রহ্মভূত হন ॥ ৬৫ ॥ ৯ ॥

শঙ্করভাষ্যম্।

ননু শ্রেয়স্যনেকে বিঘ্নাঃ প্রসিদ্ধাঃ, অতঃ ক্লেশানামন্যতমেন অন্যেন বা দেবাদিনা চ বিঘ্নিতো ব্রহ্মবিদপি অন্যাং গতিং মৃতো গচ্ছতি, ন ব্রহ্মৈব; ন, বিদ্যয়ৈব সর্ব্ব- প্রতিবন্ধস্যাপনীতত্বাং। অবিদ্যা প্রতিবন্ধমাত্রো হি মোক্ষো নান্যপ্রতিবন্ধঃ, নিত্য- ত্বাৎ আত্মভূতত্বাচ্চ। তস্মাৎ স যঃ কশ্চিৎহ বৈ লোকে তৎ পরমং ব্রহ্ম বেদ সাক্ষা- দহমেবাস্মীতি জানাতি, স নান্যাং গতিং গচ্ছতি। দেবৈরপি তস্য ব্রহ্মপাপ্তিং প্রতি বিঘ্নোন শক্যতে কর্ত্তুম্; আত্মা হোষাং স ভবতি। তস্মাদব্রহ্ম বিদ্বান্ ব্রহ্মৈব ভবতি। কিঞ্চ, নাস্য বিদুষোহব্রহ্মবিৎ কুলে ভবতি; কিঞ্চ, তরতি শোকম্ অনেকেষ্টবৈকল্য- নিমিত্তং মানসং সন্তাপং জীবন্নেবাতিক্রান্তো ভবতি। তরতি পাপ্যানং ধৰ্ম্মাধৰ্মাখ্যং গুহাগ্রন্থিভ্যো হৃদম্নাবিদ্যাগ্রন্থিভ্যঃ বিমুক্তঃ সন্ অমৃতো ভবতীত্যুক্তমেব-“ভিদ্যতে হৃদয়গ্রন্থিঃ” ইত্যাদি ॥ ৬৫ ॥৯৷৷

ভাষ্যানুবাদ।

এখন প্রশ্ন হইতেছে যে, শ্রেয়ঃপ্রাপ্তিতে ত বহুবিধ বিঘ্ন প্রসিদ্ধ আছে; সুতরাং কোন একটি ক্লেশ দ্বারা অথবা অন্যপ্রকার দেবাদি দ্বারা বিঘ্ন প্রাপ্ত হইয়া ব্রহ্মবিৎ ব্যক্তি মৃত্যুর পর অন্যপ্রকার গতিও ত লাভ করিতে পারেন, ব্রহ্মকেই প্রাপ্ত হইবেন, তাহার স্থিরতা কি? না—এ আশঙ্কা হইতে পারে না; কারণ, বিদ্যা দ্বারাই তাহার সমস্ত বিঘ্ন অপনীত হইয়া গিয়াছে। কেননা, যেহেতু মোক্ষ পদার্থটি নিত্য এবং আত্মস্বরূপ; অতএব অবিদ্যাই মোক্ষের একমাত্র প্রতিবন্ধক, অপর কোনও প্রতিবন্ধক হইতে পারে না। অতএব জগতে সেই

খণ্ডঃ।] তৃতীয়-মুণ্ডকম্।, ১১৯

যে কোন লোক সেই পরম ব্রহ্মকে জানেন—‘আমিই সাক্ষাৎ ব্রহ্মস্বরূপ’ এইরূপ অনুভব করেন, তিনি অন্যপ্রকার গতি লাভ করেন না; দেবতাগণও তাঁহার মোক্ষ লাভে বিঘ্ন করিতে সমর্থ হন না; কারণ, তিনি তাঁহাদেরও আত্মস্বরূপ হইয়া পড়েন। অতএব ব্রহ্মবিৎ লোক ব্রহ্মই হন। আরও এক কথা,—এই ব্রহ্মবিদের বংশে অব্রহ্মজ্ঞ জন্মে না; আর(সেই লোক) শোককে অতিক্রম করেন, অর্থাৎ জীবৎকালেই বিবিধ ইস্টবিয়োগ-জনিত মানসিক সন্তাপ অতিক্রম করেন; ধর্ম্মাধর্ম্মাত্মক পাপ অতিক্রম করেন; আর গুহাগ্রন্থিসমূহ হইতে—হৃদয়গত অবিদ্যাবন্ধন হইতে—বিমুক্ত হইয়া অমৃত(মুক্ত) হন; ইহ। ‘হৃদয়গ্রন্থি বিনষ্ট হয়’ ইত্যাদি বাক্যে উক্তই হইয়াছে ॥৬৫॥৯৷৷ তদেতদুচাহভ্যুক্তং

ক্রিয়াবন্তঃ শ্রোত্রিয়া ব্রহ্মনিষ্ঠাঃ স্বয়ং জুহ্বত একসিং শ্রদ্ধয়ন্তঃ। তেষামেবৈতাং ব্রহ্মবিদ্যাং বদেত শিরোব্রতং বিধিবদ্ যৈস্ত চীর্ণম্ ॥৬৬৷১০॥ তৎ এতৎ(যথোক্তং তত্ত্বং) ঋচা(মন্ত্রেণ) অপি উক্তং—[যে] ক্রিয়াবন্তঃ (যথোক্তক্রিয়ানুষ্ঠাতারঃ) শ্রোত্রিয়াঃ(শ্রুতাধায়নবন্তঃ) ব্রহ্মনিষ্ঠাঃ(অ-পরব্রহ্মো- পাসকাঃ) শ্রদ্ধয়ন্তঃ(শ্রদ্ধাং কুর্ব্বন্তঃ সন্তঃ) স্বয়ম্ একর্ষিং(একর্ষিনামানম্ অগ্নিং) জুবতে(জুহুতি তর্পয়ন্তি); যৈঃ তু(অপি) শিরোব্রতং(শিরসি অগ্নিধারণরূপং নিয়মং) বিধিবৎ(যথাবিধি) চীর্ণং(আচরিতং); তেষাম্ এব(নান্যেষাম্) এতাং(উক্তপ্রকারাং) ব্রহ্মবিদ্যাং বদেত(কথয়েয়ুঃ)। যাহারা বর্ণাশ্রমোচিত ক্রিয়াবান্, শ্রোত্রিয় ব্রহ্মনিষ্ঠ এবং শ্রদ্ধাবান্ হইয়া একর্ষিনামক অগ্নির হোম করেন, যাঁহারা বিধি অনুসারে শিরোব্রত আচরণ করিয়াছেন; তাঁহাদের নিকটই এই ব্রহ্মবিদ্যা বলিবে[অপরকে নহে] ॥৬৬৷৷১০॥

শঙ্করভাষ্যম্। অথেদানীং ব্রহ্মবিদ্যাসম্প্রদানবিধুপপ্রদর্শনেন উপসংহারঃ ক্রিয়তে—তদে-

১২০ মুণ্ডকোপনিষৎ।[ দ্বিতীয়ঃ

তৎ বিদ্যাসম্প্রদানবিধানম্ ঋচা মন্ত্রেণ অভ্যুক্তমভিপ্রকাশিতম্। ক্রিয়াবন্তো যথোক্ত কর্মানুষ্ঠানযুক্তাঃ। শ্রোত্রিয়া ব্রহ্মনিষ্ঠা অপরস্মিন, ব্রহ্মণি অভিযুক্তাঃ পরং ব্রহ্ম বুভুৎসবঃ স্বয়ম্ একর্ষিম্ একর্ষিনামানমগ্নিং জুহ্বতে জুহ্বতি শ্রদ্ধয়ন্তঃ শ্রদ্দধানাঃ সন্তো যে তেষামেব সংস্কৃতাত্মনাং পাত্রভূতানাম্ এতাং ব্রহ্মবিদ্যাং বদেত ক্রয়াৎ শিরোব্রতং শিরসি অগ্নিধারণলক্ষণম্। যথা আথর্ব্বণানাং বেদব্রতং প্রসিদ্ধম্। যৈস্ত যৈশ তচ্চীর্ণং বিধিবৎ যথাবিধানং তেষামেব চ বদেত ॥ ৬৬ ॥ ১০ ॥

ভাষ্যানুবাদ।

অতঃপর এখন ব্রহ্মবিদ্যা দানের বিধি প্রদর্শনপূর্ব্বক[গ্রন্থের] উপসংহার করিতেছেন-এই যে সেই বিদ্যা-সংপ্রদানবিধি, ইহা ঋক্-মন্ত্রকর্তৃকও সম্যরূপে প্রকাশিত হইয়াছে-যাঁহারা ক্রিয়াবান্ শাস্ত্রবিহিত কর্ম্মের অনুষ্ঠাতা, শ্রোত্রিয়, ব্রহ্মনিষ্ঠ, অর্থাৎ অ-পরব্রহ্মে নিবিষ্টচিত্ত অথচ পরব্রহ্ম জানিতে ইচ্ছুক, শ্রদ্ধাসম্পন্ন হইয়া নিজে একর্ষিনামক অগ্নিতে হোম করেন; বিশুদ্ধচিত্ত সেই সকল সৎপাত্রের নিকটই এই ব্রহ্মবিদ্যা বলিবে। অপিচ, অথর্ববেদীয়দিগের যেমন বেদব্রত নামক ব্রত প্রসিদ্ধ আছে,[তেমনি] যাঁহারা বিধিবৎ বিধানানুসারে মস্তকে অগ্নিধারণরূপ শিরোব্রত আচরণ করিয়াছেন, তাঁহাদের নিকটই বলিবে[অন্যের নিকট নহে] ॥৬৬৷১০॥

তদেতৎ সত্যমৃষিরঙ্গিরাঃ পুরোবাচ নৈতদচীর্ণব্রতোহধীতে। নমঃ পরমঋষিভ্যো নমঃ পরমঋষিভ্যঃ ॥ ৬৭ ॥ ১১ ॥

ইত্যর্থর্ব্ববেদীয়-মুণ্ডকোপনিষদি তৃতীয়মুণ্ডকে দ্বিতীয়ঃ খণ্ডঃ ॥২ মুণ্ডকোপনিষৎ সমাপ্তা ॥

[ ইদানীং ব্রহ্মবিদ্যা-সম্প্রদান-বিধিমুপসংহরতি]—তদেতদিতি। পুরা ( পূর্ব্বং) অঙ্গিরা[ নাম] ঋষিঃ তৎ( যথোক্ত-লক্ষণং) এতৎ সত্যম্ উবাচ( উপদি-

খঃ।] তৃতীয়-মুণ্ডকম্। ১২১

দেশ)[শৌনকায় ইতিশেষঃ]।[ইদানীমপি] অচীর্ণব্রতঃ(অকৃতব্রতা- চরণঃ) এতৎ(পুস্তকং) ন অধীতে(ন পঠতি)। নমঃ পরমঋষিভ্যঃ(ব্রহ্ম- বিদ্যা- সম্প্রদান-কর্তৃভ্যঃ)[দ্বিরুক্তিঃ গ্রন্থসমাপ্ত্যর্থা]

ইত্যথর্ব্ব-বেদীয় মুণ্ডকোপনিষদি তৃতীয়মুণ্ডকে দ্বিতীয়-খণ্ডব্যাখ্যা সমাপ্তা ॥ সেয়মল্লপদোপেতা শ্রীশঙ্কর-মতে স্থিতা। মুণ্ডকোপনিষদ্ব্যাখ্যা সরলাস্তাং সতাং মুদে ॥

পূর্ব্বকালে অঙ্গিরা ঋষি সেই এই সত্য ব্রহ্ম[শৌনককে] বলিয়া- ছিলেন। যে লোক ব্রতাচরণ করে নাই, সে ইহা পাঠ করে না। পরম ঋষি উদ্দেশে নমস্কার করি। অধ্যায়-সমাপ্তি-সূচক দ্বিরুক্তি ॥৬৭৷৷১১৷৷ ইতি মুণ্ডকোপনিষদ্ ব্যাখ্যা সমাপ্তা ॥

শাঙ্কর-ভাষ্যম্।

তদেতদক্ষরং পুরুষং সত্যমৃষিরঙ্গিরা নাম পুরা পূর্ব্বং শৌনকায় বিধি- বদুপসন্নায় পৃষ্টবতে উবাচ। তদ্বদন্যোহপি তথৈব শ্রেয়োহথিনে মুমুক্ষবে মোক্ষার্থং বিধিবদুপসন্নায় ক্রয়া দিত্যর্থঃ। নৈতদ্‌গ্রন্থরূপমচীর্ণব্রতোহচরিতব্রতো হপি অধীতে ন পঠতি; চীর্ণব্রতস্য হি বিদ্যা ফলায় সংস্কৃতা ভবতীতি। সমাপ্তা ব্রহ্মবিদ্যা; সা যেভ্যো ব্রহ্মাদিভ্যঃ পারম্পর্য্যক্রমেণ সম্প্রাপ্তা, তেভ্যো নমঃ পরমঋষিভ্যঃ। পরমং ব্রহ্ম সাক্ষাদৃষ্টবস্তো যে ব্রহ্মাদয়োহবগতবস্তুশ্চ, তে পরমর্ষয়স্তেভ্যো ভূয়োহপি নমঃ। দ্বির্বচনমত্যাদরার্থং মুণ্ডক- সমাপ্ত্যর্থঞ্চ ॥ ৬৭ ॥ ১১ ॥

ইতি তৃতীয়মুণ্ডকোপনিষদ্ভাষ্যে দ্বিতীয়ঃ খণ্ডঃ ॥ ২ ॥ ইতি শ্রীমৎ-পরমহংসপরিব্রাজকাচার্য্যস্য শ্রীগোবিন্দভগবৎপূজ্যপাদশিষ্যস্য শ্রীমচ্ছঙ্করভগবতঃ কৃতাবাথর্ব্বণমুণ্ডকো- পনিষদ্ভাষ্যং সমাপ্তম্ ॥

ভাষ্যানুবাদ।,

পুরা অর্থ—পূর্ব্বকালে বিধি অনুসারে উপস্থিত হইয়া শৌনক জিজ্ঞাসা করিলে পর তাঁহার উদ্দেশে অঙ্গিরা নামক ঋষি সেই এই সত্য অক্ষর পুরুষের উপদেশ দিয়াছিলেন। অভিপ্রায় এই যে,সেইরূপ

১৮

১২২ মুণ্ডকোপনিষৎ।[দ্বিতীয়ঃ

অপর আচার্য্যও মোক্ষলাভের জন্য যথাবিধি উপাগত কল্যাণকামী মুমুক্ষুকে উপদেশ দিবেন। যে লোক অচীর্ণব্রত অর্থাৎ ব্রতাচরণ করে নাই, সে লোক এই গ্রন্থ অধ্যয়ন করে না; কেননা, ব্রতাচরণ- সম্পন্ন ব্যক্তির বিদ্যাই সংস্কৃত(শক্তিযুক্ত) হইয়া ফলজনক হইয়া থাকে(সুতরাং অচীর্ণব্রতের ক্ষ বিফল হইয়া থাকে)। ব্রহ্মবিদ্যা সমাপ্ত হইল। যে ব্রহ্মাদি হইতে পরস্পরাক্রমে এই বিদ্যা প্রাপ্ত হইয়াছে, ‘সেই পরম ঋষিগণের উদ্দেশে নমস্কার। ব্রহ্মা প্রভৃতি যাঁহারা পরব্রহ্মকে সাক্ষাৎ দর্শন করিয়াছিলেন এবং অবগতও হইয়াছিলেন; তাঁহারা পরমর্ষি, পুনশ্চ তাঁহাদের উদ্দেশে নমস্কার। সমধিক আদর প্রদর্শনার্থ এবং মুণ্ডকোপনিষৎ-সমাপ্ত্যর্থ দ্বিরুক্তি হইয়াছে ॥৬৭৷১১৷.

ইতি অথর্ব্ববেদীয়মুণ্ডকোপনিষদে তৃতীয় মুণ্ডকে দ্বিতীয় খণ্ড সমাপ্ত। মুণ্ডকোপনিষৎ সমাপ্তা।